তারাতলায় নকশা থেকে নির্মাণ, সব স্তরেই গাফিলতির অভিযোগ

যা জানা জরুরি
- তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসে ১৬ শ্রমিকের মৃত্যুর ৮৭ দিনের মধ্যে সাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আলিপুর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল।
- প্রায় দু’হাজার পাতার নথিতে ৭০ জনের বেশি সাক্ষীর বক্তব্য এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মূল্যায়ন রাখা হয়েছে।
- পুলিশের দাবি, ২৪ জুনের ধস কোনও এক কর্মীর তাৎক্ষণিক ভুল নয়; নিম্নমানের উপকরণ, অনুমোদিত নকশা না-মানা এবং বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সম্মিলিত অবহেলা দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসে ১৬ শ্রমিকের মৃত্যুর ৮৭ দিনের মধ্যে সাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আলিপুর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল। প্রায় দু’হাজার পাতার নথিতে ৭০ জনের বেশি সাক্ষীর বক্তব্য এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মূল্যায়ন রাখা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ২৪ জুনের ধস কোনও এক কর্মীর তাৎক্ষণিক ভুল নয়; নিম্নমানের উপকরণ, অনুমোদিত নকশা না-মানা এবং বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সম্মিলিত অবহেলা দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে। অভিযোগপত্র বিচার শুরু করার ভিত্তি, দোষসিদ্ধি নয়।
ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের তিনতলা গুদামে ছাদ ঢালাইয়ের সময় প্রায় ৫০–৬০ জন শ্রমিক ছিলেন। সদ্য ঢালা কংক্রিটের ভারে লোহার বিম বেঁকে গিয়ে কাঠামো ভেঙে পড়ে বলে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও ১৬ জন মারা যান এবং ১৭ জন আহত হন। তারাতলা থানায় অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, অনিচ্ছাকৃত হত্যার চেষ্টা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল।
অভিযুক্তদের মধ্যে নির্মাণস্থলের তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দ মহম্মদ গুলজার ওরফে গুলজার হুসেন, পরিকল্পনায় স্বাক্ষরকারী আমিনুর শেখ, প্রকল্পের প্রকৌশলী কমল সামন্ত এবং প্রাক্তন মেয়রের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন। অভিযোগপত্রে প্রত্যেকের পৃথক ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের দাবি। বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের নাম ওঠায় রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, কিন্তু কারও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অপরাধের প্রমাণ নয়। অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনে তাঁর বাস্তব ভূমিকা আদালতেই প্রমাণ করতে হবে।
পুলিশের বক্তব্য, কলকাতা পুরসভার অনুমোদিত নকশা থেকে নির্মাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বিচ্যুত হয়েছিল। কোথায় তদারকি ব্যর্থ হল, পুরসভার পরিদর্শকরা কাজ থামানোর সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত অর্থের লেনদেন বৈধ ছিল কি না, সেগুলিও তদন্তের অংশ। নির্মাতা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করলে শুধু উপকরণ সরবরাহকারী নয়, তা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন করা প্রকৌশলী এবং পরিদর্শনকারী সংস্থার দায়ও পরীক্ষা করা দরকার।
শ্রমিকেরা ঢালাইয়ের সময় কোন সুরক্ষা-নির্দেশ পেয়েছিলেন, জরুরি বেরোনোর পথ ছিল কি না এবং তাঁদের নিয়োগকারী কে—অভিযোগপত্রের বাইরে ক্ষতিপূরণের জন্য এই তথ্যও প্রয়োজন। নির্মাণের একাধিক ঠিকাদার ও উপঠিকাদার থাকলে প্রত্যেকে অন্যের উপর দায় ঠেলতে পারেন। শ্রম দপ্তরের নথি, হাজিরা খাতা, মজুরির ব্যাঙ্ক হিসাব এবং বিমা মিলিয়ে প্রত্যেক মৃত ও আহত শ্রমিকের আইনগত নিয়োগকর্তা নির্ধারণ করা জরুরি।
সাতজনকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগপত্র প্রথমে অপরাধ ও অপরাধী অনুসরণ ব্যবস্থার পোর্টালে বৈদ্যুতিনভাবে তুলে পরে আদালতে কাগজে জমা দেওয়া হয়। দ্রুত অভিযোগপত্র তদন্তের গতি দেখায়, কিন্তু নথির পরিমাণ নিজে মামলার শক্তি নয়। নমুনার পরীক্ষাগার-ফল, নকশার মূল ও পরিবর্তিত কপি, অনুমোদনের ধারাবাহিকতা এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পরস্পরকে সমর্থন করছে কি না—বিচারের সময় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
নির্মাণ-দুর্ঘটনার পরে প্রায়ই দায় ঠিকাদার বা সাইটের এক কর্মীর মধ্যে আটকে যায়। এই অভিযোগপত্র অন্তত নকশা, অনুমোদন, উপকরণ ও তত্ত্বাবধানের পুরো শৃঙ্খল দেখার দাবি করছে। আদালতে তা টিকলে দায়িত্ব নির্ধারণের পরিসর বড় হবে। তবে পুরসভার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা থাকলে শুধু কয়েকজনের ফৌজদারি বিচার দিয়ে ব্যবস্থা সংশোধন সম্পূর্ণ হবে না।
মৃত শ্রমিকদের পরিবার ক্ষতিপূরণ, বিমা ও বকেয়া মজুরি পেয়েছে কি না, প্রকাশ্য অগ্রগতি-তালিকা প্রয়োজন। কর্মীদের নিয়োগপত্র ও বিমার নথি না-থাকলে পরিবারকে দুর্ঘটনার পরে সম্পর্ক প্রমাণেই মাস কাটাতে হয়; শ্রম দপ্তরের আলাদা সহায়তাকেন্দ্র সেই বাধা কমাতে পারে। একই সঙ্গে বড় ঢালাইয়ের আগে কাঠামোগত স্থিতি, অস্থায়ী ঠেকনা, শ্রমিকের নিরাপত্তা-পরিকল্পনা এবং স্বাধীন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়মটি কাগজে থাকলেই যথেষ্ট নয়; ঢালাই শুরুর আগে দায়ী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরযুক্ত পরীক্ষা-তালিকা সংরক্ষণ ও আকস্মিক পরিদর্শন দরকার। অপরাধের বিচার অতীতের দায় স্থির করবে; নতুন গুদামের নিচে আর কোনও শ্রমিক চাপা না-পড়া নির্ভর করবে বর্তমান নির্মাণস্থলে সেই শিক্ষা প্রয়োগের উপর।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



