নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার বিধিবদ্ধ আবেদনপত্র ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত সংস্করণকে অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। অনলাইন ফর্মে পরিবর্তনের অনুমতি কে দিয়েছিলেন, তা জানতে নির্বাচন কমিশনের নথিপত্রও চেয়েছে আদালত।

এই পর্যবেক্ষণের ফলে ফের সামনে এসেছে এমন একটি বিতর্ক, যার সূত্রপাত ২০২৫ সালের জুনে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর সময়। পরে নির্বাচন কমিশনের ইসিআইনেট পোর্টালে অনলাইন ফর্ম ৬-এর সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্র যুক্ত হওয়ায় বিতর্ক তীব্র হয়।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ফর্ম ৬ নিজে কখনও সংশোধন করা হয়নি। বিতর্কিত অংশটি ছিল এসআইআর-এর জন্য পৃথক একটি ঘোষণাপত্র। কমিশন আরও জানিয়েছে, এসআইআর-সংক্রান্ত নির্দেশগুলি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী এই পরিবর্তন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

২৪ জুন ২০২৫: বিহারে এসআইআর-এর নির্দেশ

বিহারের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। ২০০৩ সালের পর রাজ্যে এই প্রথম এমন নিবিড় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কমিশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল, যোগ্য সব নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া।

এই প্রক্রিয়া শুরুর কারণ হিসেবে কমিশন দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের স্থানান্তর, মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত না হওয়া এবং অবৈধ বিদেশি অভিবাসীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে।

নির্দেশে বলা হয়, নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে। সেখানে ২০০২ সালের ভিত্তি ভোটার তালিকার সঙ্গে আবেদনকারীর নিজের অথবা তাঁর বাবা-মায়ের নামের যোগসূত্র দেখাতে হবে।

জুন–জুলাই ২০২৫: বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়া এগোয়

২৫ জুন থেকে বিহারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সাধারণ আবেদনপত্র হিসেবে বিধিবদ্ধ ফর্ম ৬ বহাল থাকে। তবে এসআইআর-এর জন্য ব্যবহৃত অনলাইন ফর্মে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি আবশ্যক করা হয়।

২৭ অক্টোবর ২০২৫: এসআইআর-এর দ্বিতীয় পর্যায়

১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর-এর পরবর্তী পর্যায়ের নির্দেশ দেয় কমিশন। ভোটার হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের তারিখ ধরা হয় ১ জানুয়ারি ২০২৬। নভেম্বরে তথ্য সংগ্রহের পর্ব শুরু হয়। এই নির্দেশের মাধ্যমে বিহারে অনুসৃত কাঠামো আরও অনেক বড় ভৌগোলিক এলাকায় কার্যকর করা হয়।

১৪ মে ২০২৬: তৃতীয় পর্যায়ের এসআইআর ঘোষণা

১৬টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তৃতীয় পর্যায়ের এসআইআর ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। রাজ্যগুলি হল অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ওড়িশা, পাঞ্জাব, সিকিম, ত্রিপুরা, তেলঙ্গানা ও উত্তরাখণ্ড। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি হল দিল্লি, চণ্ডীগড় এবং দাদরা ও নগর হাভেলি ও দমন ও দিউ।

কমিশন জানায়, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ছাড়া গোটা দেশকে পর্যায়ক্রমে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। ওই তিন এলাকার সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে।

২৭ মে ২০২৬: বিহারে এসআইআর করার ক্ষমতা বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট

বিহারে এসআইআর পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট।

এই রায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আদালত সেখানে উল্লেখ করে, ২৪ জুন ২০২৫-এর এসআইআর নির্দেশ অনুযায়ী নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির আবেদনকারীকে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে ‘সংযোজনী ডি’ জমা দিতে হবে। অর্থাৎ এসআইআর কাঠামোর মধ্যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটির অস্তিত্ব আদালতের রায়ে স্বীকৃতি পায়।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে, ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির অধীনে নির্ধারিত ফর্ম ৬ ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাঠামো ঠিক করে দেয়। কিন্তু সেটি জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি। এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়ায় তার প্রতিটি বিধান সব সময় আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করা যায় না।

আদালত বলে, “তাই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত নথিপত্রের কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশনের কিছু অবশিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।”

তবে কোনও বিধিবদ্ধ ফর্ম পরিবর্তন করার বিষয়ে ওই রায়ে কিছু বলা হয়নি। বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্নটি এখানেই।

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ফর্ম ৬ পরিবর্তনে কমিশনারদের আপত্তির খবর প্রকাশ

নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীর অগোচরে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে তাঁরা ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি বিষয় ছিল ফর্ম ৬।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: কমিশনের দাবি, সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত

নির্বাচন কমিশন জানায়, ভিন্নমত ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার স্বাভাবিক অংশ।

কমিশনের বক্তব্য, আগের এক বছরে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং এসআইআর-সহ যত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সবই “পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের” ফল।

তবে ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন কে অনুমোদন করেছিলেন কিংবা আপত্তি সত্ত্বেও অনলাইনে ঘোষণাপত্রটি কেন যুক্ত হয়েছিল, সেই ব্যাখ্যা কমিশন ওই প্রতিক্রিয়ায় দেয়নি।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬: আইনি অবস্থান ফের জানায় কমিশন

বৈঠকের পরে একটি বিস্তারিত প্রেস নোট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। তাতে বলা হয়, “এসআইআর-এর জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রটি মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে।”

কমিশন আরও জানায়, এসআইআর চলছে না, এমন সময়ে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিতে নির্ধারিত ফর্মগুলিই ব্যবহার করা হবে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: এসআইআর শেষ হওয়া রাজ্যগুলিতে ঘোষণাপত্র সরানো হয়

যেসব রাজ্যে এসআইআর শেষ হয়ে গিয়েছে, সেখানে ইসিআইনেট পোর্টালের অনলাইন ফর্ম ৬ থেকে এসআইআর-সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রটি সরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। তবে যেসব রাজ্যে এসআইআর তখনও চলছিল, সেগুলির ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রটি পোর্টালে বহাল থাকে।

২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন জানিয়েছিল, এসআইআর-এর সময়সীমার বাইরে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির অধীনে নির্ধারিত ফর্মগুলিই প্রযোজ্য হবে। তার পরেই এই পদক্ষেপ করা হয়।

৫ অক্টোবর ২০২৬: সুপ্রিম কোর্ট জানায়, পরিবর্তিত ফর্ম ৬ অনুমোদন করেনি

সোমবার বিতর্কটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া আবেদনগুলির শুনানিতে প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী ফর্ম ৬-এর প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, পরিবর্তিত ফর্মটি দিল্লিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট করে দেওয়া যাক। পরিবর্তিত কোনও ফর্ম ৬ আমরা অনুমোদন করিনি।”

তিনি আরও জানান, নির্বাচন কমিশন তার রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরে আদালত দেখতে চায়, “কে কী পরিবর্তন করেছেন।”