খবর

‘ফর্সা, ইংরেজি বলেন’,সংরক্ষণের সুবিধা অস্বীকারে রাজ্যের যুক্তি খারিজ হাইকোর্টে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: চার দশকেরও বেশি আগে খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দুধর্মে ফিরে এসেছিল পরিবারটি।
  • কিন্তু তাদের জাতিগত শংসাপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাজ্য সরকার।
  • সেই বিতর্কে উঠে আসে গায়ের রং ও ইংরেজিতে কথা বলার প্রসঙ্গও।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: চার দশকেরও বেশি আগে খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দুধর্মে ফিরে এসেছিল পরিবারটি। কিন্তু তাদের জাতিগত শংসাপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাজ্য সরকার। সেই বিতর্কে উঠে আসে গায়ের রং ও ইংরেজিতে কথা বলার প্রসঙ্গও। মাদ্রাজ হাইকোর্ট জানিয়েছে, জাতিগত পরিচয় যাচাইয়ের সঙ্গে এ ধরনের শারীরিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের কোনও প্রাসঙ্গিক সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে।

চেন্নাইয়ের শুল্ক বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিকুমারের জাতিগত শংসাপত্র ‘প্রকৃত নয়’ বলে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা খারিজ করেছে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্তের পক্ষে দেখানো কয়েকটি কারণ প্রাসঙ্গিক হলেও সেগুলির সমর্থনে যথেষ্ট ব্যাখ্যা বা প্রমাণ নেই। অন্য কয়েকটি যুক্তি গ্রহণযোগ্যই নয়।

১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে ‘হিন্দু আদি দ্রাবিড়’ সম্প্রদায়ের শংসাপত্র পান রবিকুমার। সেই শংসাপত্রের ভিত্তিতেই চাকরিতে যোগ দেন তিনি। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ মে তাঁর অবসর নেওয়ার কথা ছিল। তার কিছু দিন আগে শংসাপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৪ মে তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত জানায় সংশ্লিষ্ট কমিটি।

বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল দু’টি প্রশ্ন—রবিকুমারের হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তন প্রকৃত কি না এবং তাঁর জাতির মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছেন কি না। বিচারপতি লিখেছেন, ‘এই মামলায় আবেদনকারী যে তফসিলি জাতির মানুষ, তা নিয়ে কোনও বিরোধ নেই।’ বিচার্য বিষয় হল, তাঁর ধর্মে প্রত্যাবর্তনের দাবির সত্যতা।

রবিকুমারের বাবা জন্মসূত্রে হিন্দু আদি দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের ছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে খ্রিস্টান পরিবারেই জন্ম হয় রবিকুমারের। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে চেন্নাইয়ের আর্য সমাজ কেন্দ্রে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাবা ও ছেলে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন।

বাবার নাম আর আয়াভু জেমস থেকে বদলে হয় আর মুনুস্বামী। তাঁর নিজের নাম এ সৌন্দরারাজন থেকে হয় এম রবিকুমার। ১৯৮৬ সালের শংসাপত্রে ধর্মান্তরণ এবং হিন্দুধর্মে ফিরে আসার এই ইতিহাস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল।

যাচাই কমিটির সামনে রবিকুমার জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী হিন্দুধর্ম পালন করেন, সন্তানদের হিন্দু হিসেবেই বড় করেছেন এবং হিন্দু দেবদেবীর উপাসনা করেন। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, এক জন নৃতত্ত্ববিদ তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ঠাকুরঘরও দেখেছিলেন। রবিকুমারের বিয়ে, সন্তানদের মুণ্ডন ও কান ফোঁড়ানোর অনুষ্ঠান এবং মেয়ের হিন্দুমতে বিয়ের ছবিও পেশ করা হয়।

কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাজ্যের আইনজীবীর যুক্তি ছিল, পরিবারটি খ্রিস্টধর্ম পালন করে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে; অথচ চাকরি ও সংরক্ষণের সুবিধা পেতে নিজেদের হিন্দু বলে দাবি করছে। রবিকুমারের বাবাকে খ্রিস্টান কবরস্থানে সমাহিত করার প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। যাচাইয়ের সময় শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেন।

রবিকুমারের চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুতে বসবাস, তাঁর মায়ের আদি দ্রাবিড় পল্লির বাইরে থাকা এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় তাঁকে গ্রহণ করেনি বলে কমিটির সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন রাজ্যের আইনজীবী।

শুল্ক কমিশনারের আইনজীবী জানান, হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তনের দাবি করা হলেও পরবর্তী বিভিন্ন নথিতে রবিকুমারের বাবার আগের নামই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮৬ সালের শংসাপত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। একটি গির্জার চিঠিতেও বাবা ও ছেলের পুরনো নাম ছিল।

জবাবে রবিকুমারের আইনজীবী বলেন, তাঁর মক্কেলের ছোট ভাই খ্রিস্টানই থেকে গিয়েছিলেন। রবিকুমার যখন চেন্নাইয়ে কর্মরত ছিলেন, তখন ওই ভাই বাবার দেখাশোনা করেন এবং মৃত্যুর পরে সমাহিত করার ব্যবস্থাও করেন। তাঁর যুক্তি, বাবাকে কোথায় সমাহিত করা হয়েছে, তা দিয়ে ছেলের ধর্মবিশ্বাস নির্ধারণ করা যায় না। আদালত অবশ্য মনে করেছে, বাবার সমাধিস্থ হওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু অন্য কয়েকটি যুক্তি বিচারিক পর্যালোচনায় টেকেনি।

কমিটির একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, ‘১৯৯৪ সালের রেশন কার্ডে তাঁর মেয়ের নাম খ্রিস্টান নাম ছিল।’ রবিকুমার জানান, তাঁর প্রথম মেয়ের জন্মই হয়েছে ১৯৯৮ সালের ১০ নভেম্বর। বিচারপতি দেখেন, রাজ্যের ওই সিদ্ধান্তের সমর্থনে কোনও প্রমাণ নেই এবং আপাতদৃষ্টিতে তা টেকসইও নয়।

সম্প্রদায়ের মানুষ রবিকুমারকে গ্রহণ করেননি—এই সিদ্ধান্তের পক্ষেও সুনির্দিষ্ট কারণ বা তথ্য পাওয়া যায়নি। আদালত আরও জানায়, তাঁর চেহারা ও ভাষা নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা কোনও নৃতত্ত্ববিদের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপিত হয়নি।

আদালত বলেছে, কমিটির সিদ্ধান্তে উল্লিখিত কয়েকটি কারণ প্রাসঙ্গিক হলেও তার পক্ষে বিস্তারিত যুক্তি দেওয়া হয়নি; অন্য কয়েকটি কারণ গ্রহণযোগ্য নয়। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায় উল্লেখ করে বিচারপতি জানান, হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট জাতির মানুষের স্বীকৃতির ভিত্তিতে জাতিগত শংসাপত্র পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আদেশের অনলাইন প্রতিলিপি পাওয়ার চার সপ্তাহের মধ্যে রবিকুমারকে কমিটির সামনে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। নিজের ধর্মাচরণের পক্ষে ছবি ও অন্যান্য প্রমাণ জমা দিতে পারবেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় তাঁকে গ্রহণ করেছে, তার প্রমাণও পেশ করতে পারবেন।

রবিকুমার হাজির হওয়ার আট সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ দিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কমিটিকে। প্রয়োজন হলে কমিটি অতিরিক্ত প্রমাণও চাইতে পারবে।

তবে বিচারপতি স্পষ্ট করেছেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মান্তরিত হলেই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ধর্মের প্রতি দ্ব্যর্থহীন বিশ্বাস এবং সেই ধর্মের অনুসরণই এখানে বিবেচ্য।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles