সাত দশক পরে ফিরল নদীবাণিজ্য, উচ্চ অসম থেকে মিথানল গেল বাংলাদেশের পথে

যা জানা জরুরি
- সাত দশক পরে ফের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথে ব্রহ্মপুত্র।
- স্বাধীনতার পর এই প্রথম উচ্চ অসম থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিল পণ্যবাহী নৌযান।
- সোমবার ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে একটি বার্জ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাত দশক পরে ফের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথে ব্রহ্মপুত্র। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উচ্চ অসম থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিল পণ্যবাহী নৌযান। সোমবার ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে একটি বার্জ।
ডিব্রুগড়ের পুরনো নদীঘাট বন্ধ হওয়ার প্রায় ৭০ বছর পরে এই যাত্রা শুধু একটি পণ্য পরিবহণের ঘটনা নয়। উত্তরপূর্ব ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের নদীপথে বাণিজ্যের সম্ভাবনাকেও নতুন করে সামনে আনছে এই উদ্যোগ।
পতাকা উঠল
কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল পতাকা দেখিয়ে বার্জটির যাত্রার সূচনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একাধিক মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক এবং প্রশাসনিক আধিকারিক। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের বার্জটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ‘কুশল কোঁওর’ টাগ।
অসম সরকারের বক্তব্য, রাজ্যের শিল্পে উৎপাদিত পণ্য এবার রাজ্যেরই নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছবে। ভবিষ্যতে এই পথ নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবায় পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে।
৭৬৮ কিলোমিটার
মিথানলটি উৎপাদন করেছে নামরূপের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা অসম পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড।
বগিবিল থেকে নৌযানটি ব্রহ্মপুত্রের ২ নম্বর জাতীয় জলপথ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এগিয়ে যাবে।
বগিবিল থেকে বাংলাদেশের পানগাঁও পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ৭৬৮ কিলোমিটার হল এই দীর্ঘ যাত্রার ভারতীয় জলপথের অংশমাত্র।
ঘাটের পুরনো স্মৃতি
এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডিব্রুগড়ের হারিয়ে যাওয়া নদীবাণিজ্যের ইতিহাসও।
একসময় ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে পণ্য পরিবহণের ব্যস্ততা ছিল। বিশেষ করে চা পরিবহণে নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে সেই বাণিজ্য ক্রমে রেলপথের দিকে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের পুরনো নদীঘাট বন্ধ হয়ে যায়।
সেই ইতিহাসের কথাই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন সোনোয়াল। তাঁর বক্তব্য, পূর্বপুরুষদের পরিচিত স্টিমারের শব্দ বহু দশক স্তব্ধ থাকার পরে ডিব্রুগড় ফের নদীপথে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, এই যাত্রা ভবিষ্যতে নিয়মিত পণ্য পরিবহণের পথ খুলে দিতে পারে।
নতুন পরিকাঠামো
এই চালান পাঠানোর পিছনে সাম্প্রতিক পরিকাঠামোগত উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
বগিবিল ও ধুবড়িতে শুল্ক এবং অভিবাসন সংক্রান্ত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বগিবিলের যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল চালু হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এবার সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করেই বাংলাদেশের বাজারে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
অসমের নতুন দরজা
হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই ঘটনাকে অসমের জন্য গর্বের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল নামরূপে উৎপাদিত পণ্য ব্রহ্মপুত্র বেয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি।
উত্তরপূর্ব ভারতকে পূর্বাঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার বৃহত্তর সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গেও এই উদ্যোগকে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে পরিকল্পনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা কতটা কার্যকর হয়, তার উপর।
আগেও নজির
ব্রহ্মপুত্র ও বাংলাদেশের জলপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নজির অবশ্য একেবারে নতুন নয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জলপথ হয়ে টাটা স্টিলের পণ্যবাহী বার্জ পান্ডুতে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় যাওয়ার পথে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছিল পর্যটকবাহী ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’।
তবে সোমবারের যাত্রার বিশেষত্ব হল—উচ্চ অসম থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে সরাসরি বাণিজ্যিক পণ্য পাঠানো।
খরচ কমবে?
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বিকল্প পরিবহণপথ তৈরি করা।
নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিষেবা চালু হলে উৎপাদকরা পণ্য পাঠানোর সময়, খরচ এবং পরিমাণ বিবেচনা করে পরিবহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বাংলাদেশের ক্রেতাদের সঙ্গে অসমের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির সরাসরি সরবরাহ-সম্পর্কও শক্তিশালী হতে পারে।
ফিরতি পথেও পণ্য পরিবহণের সুযোগ তৈরি হলে নৌপথটি আরও অর্থনৈতিক ভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে আসে, তা বোঝার জন্য একটি চালান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিষেবা এবং তার বাস্তব অভিজ্ঞতা।
শুরুটাই আসল
তাই সোমবারের যাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি নজর থাকবে আরও কয়েকটি বিষয়ের দিকে—বিমান নয়, জলপথে এই পণ্য পৌঁছতে কত সময় লাগে, খালাসের প্রক্রিয়া কতটা মসৃণ হয় এবং পরবর্তী চালান কত দ্রুত শুরু হয়।
একটি বার্জ রওনা দিয়েছে। এখন লক্ষ্য সেই একক যাত্রাকে নিয়মিত বাণিজ্যপথে পরিণত করা।
সেই ধারাবাহিকতা তৈরি হলে ব্রহ্মপুত্র শুধু অসমের নদী হয়ে থাকবে না—রাজ্যের শিল্প এবং বাংলাদেশের বাজারের মধ্যে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক সেতু হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



