International

ককপিটেই ফাঁক?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে হামলার ঘটনার এক সপ্তাহও কাটেনি।
  • এর মধ্যেই হামলার উদ্দেশ্য, বিমান পরিচালনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার গলদ এবং বৃহত্তর কোনও ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
  • হিন্দুস্তান টাইমসের জ্যেষ্ঠ সঞ্চালক আয়েশা ভার্মার সঙ্গে কথোপকথনে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শিশির গুপ্তের দাবি, ঘটনাটিকে নিছক অনলাইন জল্পনা কিংবা কোনও ব্যক্তির একক হামলা হিসেবে…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে হামলার ঘটনার এক সপ্তাহও কাটেনি। এর মধ্যেই হামলার উদ্দেশ্য, বিমান পরিচালনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার গলদ এবং বৃহত্তর কোনও ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের জ্যেষ্ঠ সঞ্চালক আয়েশা ভার্মার সঙ্গে কথোপকথনে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শিশির গুপ্তের দাবি, ঘটনাটিকে নিছক অনলাইন জল্পনা কিংবা কোনও ব্যক্তির একক হামলা হিসেবে দেখলে চলবে না।

গুপ্তের মতে, এটি এমন একটি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা, যা সফল হলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারত পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনীতিতেও। আর সেই বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। আক্রান্ত হওয়ার পরেও তিনি বিপদের সংকেত দিতে সক্ষম হন এবং বিমানটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রুখতে সাহায্য করেন।

তাঁর বক্তব্য, ঘটনাটির গুরুত্ব একটি উড়ান, বিমান সংস্থা বা বিমানবন্দরের গণ্ডিতে আটকে নেই। পাইলটদের অতীত ও পরিচয় যাচাই, ককপিটের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সমন্বয় এবং ইজরায়েল-সংযুক্ত বিমানপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

গুপ্তের মতে, ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে হলে ভাবতে হবে, বিমানকর্মী ও যাত্রীরা যদি সহকারী পাইলটকে থামাতে না পারতেন, তা হলে কী ঘটতে পারত। তাঁর মূল্যায়ন, বিমানটিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ইজরায়েলের কোনও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে ফেলার চেষ্টা হতে পারত। সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারত বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, তেল আভিভ, জেরুসালেম কিংবা কোনও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

এমনটা হলে শুধু বিপুল প্রাণহানিই নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়ায় তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হতে পারত। অতীতে বৃহত্তর সংঘাতের সূত্রপাত ঘটানো ঘটনাগুলির প্রসঙ্গ টেনে গুপ্ত বলেন, “এটি সত্যিই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারত।”

তাঁর যুক্তি, আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে কোনও বিমান ইজরায়েলে আছড়ে পড়লে সে দেশের সরকারের উপর পাল্টা আঘাত হানার প্রবল চাপ তৈরি হতে পারত। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্কও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারত।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু বিমানে থাকা প্রায় ১৮০ জনের নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল না। পশ্চিম এশিয়া যখন এমনিতেই অস্থির, তখন একটি বিমান হামলা আরও বড় কূটনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারত।

ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নয়, তদন্তের প্রশ্ন

ইজরায়েল নিজেই ঘটনাটি ঘটিয়েছে কিংবা অন্যের ঘাড়ে দায় চাপাতে সাজানো হামলা চালিয়েছে—এমন দাবি খারিজ করেছেন গুপ্ত। তাঁর মতে, এই ধরনের বক্তব্য বৃহত্তর ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অংশ। বরং ঘটনাটির যে বিবরণ সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতেই তদন্ত এগোনো উচিত—ক্যাপ্টেনকে অক্ষম করে দেওয়া, বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেটিকে ইজরায়েলের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন।

তাঁর উত্থাপিত উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সহকারী পাইলট হামান আল-হামামির অতীত। গুপ্তের দাবি, ওই পাইলট এর আগেও তেল আভিভ রুটে বিমান চালিয়েছিলেন এবং পথটি তাঁর পরিচিত ছিল। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়, আগের কর্মজীবন এবং অনলাইনে উগ্রপন্থী ধর্মীয় বক্তব্য ও জিহাদি বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসার মতো নানা দাবি সামনে এসেছে। তবে এগুলির কতটা তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

গুপ্তের যুক্তি, তদন্তকারীরা যদি এই তথ্যগুলি প্রমাণ করতে পারেন, তা হলে বিমান সংস্থায় নিয়োগের আগে অতীত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতার প্রশ্ন উঠবে।

কারণ প্রশ্নটা শুধু একজন ব্যক্তি কীভাবে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত হলেন, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন—ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত একটি কৌশলগত ভাবে সংবেদনশীল রুটে বিমান চালানোর দায়িত্ব তিনি পেলেন কীভাবে?

“এমন বিষয় স্রেফ নজর এড়িয়ে যায় না,” বলেন গুপ্ত। তাঁর মতে, ওই ব্যক্তির যোগাযোগ, যাতায়াত, অনলাইন তৎপরতা এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে গভীর তদন্ত প্রয়োজন।

আগের নিয়োগকর্তা, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাঁর সম্পর্কে কোনও সতর্কবার্তা পেয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। অর্থাৎ ব্যর্থতা হয়ে থাকলে তা এক জায়গায় নয়—বিমান সংস্থার নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে জাতীয় বিমান নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং আন্তর্জাতিক রুটের নজরদারি, একাধিক স্তরেই হয়ে থাকতে পারে।

বাঁচালেন ক্যাপ্টেন

ঘটনার বিবরণে বারবার উঠে এসেছে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সাহসিকতার কথা। হামলাকারীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হন বলে জানানো হয়েছে। গুপ্তের বক্তব্য অনুযায়ী, মাথা, বুক ও হাতে কুঠারের আঘাত পাওয়ার পরেও ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে এবং জরুরি বিপদসংকেত পাঠাতে সক্ষম হন।

সেই পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত ঘটনার পরিণতি বদলে দেয় বলে মনে করেন গুপ্ত। তাঁর পাশাপাশি কৃতিত্ব দিতে হবে সেই যাত্রীদেরও, যাঁরা এগিয়ে এসে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানে থাকা আরও দুই অতিরিক্ত পাইলটও পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করেন। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে বলে জানা যায়।

গুপ্তের কাছে এটি শুধু ব্যক্তিগত সাহসিকতার ঘটনা নয়। তাঁর মতে, সম্ভাব্য এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক বিপর্যয় ঠেকাতে ক্যাপ্টেনের প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। চরম বিপদের মধ্যেও বিমানকর্মী ও যাত্রীরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে দেননি।

৯/১১-এর পরও নতুন ফাঁক?

ঘটনাটি আবার সামনে এনেছে জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানকর্মী ও যাত্রীদের প্রশিক্ষণের প্রশ্ন। বিমান নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য অবশ্যই বিপদকে ককপিটে পৌঁছতে না দেওয়া। কিন্তু সেই প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে চরম মুহূর্তে মানুষের প্রতিক্রিয়াও যে জীবন-মৃত্যুর ফারাক গড়ে দিতে পারে, এই ঘটনা তা দেখিয়েছে।

গুপ্ত মনে করিয়ে দেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর গোটা বিশ্বের বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থাই বদলে গিয়েছিল। বিমানবন্দরে তল্লাশি কঠোর হয়, ককপিটের দরজা আরও সুরক্ষিত করা হয় এবং বিমান ছিনতাই ঠেকাতে একাধিক নতুন ব্যবস্থা চালু হয়।

কিন্তু ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা যেন অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আনছে—বিপদ যদি ককপিটের ভিতর থেকেই আসে, তখন?

বিশেষ করে ককপিটে থাকা কুঠার হামলায় ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গুপ্তের মতে, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে এখন শুধু যাত্রীদের তল্লাশি নয়, পাইলটদের নাগালে থাকা সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের উপকরণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

এর জেরে পাইলটদের অতীত যাচাই আরও কঠোর হতে পারে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন, আচরণগত নজরদারি এবং সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক রুটে কর্মরতদের উপর বাড়তি তদারকির মতো ব্যবস্থা আসতে পারে।

তবে এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ যাত্রীদের উপরও। ৯/১১-এর পরের মতোই নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা বিমানযাত্রাকে আরও জটিল এবং ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। কিন্তু গুপ্তের যুক্তি, ককপিটে প্রবেশাধিকার থাকা একজন পাইলটের হাতেই এমন একটি বিমান থাকে, যেটিকে চরম পরিস্থিতিতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তাই যাত্রীদের মতো বিমানকর্মীদের যাচাইও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কার হাত ছিল পিছনে?

ঘটনার ভূরাজনৈতিক পরিণতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, তার উপর। বাইরের কোনও সংগঠন বা রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত কোনও চক্র হামলার পরিকল্পনায় সাহায্য করেছে বলে প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তদন্তে সম্ভাব্য যে যোগসূত্রগুলি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে গুপ্ত মনে করেন, তার মধ্যে ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী, হামাস, হিজবুল্লা এবং আইএসআইএসের নামও রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়েছেন—প্রমাণ ছাড়া কারও উপর দায় চাপানো উচিত নয়।

কারণ প্রতিটি সম্ভাব্য যোগসূত্রই ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার জন্য আলাদা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

আমিরশাহির একটি বিমান সংস্থার তেল আভিভ-সংযুক্ত উড়ানে হামলার ঘটনা ইজরায়েলের কাছে বিশেষ ভাবে সংবেদনশীল। উগ্রপন্থায় প্রভাবিত হওয়া ঠেকাতে আমিরশাহির নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, পাশাপাশি ইজরায়েলের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা মজবুত—দুই প্রশ্নই সামনে আসতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রেও ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ভূমিকার কারণে। গুপ্তের মতে, তদন্তে নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রীয় ভূমিকা না থাকলেও ভারতীয় পাইলটের সাহসিকতা ঘটনাটিকে ভারতের জনপরিসরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

সব মিলিয়ে গুপ্তের মূল বক্তব্য একটাই—ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বিমান-আতঙ্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হিসেবে এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। কারণ এর উত্তর শুধু একজন পাইলটের উদ্দেশ্যই স্পষ্ট করবে না; সামনে আনতে পারে বিমান নিরাপত্তা, নিয়োগ ও নজরদারি, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং অস্থির পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থার একাধিক অদৃশ্য ফাঁকও।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles