খবর

বিরোধীদের উদ্দেশে নয় ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য, ব্যাখ্যা রিজিজুর; তবু থামছে না বিতর্ক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যবহার করা ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হতেই ব্যাখ্যা দিতে এগিয়ে এলেন কেন্দ্রীয়…
  • তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী কোনও বিরোধী নেতা বা বিরোধী দলকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলেননি।
  • যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন, ভারতীয় সংবিধান মানেন না, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান কিংবা দেশের অখণ্ডতা নষ্ট করতে চান—মোদীর মন্তব্য কেবল তাঁদের উদ্দেশেই করা হয়েছিল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যবহার করা ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হতেই ব্যাখ্যা দিতে এগিয়ে এলেন কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী কোনও বিরোধী নেতা বা বিরোধী দলকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলেননি। যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন, ভারতীয় সংবিধান মানেন না, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান কিংবা দেশের অখণ্ডতা নষ্ট করতে চান—মোদীর মন্তব্য কেবল তাঁদের উদ্দেশেই করা হয়েছিল।

শনিবার স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশের জঙ্গল থেকে সশস্ত্র নকশালবাদ নির্মূল করার লড়াই প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু অস্ত্রধারী নকশালদের প্রভাব কমলেও তাঁদের চিন্তাধারার সমর্থকেরা এখনও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সক্রিয়। মোদীর ভাষায়, এই ‘দিমাগি নকশালরা’ হিংসা ও অরাজকতা সৃষ্টির সুযোগ খুঁজছেন এবং সমাজকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

মোদীর এই মন্তব্যের পরেই বিরোধীদের একাংশ অভিযোগ করে, সরকারের সমালোচক, সমাজকর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নতুন করে দাগিয়ে দিতেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে ‘শহুরে নকশাল’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, ‘আন্দোলনজীবী’ কিংবা ‘খান মার্কেট গ্যাং’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে সরকার-বিরোধী মতকে সন্দেহের চোখে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।

সমালোচনার মুখে রবিবার রিজিজু সমাজমাধ্যমে লেখেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী নেতাদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলেননি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই পরিচয়ের মধ্যে পড়বেন সেই সমস্ত ব্যক্তি, যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন এবং ভারতীয় সংবিধান প্রত্যাখ্যান করেন; যাঁরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান ও সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনার দাবি সমর্থন করেন; এবং যাঁরা শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ বিচ্ছিন্ন করে উত্তর-পূর্ব ভারতকে দেশের বাকি অংশ থেকে আলাদা করার কথা বলেন। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে ধৃত ছাত্রনেতা শরজিল ইমামের একটি পুরনো বক্তৃতার অংশও প্রকাশ করেন রিজিজু।

তবে রিজিজুর ব্যাখ্যা বিতর্ক মেটানোর বদলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। কারণ সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের পুনর্বহালের দাবি জানানো কোনও নিষিদ্ধ বা অসাংবিধানিক রাজনৈতিক অবস্থান নয়। জম্মু ও কাশ্মীরের একাধিক স্বীকৃত রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যেই এই দাবি জানিয়ে থাকে। ফলে মাওবাদী হিংসার সমর্থন, দেশভাগের ষড়যন্ত্র এবং একটি সাংবিধানিক ধারার পুনর্বহালের দাবিকে একই বন্ধনীর মধ্যে রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম সমাজমাধ্যমে লেখেন, “আমি দিমাগি নকশাল হতে গর্বিত।” পাল্টা রিজিজু তাঁর বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী যখন কোনও বিরোধী নেতার নামই করেননি, তখন দেশের একজন প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বেচ্ছায় সেই পরিচয় গ্রহণ করা বিস্ময়কর।

কংগ্রেস সাংসদ রেণুকা চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে আদৌ কী বোঝানো হচ্ছে? স্বাধীনতা দিবসের মতো উপলক্ষে লালকেল্লা থেকে নিজের দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে এমন অবমাননাকর বিশেষণ ব্যবহার করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। সিপিআই(এমএল) নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছেন, সরকারের বিরুদ্ধে সত্য কথা বললেই যদি কাউকে নকশাল বলা হয়, তবে সেই তকমা দিয়ে বিরোধীদের ভয় দেখানো যাবে না।

অন্য দিকে বিজেপির রাজ্যসভা সদস্য তথা উত্তরপ্রদেশ পুলিশের প্রাক্তন প্রধান ব্রিজলাল প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যকে সমর্থন করেছেন। তাঁর দাবি, ‘দিমাগি নকশালরা’ জঙ্গলে অস্ত্র হাতে থাকেন না; তাঁরা অধ্যাপক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কবি কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীর পরিচয়ে শহরে থেকে নিবন্ধ, সভা ও আলোচনার মাধ্যমে তরুণদের মনে হিংসাত্মক মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেন।

এই বক্তব্যই বিরোধীদের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। তাঁদের মতে, কে মাওবাদী মতাদর্শের সমর্থক আর কে সরকারের নীতির গণতান্ত্রিক সমালোচক—এই সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে যে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অতীতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে জানিয়েছিল, ‘শহুরে নকশাল’ নামে কোনও স্বীকৃত আইনি সংজ্ঞা নেই। সেই কারণেই নতুন ‘দিমাগি নকশাল’ অভিধার আইনি ও রাজনৈতিক অর্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

রিজিজু আপাতত বোঝাতে চেয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নিশানায় সামগ্রিকভাবে বিরোধী শিবির ছিল না। কিন্তু মোদীর মন্তব্যের বিস্তৃত পরিধি এবং রিজিজুর দেওয়া ব্যাখ্যার মধ্যে সাংবিধানিক মতবিরোধকেও অন্তর্ভুক্ত করার ফলে বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম। বরং দেশের নিরাপত্তা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ভিন্নমতের অধিকারের সীমারেখা কোথায়—‘দিমাগি নকশাল’ বিতর্ক শেষ পর্যন্ত সেই পুরনো অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles