‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বদলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’, শীঘ্রই বিল আনার ঘোষণা শমীকের

যা জানা জরুরি
- রাজ্যের নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ থেকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ বা ‘Paschim Banga’ করার লক্ষ্যে শীঘ্রই বিধানসভায় বিল আনবে রাজ্য সরকার।
- সোমবার, ৫ অক্টোবর কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘোষণা করেছেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
- তাঁর বক্তব্য, সম্ভবত বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনেই প্রস্তাবটি আনা হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাজ্যের নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ থেকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ বা ‘Paschim Banga’ করার লক্ষ্যে শীঘ্রই বিধানসভায় বিল আনবে রাজ্য সরকার। সোমবার, ৫ অক্টোবর কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘোষণা করেছেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, সম্ভবত বিধানসভার পরবর্তী অধিবেশনেই প্রস্তাবটি আনা হবে। রাজ্যের নামের সঙ্গে তার ইতিহাসের যোগ অক্ষুণ্ণ রাখতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন তিনি।
শমীকের যুক্তি, বঙ্গভাগের ইতিহাস থেকে পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়কে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সেই কারণে শুধু ‘বাংলা’ নামটি গ্রহণযোগ্য নয়। আবার ইংরেজিতে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ ব্যবহারের পরিবর্তে ‘Paschim Banga’ নামকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে চায় বিজেপি। বাংলায় রাজ্যের নাম ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বলে পরিচিত থাকার প্রশ্ন উঠলে তিনি জানান, সরকারি স্বীকৃতির বিষয়টিই এখানে মুখ্য। তাঁর বক্তব্যে নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি ঐতিহাসিক পরিচয় রক্ষার রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে রাজ্যসভাতেও এই নামের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
বারাণসীতে ‘পশ্চিমবঙ্গ ভবন’ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নাম বদলের প্রসঙ্গ তোলেন শমীক। তাঁর দাবি, রাজ্যের সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতর, কেন্দ্র এবং কোচবিহার রাজপরিবারের উত্তরসূরিদের সহযোগিতায় ওই কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়েছে। সেখানে বাংলার পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত ভবনে সম্মেলনকক্ষ, গ্রন্থাগার, বাংলা সাহিত্য ও গানের সংগ্রহ এবং গাড়ি রাখার জায়গা তৈরির কথাও জানিয়েছেন তিনি। বারাণসীর প্রবাসী বাঙালিদের সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্যও জায়গাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে রাজ্যের নাম বদলের চেষ্টা নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও বিষয়টি বিধানসভায় উঠেছিল। প্রথমে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামের প্রস্তাব আসে। আলোচনায় তৎকালীন কংগ্রেস বিধায়ক সৌগত রায় ‘বাংলা’ নামের পক্ষে মত দেন। শেষ পর্যন্ত সেই নামের প্রস্তাবও কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু উদ্যোগটি কার্যকর হয়নি। ফলে ইংরেজিতে রাজ্যের নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ই থেকে যায়।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামের প্রস্তাব পাঠায়। সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। নাম পরিবর্তনের পক্ষে একটি প্রশাসনিক যুক্তি ছিল, ইংরেজি বর্ণানুক্রমে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ তালিকার প্রায় শেষে থাকে। জাতীয় স্তরের বৈঠকে রাজ্যের প্রতিনিধিদের তাই বক্তব্য রাখার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় বলে তৎকালীন সরকার অভিযোগ করেছিল। নাম বদলালে তালিকায় রাজ্যের অবস্থান এগিয়ে আসবে, এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২০১৬ সালে তিন ভাষায় তিনটি নামের প্রস্তাব আসে: বাংলায় ‘বাংলা’, ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ এবং হিন্দিতে ‘বঙ্গাল’। কেন্দ্র একটি অভিন্ন নাম বেছে নিতে বলায় ২০১৮ সালে সব ভাষায় ‘বাংলা’ নাম করার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাশ করে বিধানসভা। সেই সময়ও বিজেপি ‘পশ্চিম’ শব্দ বাদ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, এই শব্দের সঙ্গে দেশভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
নাম পরিবর্তনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল রাজ্য বিধানসভায় বিল বা প্রস্তাব পাশ হলেই কোনও রাজ্যের নাম বদলে যায় না। সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজ্যের নাম পরিবর্তনের আইন করার ক্ষমতা সংসদের। সংশ্লিষ্ট বিল সংসদে পেশ করতে রাষ্ট্রপতির সুপারিশ প্রয়োজন। নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব সম্পর্কে মতামত জানানোর জন্য রাষ্ট্রপতিকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের আইনসভার কাছেও বিলটি পাঠাতে হয়। ফলে রাজ্যের উদ্যোগের পরে কেন্দ্রীয় স্তরে আইন প্রণয়নের ধাপ বাকি থাকবে।
এই অবস্থায় শমীকের ঘোষণাকে নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আপাতত এটি বিধানসভায় উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা। প্রস্তাবিত বিলের বয়ান, পেশের নির্দিষ্ট দিন এবং পরবর্তী কেন্দ্রীয় পদক্ষেপ স্পষ্ট হলে বোঝা যাবে, দীর্ঘদিনের নামবদল বিতর্ক এবার বাস্তব রূপ পেতে চলেছে কি না। তবে ‘বাংলা’র পরিবর্তে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম বেছে নেওয়ার ঘোষণায় বর্তমান শাসকদলের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার: সরকারি নামের মধ্যেও তারা বঙ্গভাগের ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখতে চায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



