উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে কংগ্রেসে রদবদল, সভাপতি আরাধনা মিশ্র, কার্যকরী সভাপতি ইমরান মাসুদ

যা জানা জরুরি
- উত্তরপ্রদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য সংগঠনে বড় রদবদল করল কংগ্রেস।
- শুক্রবার সন্ধ্যায় বিধায়ক আরাধনা মিশ্র মোনাকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং সাহারানপুরের সাংসদ ইমরান মাসুদকে কার্যকরী সভাপতি নিয়োগ করা হয়েছে।
- রাজ্যসভার সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারির মেয়ে আরাধনা মিশ্র দায়িত্ব নিলেন অজয় রাইয়ের জায়গায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উত্তরপ্রদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য সংগঠনে বড় রদবদল করল কংগ্রেস। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিধায়ক আরাধনা মিশ্র মোনাকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং সাহারানপুরের সাংসদ ইমরান মাসুদকে কার্যকরী সভাপতি নিয়োগ করা হয়েছে।
রাজ্যসভার সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারির মেয়ে আরাধনা মিশ্র দায়িত্ব নিলেন অজয় রাইয়ের জায়গায়। ২০২৩ সালের অগস্ট থেকে উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন রাই।
দলের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে উত্তরপ্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেসের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দেবিন্দর নিষাদ ও অলোক প্রসাদকেও নিয়োগ করেছেন।
অন্যদিকে, বিধানসভায় কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে আরাধনার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ফারেন্দার কংগ্রেস বিধায়ক চৌধরি বীরেন্দ্র সিংহ। ৪০৩ সদস্যের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় আরাধনা ও বীরেন্দ্রই কংগ্রেসের দুই বিধায়ক।
এই নিয়োগগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে কংগ্রেস। প্রদেশ সভাপতি পদে একজন ব্রাহ্মণ, কার্যকরী সভাপতি পদে একজন মুসলিম এবং সিনিয়র সহ-সভাপতির দুই পদে একজন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধি—দেবিন্দর নিষাদ—ও একজন দলিত—অলোক প্রসাদকে রাখা হয়েছে। এই বিন্যাস অনেকটাই ইন্ডিয়া জোটের শরিক সমাজবাদী পার্টির ‘পিডিএ’, অর্থাৎ পিছড়া, দলিত ও অল্পসংখ্যক বা অনগ্রসর, দলিত ও সংখ্যালঘুদের একত্র করার রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিদায়ী প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই এক্সে লিখেছেন, “আমার মতো একজন সাধারণ কর্মীর হাতে উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতির দায়িত্ব তুলে দেওয়ার জন্য রাহুল গান্ধীজি এবং কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। লড়াই এখনও চলছে। নতুন সভাপতি-সহ নবনিযুক্ত সমস্ত পদাধিকারীকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমরা লড়ব, আমরা জিতব!”
আরাধনা মিশ্রকে বেছে নেওয়ার তাৎপর্য
নির্বাচনের বছরে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রতাপগড়ের রামপুর খাস কেন্দ্রের তিন বারের বিধায়ক আরাধনা মিশ্রের উপর কংগ্রেসের নির্ভরতা তাঁর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক গুরুত্বই তুলে ধরছে।
তাঁর নিয়োগের তাৎপর্য শুধু এই নয় যে কংগ্রেস একজন মহিলাকে রাজ্য সংগঠনের শীর্ষে বসিয়েছে। প্রায় ১৫ বছর পরে উত্তরপ্রদেশে দলের নেতৃত্বে ফিরলেন একজন ব্রাহ্মণ মহিলা। এর আগে এই রাজ্যে কংগ্রেসের শেষ মহিলা সভাপতি ছিলেন রীতা বহুগুণা জোশী। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিজেপিতে।
উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হলেও আরাধনার নিজের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল তৃণমূল স্তর থেকে। শিক্ষাগত যোগ্যতায় এমবিএ আরাধনা ব্লক স্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০১৪ সালে বিধানসভায় যাওয়ার আগে তিনি ব্লক প্রমুখের দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৪ সালে রামপুর খাস থেকে প্রথম বার বিধায়ক নির্বাচিত হন আরাধনা। ২০১৭ সালে আসনটি ধরে রাখেন এবং ২০২২ সালে টানা তৃতীয় বার জয়ী হন। এই তিনটি জয় বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বাইরেও তাঁর নিজস্ব নির্বাচনী ভিত্তি তৈরি করেছে।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরার নেতৃত্বে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের প্রচারেও আরাধনা পরিচিত মুখ। প্রিয়াঙ্কার রাজ্য সফরগুলিতে তিনি তাঁর সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের ‘লড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ’—‘আমি মেয়ে, লড়তে পারি’—প্রচারেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
কংগ্রেস নেতাদের বর্ণনায়, আরাধনা তৃণমূল স্তরের কর্মী; সামাজিক ও গ্রামীণ উন্নয়নের কাজের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। তাঁর পরিচিতি অনুযায়ী, সমবায় ক্ষেত্র, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত।
ইমরান মাসুদের প্রত্যাবর্তন
সাহারানপুরের সাংসদকে কার্যকরী সভাপতি করার ফলে দলের নেতৃত্বে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য মুখ উঠে এল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে জাতীয় স্তরে আলোচনায় এসেছিলেন মাসুদ। সেই মন্তব্যের জেরে সমালোচনার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।
এর পরেও তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কিছু দিনের জন্য সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেওয়ার পরে কংগ্রেসে ফিরে আসেন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাহারানপুর থেকে জয়ী হন।
তাঁর নিয়োগকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মুসলিমদের সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নতুন সামাজিক সমীকরণ
কংগ্রেসের অন্দরে অনেকেই আরাধনা ও মাসুদের নিয়োগকে দলে ব্রাহ্মণ-মুসলিমের একটি নতুন সামাজিক সমীকরণের উত্থান হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনী জোট নিয়ে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের চলতি আলোচনাতেও মাসুদের পদোন্নতির প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে সাহারানপুরের এই সাংসদের সঙ্গে অখিলেশ যাদবের দলের বাক্যবিনিময় হয়েছে।
কখন এবং কী ভাবে দুই দলের একসঙ্গে কাজ করা উচিত, তা নিয়ে মাসুদ সরব। অন্যদিকে, আরাধনা ও তিওয়ারি পরিবারের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের সুসম্পর্ক রয়েছে বলেই মনে করা হয়।
ফলে কংগ্রেসের কিছু নেতার মতে, নতুন এই ব্যবস্থা দু’দিক থেকে কাজে আসতে পারে। একদিকে দলের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরিসর বাড়ানো, অন্যদিকে ২০২৭ সালের নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চালাতে পারেন, এমন নেতাদের সামনে রাখা।
পিডিএ-র সামাজিক ভিত্তিতে পৌঁছনোর চেষ্টা
উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এআইসিসি নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম নিজে দলিত। তার পাশাপাশি শুক্রবার কংগ্রেস নেতৃত্ব সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে একজন দলিত এবং নিষাদ সম্প্রদায়ের একজন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধিকে নিয়োগ করেছে।
দেবিন্দর নিষাদ দলের মৎস্যজীবী শাখার চেয়ারম্যান। অলোক প্রসাদ এর আগে দলের তফসিলি জাতি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্বাচনী এলাকা গোরক্ষপুরের বাসিন্দা।
জোটসঙ্গী সমাজবাদী পার্টির ‘পিডিএ’—অনগ্রসর, দলিত ও সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছনোর কৌশল অনুসরণ করেছে কংগ্রেস। এখন দলের নতুন রাজ্য নেতৃত্বের সামনে পরীক্ষা হল, নেতৃত্বে এই সামাজিক প্রতিনিধিত্বকে বাস্তবে তৃণমূল স্তরে সংগঠনের বিস্তারে রূপান্তরিত করা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



