আগাম সতর্কবার্তার পরেও এসআরএফটিআইয়ে ইট-বোতল, হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মিছিল ঘিরে ফের উত্তেজনা

যা জানা জরুরি
- এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের অশান্ত হয়ে উঠল কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট বা এসআরএফটিআই।
- রবিবার, ৪ অক্টোবর, বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের সামনে উত্তেজনা ছড়ায়।
- অভিযোগ, বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা পড়ুয়া ও শিক্ষকদের লক্ষ্য করে ইট, পাথর এবং জলের বোতল ছোড়া হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের অশান্ত হয়ে উঠল কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট বা এসআরএফটিআই। রবিবার, ৪ অক্টোবর, বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের সামনে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা পড়ুয়া ও শিক্ষকদের লক্ষ্য করে ইট, পাথর এবং জলের বোতল ছোড়া হয়। বিক্ষোভকারীরা গেট ঠেলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়।
অজয়নগর থেকে মিছিল করে প্রতিষ্ঠানের সামনে পৌঁছেছিলেন সংগঠনের সদস্যেরা। তাঁদের অভিযোগ, আগের রবিবার ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠান চলাকালীন স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতমাতার ছবির অবমাননা করা হয়েছিল। সেই অভিযোগ সামনে রেখেই এই কর্মসূচি। ফটকের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। অন্য দিকে, ভিতরে জড়ো হন ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকেরা। তাঁদের অনেকের মাথায় ছিল হেলমেট। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
এ দিনের ঘটনার আগে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন পড়ুয়ারা। তাঁদের বক্তব্য, শনিবারই কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়ে মিছিলের অনুমতি না দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনেরও দাবি ওঠে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে একই উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি দেন কলকাতার এসআরএফটিআই, পুণের এফটিআইআই এবং ইটানগরের চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছিল, রবিবার বিকেল চারটেয় এসআরএফটিআইয়ের প্রধান ফটক থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে জমায়েত হওয়ার কথা। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে পড়ুয়া ও প্রতিষ্ঠানের সদস্যেরা আহত হয়েছেন। সেই পরিস্থিতিতে এত কাছে আবার জমায়েত হলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। প্রতিষ্ঠানের আশপাশে কর্মসূচির অনুমতি বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
বিক্ষোভ চলাকালীন পড়ুয়াদের ‘নকশাল’ বলে আক্রমণ করেন মিছিলের কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়নের দাবিও ওঠে। ভিতর থেকে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা পাল্টা প্রতিবাদ জানান। এক পড়ুয়ার অভিযোগ, ফটকে থাকা বি আর আম্বেদকর ও মহাত্মা গান্ধীর ছবি ছিঁড়ে সেখানে ভারতমাতার ছবি লাগিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। ইট-বোতল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দেখা যায় ভিতরে থাকা পড়ুয়া ও শিক্ষকদের।
আহত হওয়ার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইটের আঘাতে অধ্যাপক দেবাশিস সেনশর্মা আহত হন। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যেরাও দাবি করেন, ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে ছোড়া জলের বোতলে তাঁদের কয়েকজন সমর্থক জখম হয়েছেন। ফলে ফটকের দু’দিকে দাঁড়ানো দুই পক্ষের মধ্যে হামলার অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ ওঠে। আগের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে এসে নতুন করে সংঘাত বাধার বিষয়টি ঘিরে ক্যাম্পাসে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে এসআরএফটিআইয়ের ছাত্রী স্নেহা মালাকার জানান, অন্তত দুই ছাত্রীর মাথায় পাথর লাগে; তাঁদের একজনের রক্তপাত হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর দাবি, দুপুর আড়াইটে থেকেই গেট বন্ধ ছিল এবং পড়ুয়ারা ভিতরে ছিলেন। বিপরীতে, মঞ্চের দক্ষিণবঙ্গের নেতা রোহিত শ দাবি করেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ সভা চলাকালীন প্রথমে ক্যাম্পাস থেকে পাথর ও বোতল ছোড়া হয়েছিল। সংগঠনের কেউ জোর করে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেননি বলেও তিনি দাবি করেন।
বিরোধের সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর। ওই দিন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাগৃহ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ক্যাম্পাসে বাইরের সংগঠনের অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি জানান একদল পড়ুয়া। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করার পরে সংগঠনের সদস্যেরা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মারধর করেন। অন্য দিকে, আয়োজকদের দাবি, পড়ুয়ারাই অনুষ্ঠান ভেস্তে দেন, ছবি ছেঁড়েন এবং তাঁদের সদস্যদের আক্রমণ করেন। সেই সংঘর্ষের পর থেকেই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে আন্দোলন চলছে।
সেপ্টেম্বরের ঘটনার তদন্তে রাজ্য সরকার ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে। ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীরা ক্যাম্পাসে গিয়ে পড়ুয়া, শিক্ষক এবং উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছেন; ঘটনার ভিডিয়োও পরীক্ষা করছেন। প্রাথমিক রিপোর্ট জমা পড়লেও তা প্রকাশিত হয়নি বলে পড়ুয়াদের অভিযোগ। তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শনিবারের বিবৃতিতেও ছাত্র সংসদ বলেছিল, সংগঠকদের উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান করার চেয়ে সম্ভাব্য বিপদ ঠেকানোই এখন জরুরি। তাঁদের বক্তব্য, বাইরের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষের অভিজ্ঞতার পরে পড়ুয়া, কর্মী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। যথেষ্ট সুরক্ষা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের কাছে আরেকটি জমায়েত হলে সেই দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছাত্র সংসদ বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রথম রিপোর্ট প্রকাশের দাবিও জানিয়েছে। এক পড়ুয়া জানিয়েছেন, আগের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হলে তাঁদের ভরসা ফিরতে পারত; তার মধ্যেই নতুন মিছিলের খবর আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়।
নতুন সংঘর্ষের পরে পড়ুয়াদের আন্দোলনের দাবি আরও কঠোর হয়েছে। দায় স্বীকার, আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা এবং উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে সমস্ত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। গ্রাহক পঞ্চায়েত ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের তরফে অবিলম্বে এফআইআর দায়েরের দাবিও উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের কাছে উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
পড়ুয়াদের নিরাপত্তার দাবি এখন তদন্তের ফল জানার দাবির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, শুধু পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে ঘোষণা করলে ভয় কাটবে না; বাস্তবে সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম সংঘর্ষের এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন জমায়েত ও হামলার অভিযোগ সেই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে। চলচ্চিত্র শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পরিবেশ ফেরানোর প্রশ্ন তাই আপাতত ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের প্রশ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



