নিজের পুনর্নিয়োগে চন্দ্রশেখরনের ‘নির্ণায়ক ভোট’, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন টাটা ট্রাস্টসের

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে এন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল টাটা ট্রাস্টস।
- বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে চেয়ারম্যানের ‘কাস্টিং ভোট’—পক্ষে-বিপক্ষে সমান ভোট পড়লে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চেয়ারম্যান যে অতিরিক্ত ভোট দিতে পারেন।
- গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে এন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল টাটা ট্রাস্টস। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে চেয়ারম্যানের ‘কাস্টিং ভোট’—পক্ষে-বিপক্ষে সমান ভোট পড়লে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চেয়ারম্যান যে অতিরিক্ত ভোট দিতে পারেন।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু করে। টাটা ট্রাস্টস এই সিদ্ধান্তগুলিকে ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছে।
টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ মালিকানা টাটা ট্রাস্টসের হাতে। সংস্থার পরিচালন পর্ষদে ট্রাস্টসের মনোনীত দু’জন প্রতিনিধি রয়েছেন—নোয়েল টাটা ও বেণু শ্রীনিবাসন। রবিবার এক বিবৃতিতে ট্রাস্টস জানায়, ১৭ সেপ্টেম্বর চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একজন পরিচালক ভোট দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক ভোটের ভিত্তিতে তাঁকে আরও পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় পর্ষদ।
টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, টাটা সন্সের পরিচালনবিধি অনুযায়ী, ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সম্মতিসূচক ভোট ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পরিচালনবিধিতে এটি একটি স্বতন্ত্র শর্ত।” অর্থাৎ, পর্ষদে কতজন পরিচালক পক্ষে বা বিপক্ষে রয়েছেন, শুধু সেই সংখ্যার হিসাবেই কোনও সিদ্ধান্তের বৈধতা নির্ধারিত হয় না।
ট্রাস্টস বলেছে, “শর্তটি পূরণ হয়নি, ফলে প্রস্তাবটিও পাশ হয়নি। চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক ভোট দেওয়ার অধিকার তখনই প্রযোজ্য, যখন গোটা পর্ষদে পক্ষে ও বিপক্ষে সমান ভোট পড়ে। টাটা ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের মধ্যে ভোটাভুটির ক্ষেত্রে এই অধিকার প্রযোজ্য নয়। ভোটের ফল ৪–১ হল, না অন্য কোনও সংখ্যা হল, তা অপ্রাসঙ্গিক। একটি শর্ত হয় পূরণ হয়, নয় হয় না। এ ক্ষেত্রে শর্তটি পূরণ হয়নি।”
ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালক বেণু শ্রীনিবাসন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগকে সমর্থন করলেও নোয়েল টাটা বিপক্ষে ভোট দেন। সব মিলিয়ে চারজন পরিচালক প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। পর্ষদ ঘোষণা করে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে চন্দ্রশেখরনকে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পরে টাটা সন্সের বিবৃতিতে বলা হয়, “২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদের বৈঠকে পর্ষদের অনুরোধ মেনে নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে সম্মত হন চন্দ্রশেখরন। এর পরে পর্ষদ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সিদ্ধান্ত নেয়, বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে তাঁকে আরও পাঁচ বছরের জন্য কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগ করা হবে।”
পৃথক একটি আইনি মতামতে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ও জানিয়েছেন, ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের সম্মতিসূচক সমর্থন প্রয়োজন ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক ভোট দিয়ে পূরণ করা যায় না।
ট্রাস্টসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এখন এমন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, সমর্থন দিতে অস্বীকার করায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা সংস্থাকে অচল করে দিতে পারে। তাই সভার চেয়ারম্যান নির্ণায়ক ভোট দিয়ে পরিস্থিতির নিষ্পত্তি করার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সংস্থা অচল হয়ে পড়েনি, কোনও অচলাবস্থাও তৈরি হয়নি। পর্ষদ একটি প্রশ্ন তুলেছিল, আর পরিচালনবিধি তার নেতিবাচক উত্তর দিয়েছে। সংস্থার নিজস্ব গঠনতন্ত্রে দেওয়া সুরক্ষামূলক অধিকার প্রয়োগের অর্থ অচলাবস্থা নয়; বরং গঠনতন্ত্র যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবেই কাজ করেছে।”
টাটা ট্রাস্টসের দাবি, চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব বৈধভাবে গৃহীত হয়নি এবং এর কোনও আইনি কার্যকারিতা নেই। তাদের কথায়, “আইনের চোখে এটি গোড়া থেকেই অবৈধ।”
ট্রাস্টস আরও বলেছে, পরিচালনবিধি এমন কোনও সুবিধামতো ব্যবহারের বস্তু নয়, যা কাজে লাগলে মানা হবে, আর অসুবিধা হলে উপেক্ষা করা হবে। টাটা সন্স এই অবস্থান নিতে পারে না, কারণ অতীতে ঠিক উল্টো অবস্থান নিয়েই তারা সুপ্রিম কোর্টে জয় পেয়েছিল।
সাইরাস মিস্ত্রিকে অপসারণ ঘিরে মামলায় টাটা সন্সের পরিচালনবিধির ১০৪বি ও ১২১ অনুচ্ছেদে ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের দেওয়া সম্মতিসূচক ভোটের বিশেষ অধিকার সরাসরি বিচারাধীন হয়েছিল। জাতীয় কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনাল ওই অধিকারগুলিকে নিপীড়নমূলক বলে চিহ্নিত করেছিল। অভিযোগকারীরাও সেগুলি বাতিল করার অথবা তার পরিসর সীমিত করার আবেদন জানিয়েছিলেন।
ট্রাস্টসের বক্তব্য, “টাটা সন্স সেই প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছিল। সংস্থাটি এই অধিকারগুলিকে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বৈধ সুরক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এগুলি নিপীড়নমূলক তো নয়ই, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ট্রাস্টসের প্রাপ্য অধিকার।”
সুপ্রিম কোর্ট সংস্থার যুক্তি গ্রহণ করে এবং ওই বিধানগুলি নিপীড়নমূলক বলে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল, তা খারিজ করে দেয়।
ট্রাস্টস বলেছে, “যে সুরক্ষা অক্ষুণ্ণ রাখতে সংস্থা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল, এখন তা অস্বীকার করতে পারে না। ওই বিধানগুলি হয় পরিচালনবিধিতে রয়েছে, নয় নেই। টাটা সন্স ইতিমধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে জানিয়েছে, সেগুলি রয়েছে।”
শেয়ার বাজারে টাটা সন্সকে নথিভুক্ত করার যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ট্রাস্টস। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “একটি কাল্পনিক ফাঁক পূরণ করতে গিয়ে শতবর্ষের কাঠামো ভেঙে ফেলা আসলে বাদাম ভাঙতে মুগুর চালানোর শামিল। এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে যে, শেয়ার বাজারে নথিভুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো উচিত, কারণ এতে সংস্থা পরিচালনার মান উন্নত হবে।”
ট্রাস্টসের মতে, এই যুক্তির গোড়াতেই ধরে নেওয়া হচ্ছে যে সংস্থা পরিচালনায় কোনও ঘাটতি রয়েছে। অথচ তেমন কোনও ঘাটতি নেই। শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হওয়া বা না-হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই টাটা সন্স বহু বছর ধরে স্বেচ্ছায় একটি পাবলিক কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য মানদণ্ড মেনে চলছে।
তাদের বক্তব্য, টাটা সন্সের নিজস্ব পরিচালনবিধিতেই পাবলিক কোম্পানির উপযোগী একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে। তার মধ্যে আছে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ, নিরীক্ষা কমিটি এবং মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের বিধি এবং পর্যায়ক্রমে পরিচালকদের অবসরের ব্যবস্থা। পাশাপাশি, সংস্থার অপ্রকাশিত অভ্যন্তরীণ তথ্য কাজে লাগিয়ে শেয়ার লেনদেন রোধের আচরণবিধিও রয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।
আরও লেখা →সম্পর্কিত প্রতিবেদন
খবরখনিজে করের অধিকার কাড়ছে কেন্দ্র, অভিযোগ নবীনের; বিশেষ অধিবেশনের দাবি
সেপ্টেম্বর 21, 2026
খবরসাংবাদিকের বিরুদ্ধে পরোয়ানা: গুজরাত সরকার ও আদানি সংস্থাকে হাই কোর্টের নোটিস
সেপ্টেম্বর 21, 2026
খবর৮৫-তে ৯৬৫ নম্বর পেয়ে এমএ, এ বার লক্ষ্য পিএইচডি কিংবা আইন
সেপ্টেম্বর 21, 2026
খবর‘ফর্সা, ইংরেজি বলেন’,সংরক্ষণের সুবিধা অস্বীকারে রাজ্যের যুক্তি খারিজ হাইকোর্টে
সেপ্টেম্বর 21, 2026দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে
বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।