ভোটার তালিকা থেকে বাদ, তার পর কী—অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শেষ হলেও তার অভিঘাত এখনও শেষ হয়নি বরং যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের শুরু হয়েছে…
- ভোটাধিকার হারানোর পরে তাঁদের রেশন বন্ধ হবে কি না, সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হবে কি না, আটক শিবিরে পাঠানো হবে কি না, এমনকি…
- নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শেষ হলেও তার অভিঘাত এখনও শেষ হয়নি বরং যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের শুরু হয়েছে আরও বড় এক অনিশ্চয়তার অধ্যায়। ভোটাধিকার হারানোর পরে তাঁদের রেশন বন্ধ হবে কি না, সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হবে কি না, আটক শিবিরে পাঠানো হবে কি না, এমনকি দেশ থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর নেই।
গত জুনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩৬ লক্ষ ৬০ হাজার আবেদন তখনও ১৯টি ট্রাইব্যুনালের বিবেচনাধীন ছিল। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে কতগুলি আবেদন গৃহীত হয়েছে এবং কত জনের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছে, সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নীরবতার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৫ আগস্ট।
ভোটার তালিকায় এখন যাঁদের নামের পাশে ‘এক্সক্লুডেড’ লেখা রয়েছে, তাঁদের অনেকেই জানেন না পরবর্তী পদক্ষেপ কী। নতুন ভোটার হিসাবে আবার আবেদন করতে হবে, নাকি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকেও মিলছে না নির্দিষ্ট নির্দেশ। সবচেয়ে বড় সমস্যা, বহু ক্ষেত্রে নাম বাদ দেওয়ার কারণ জানিয়ে লিখিত আদেশ দেওয়া হয়নি। ফলে আদালতে গেলেও কোন সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে জটিলতা।
বোলপুরের ৭২ বছরের সামসুল আলম এবং তাঁর মেয়ে সাবিয়া খাতুনের নাম ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে বাদ পড়েছে অথচ সামসুলের ছেলে ইন্তেখাব আলম ভোটার তালিকায় রয়েছেন। সামসুল কলকাতার একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন বলে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল না। শুনানিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের শংসাপত্র-সহ একাধিক নথি জমা দেওয়া হলেও বাবা ও মেয়ের নাম বাদ যায়। পরিবারের দাবি, সিদ্ধান্তের আগে তাঁদের কোনও বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়নি।
কলকাতা হাইকোর্ট ৪ আগস্ট সামসুলের আবেদন তিন মাসের মধ্যে পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে, সাবিয়ার আবেদন এখনও শুনানির অপেক্ষায়। তাঁর আশঙ্কা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার কারণে রেশনও একদিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আপাতত রেশন মিললেও মন্ত্রীদের বক্তব্য তাঁর পরিবারে ভয় বাড়িয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর জানিয়েছিলেন, বিশেষ নিবিড় সংশোধনে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা রাজ্যের কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। তবে যাঁদের আবেদন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন অথবা যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে আবেদন করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হবে। সরকারের এই অবস্থানই বাদ পড়া ভোটারদের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়েছে।
হুগলির আরামবাগের মঞ্জুরা বেগম জানতে পারেন, ১ জুলাই তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাবা-মা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিলেন এবং তিনি নিজেও আগে ভোট দিয়েছেন। নথি জমা দেওয়া ও শুনানিতে হাজির হওয়ার পরেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর ভাইবোনের সংখ্যাও ভুল লেখা হয়েছিল। একই পরিবারের অন্য সবাই তালিকায় থাকলেও বাদ পড়েছেন শুধু মঞ্জুরা।
তাঁর বুথ স্তরের আধিকারিক জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বুথের ১ হাজার ১৭ জন ভোটারের মধ্যে ১০৫ জনের নাম বাদ পড়েছে, তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা, তাঁদের অনেকেই প্রকৃত ভোটার কিন্তু কেন নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা তাঁর কাছেও নেই।
নিমতলা রেললাইনের পাশের বস্তিতে থাকা ৫০ বছরের আমিনা পাসোয়ান ফুলের মালা তৈরি করে দিনে প্রায় ২০০ টাকা উপার্জন করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পরে একাই ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। তাঁর ছেলে ভোটার তালিকায় থাকলেও আমিনার নাম বাদ পড়েছে। ট্রাইব্যুনালে আবেদন জমা দিয়েও তিনি কোনও প্রাপ্তিস্বীকার পাননি। বিধবা ভাতা ও রেশন বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে বাঁচবেন, সেটিই এখন তাঁর প্রধান চিন্তা। হাইকোর্টে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্যও তাঁর নেই।
একই এলাকার গৃহকর্মী পিঙ্কি দাস শুনানিতে হাজির হয়েছিলেন এবং ট্রাইব্যুনালে আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু তিনিও কোনও রসিদ পাননি। তাঁর স্বামী ভোটার তালিকায় আছেন, চার সন্তানের জন্মও কলকাতায়, অথচ পিঙ্কির নাম নেই। তাঁর সরল বক্তব্য, তিনি কখনও বিহারে ভোট দেননি এবং তিনি বাংলাদেশিও নন।
রাজাবাজারের রিকশাচালক শেখ ছোটু এবং তাঁর স্ত্রী গুড়িয়া বিবির নামও বাদ পড়েছে। ছোটুর ভাইয়েরা তালিকায় রয়েছেন এবং তাঁদের বাবার নাম ২০০২ সালের তালিকাতেও ছিল। একই নথির ভিত্তিতে ভাইয়েরা স্বীকৃতি পেলেও ছোটু বাদ পড়েছেন। গুড়িয়ার আশঙ্কা, প্রতিবেশীরা তাঁদের এখন সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবেন।
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কলকাতার বস্তিবাসী ৫৪ জনের আবেদন জমা দিতে সাহায্য করেছিল। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন কোনও প্রাপ্তিস্বীকারই পাননি। প্রত্যেককে আলাদাভাবে আদালতে যেতে হওয়ায় দরিদ্র মানুষদের সামনে আইনি লড়াইয়ের পথও কার্যত বন্ধ।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া আর নাগরিকত্ব হারানো এক বিষয় নয়। কিন্তু প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের অস্পষ্টতা সেই পার্থক্যকেই মুছে দিচ্ছে। ভোটাধিকার হারানোর সঙ্গে রেশন, পেনশন, ব্যাঙ্ক হিসাব, রান্নার গ্যাস এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিশেষ নিবিড় সংশোধন একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা ক্রমে মানুষের অস্তিত্ব ও সামাজিক পরিচয়ের সংকটে পরিণত হচ্ছে।
এই মানুষগুলি দেশ ছেড়ে কোথাও চলে যাননি। তাঁরা এখানেই কাজ করেন, কর দেন, সন্তান পালন করেন এবং বহু নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। মঞ্জুরা বেগমের কথায়, তাঁরা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, পৃথিবী থেকে চলে যাননি। এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব দ্রুত পূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা, প্রত্যেক সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ জানানো এবং সহজ ও বিনামূল্যের আপিল ব্যবস্থা তৈরি করা। তা না হলে গণতান্ত্রিক তালিকা সংশোধনের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনির্দিষ্টকালের নাগরিক আতঙ্কে রেখে দেওয়ার অভিযোগ এড়ানো কঠিন হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



