নন্দীগ্রামে ভোটের দুই ছবি: ভয় দেখানোর অভিযোগ কংগ্রেসের, শান্তিপূর্ণ বলছে বিজেপি

যা জানা জরুরি
- কোথাও ভোটারদের ভয় দেখানো, কোথাও বিরোধী এজেন্টদের বুথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ।
- অন্যদিকে শাসকদলের দাবি, মানুষ নির্বিঘ্নে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন।
- মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনকে ঘিরে এই দুই বিপরীত ছবি সামনে এল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কোথাও ভোটারদের ভয় দেখানো, কোথাও বিরোধী এজেন্টদের বুথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। অন্যদিকে শাসকদলের দাবি, মানুষ নির্বিঘ্নে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনকে ঘিরে এই দুই বিপরীত ছবি সামনে এল। কংগ্রেস ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। বিজেপি অভিযোগ উড়িয়ে বলেছে, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই ভোটপ্রক্রিয়াকে কাঠগড়ায় তুলছে বিরোধীরা।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল থেকেই একাধিক বুথের পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। তাঁর অভিযোগ, দলের এজেন্টদের কোথাও বুথে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, কোথাও জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোটের আগের রাতেও বিভিন্ন এলাকায় বাইকবাহিনী ঘুরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ভোট চলাকালীন বুথের বাইরে বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে তাঁর বচসাও হয়।
শুধু কংগ্রেস নয়, বাম শিবিরও অনিয়মের অভিযোগ তোলে। খবর অনুযায়ী, নন্দীগ্রামের ২১২ নম্বর বুথে এক বাম এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। ভেকুটিয়ার ভীমকাটা এলাকার ২৮ নম্বর বুথেও ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ জানানো হয়। এর মধ্যেই পুলিশ নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লক কংগ্রেস সভাপতি শেখ আশরাফুল্লাকে গ্রেফতার করে। পুলিশের পদক্ষেপের কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কার কথা জানানো হয়।
নন্দীগ্রামে প্রাক্তন তৃণমূল নেতা শেখ সায়ুম কাজির দোকান ভাঙচুরের ঘটনাও সামনে এসেছে। ভোটের দিনের এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ছবির বিবরণে। তবে কারা ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কোনও পক্ষকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ অবশ্য ভোটে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। সকালে গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথ পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর বক্তব্য, বিরোধীদের পর্যাপ্ত পোলিং এজেন্টই নেই; সেই সাংগঠনিক ঘাটতি ঢাকতে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং সাধারণ মানুষ শান্তিতে ভোট দিচ্ছেন। নন্দীগ্রামে কোনও সমস্যা নেই বলেও দাবি করেন বিজেপি প্রার্থী।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ভোটকে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। নিজের জয়ের পুরনো ব্যবধানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার বিজেপি আরও বড় ব্যবধানে জিতবে। ভোটদানের হারও বেশি হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা ছিল। ফলে একই কেন্দ্রের ভোটকে একদিকে বিজেপি জনসমর্থনের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে কংগ্রেস তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অভিযোগ করেন, পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ ভোটাররা বাধার মুখে পড়ছেন। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে বহিরাগতদের এনে ভোটে কারচুপি করা হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে ভিডিও এবং অন্য প্রমাণ নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। কংগ্রেস নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই নতুন করে ভোটগ্রহণের দাবি তোলে।
বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার পাল্টা বলেন, কংগ্রেস হারের আশঙ্কা থেকেই আগাম অজুহাত তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীরা ভোট নিয়ে সন্দেহ ছড়াতে চাইছে। বিজেপি হিংসামুক্ত নির্বাচন চায় এবং ভোটে অশান্তি বরদাস্ত করবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
একই দিনে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে গ্রেফতার হন আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর। ভোট দেওয়ার পরে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ করেন। পরে দলীয় কার্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও ধস্তাধস্তি হয়। তাঁকে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই কেন্দ্রে তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদ দলের প্রার্থী হওয়ায় ঘটনাটি নির্বাচনী উত্তেজনা আরও বাড়ায়।
মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার সচিন মক্কর জানান, হুমায়ুন এই উপনির্বাচনে প্রার্থী কিংবা অনুমোদিত নির্বাচনী এজেন্ট নন। ফলে যেভাবে তিনি ঘুরছিলেন, তা অনুমোদিত নয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, আইন সবার জন্য সমান। অন্যদিকে রেজিনগরের কংগ্রেস প্রার্থী মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি এজেন্টদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে থানার সামনে অবস্থানে বসেন এবং পুনর্নির্বাচন চান।
রেজিনগরে মমতা-শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠি দিয়ে পুনর্নির্বাচন দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন বুথে এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং কোথাও ভোটারদের বলা হয়েছে, তাঁদের ভোট আগেই পড়ে গিয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। চিঠিটির প্রতিলিপি তাদের কাছে রয়েছে। তবে এই বক্তব্য প্রার্থীর অভিযোগ; প্রশাসনিক তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য ওই প্রতিবেদনে নেই। অভিযোগ ও প্রতিষ্ঠিত ঘটনাকে আলাদা রেখেই বিচার প্রয়োজন।
এই উপনির্বাচনের রাজনৈতিক পটভূমিও তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপির প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে এই দুই কেন্দ্র। শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর আসন রেখে নন্দীগ্রাম ছাড়ায় এখানে উপনির্বাচন হচ্ছে। অন্যদিকে হুমায়ুন কবীর নওদা আসন রেখে রেজিনগর ছেড়েছিলেন। নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা দে প্রধান সরে দাঁড়ানোর পরে মমতা কংগ্রেসের মিলন প্রধানকে সমর্থন জানান। তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণ বদলে যায়।
ভোটের আগে মিলনের গ্রেফতারিও বিতর্ক তৈরি করেছিল। মমতার সমর্থন ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে ২০০৭ সালের জমি আন্দোলন-সংক্রান্ত পুরনো মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দেয়। সেই জামিনে নির্বাচনী লড়াইয়ে ফেরেন তিনি। আদালত তাঁকে ২১ অক্টোবর হলদিয়ার আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী খবরে নন্দীগ্রামে প্রায় ৮০.৮৭ শতাংশ এবং রেজিনগরে প্রায় ৮০.০৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানানো হয়েছে। গণনা হবে ৯ অক্টোবর। তবে ভোটের হার কিংবা ফলাফল দিয়ে ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। সেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন বুথভিত্তিক তথ্য ও প্রমাণ পরীক্ষা। মঙ্গলবারের ভোট শেষ হলেও, তার অবাধ চরিত্র নিয়ে শাসক ও বিরোধীদের বিরোধ তাই রয়ে গেল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



