সংশোধনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হলেই মৃত্যুদণ্ড: সুপ্রিম কোর্ট

যা জানা জরুরি
- অপরাধ যতই নৃশংস বা বীভৎস হোক, শুধু তার ভয়াবহতার ভিত্তিতে কোনও দোষীর সংশোধনের সম্ভাবনা নেই বলে ধরে নেওয়া যায় না।
- মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে সেই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হতে হবে।
- সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই কঠোর মাপকাঠি ফের স্পষ্ট করল সুপ্রিম কোর্ট।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অপরাধ যতই নৃশংস বা বীভৎস হোক, শুধু তার ভয়াবহতার ভিত্তিতে কোনও দোষীর সংশোধনের সম্ভাবনা নেই বলে ধরে নেওয়া যায় না। মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে সেই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হতে হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই কঠোর মাপকাঠি ফের স্পষ্ট করল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ জানিয়েছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কেন যথেষ্ট নয়, তা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের।
বেঞ্চের বক্তব্য, অপরাধের গুরুত্ব এবং অপরাধী সংশোধনের অযোগ্য কি না, দু’টি আলাদা প্রশ্ন। প্রথমটির উত্তর যতই উদ্বেগজনক হোক, তা দ্বিতীয়টির উত্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করে না। কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার আগে আদালতকে পৃথকভাবে দেখতে হবে, তাঁর আচরণে পরিবর্তন বা পুনর্বাসনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে কি না। যাবজ্জীবন কারাবাসের বিকল্প নিঃসংশয়ে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হলেই মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন উঠতে পারে। এই যাচাইয়ে অনুমানের পরিবর্তে প্রয়োজন প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রমাণের। এই মূল্যায়ন প্রতিটি দোষীর ক্ষেত্রে পৃথকভাবে করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রদেশে ছয় বছরের এক শিশুকে বারবার ধর্ষণ এবং হত্যার মামলায় এই নীতি প্রয়োগ করেছে শীর্ষ আদালত। অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল শিশুটির সৎবাবা। ২০১৮ সালে বিশেষ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট সেই সাজা বহাল রাখে। সুপ্রিম কোর্ট দোষসিদ্ধি বহাল রেখেছে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড বদলে স্বাভাবিক জীবনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছে। সাধারণ সাজা মকুবের সুবিধায় তার মুক্তির সুযোগ থাকবে না।
আদালত অপরাধের ভয়াবহতাকে বিন্দুমাত্র লঘু করেনি। যার দায়িত্ব ছিল শিশুটিকে রক্ষা করা, সেই অভিভাবকই তাকে ধারাবাহিক যৌন নির্যাতনের শিকার করেছিল। নির্যাতন গোপন রাখতে শিশুটিকে হত্যা করার বিষয়টিকে বেঞ্চ বিশেষ গুরুতর পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করেছে। চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়া এবং অপরাধ আড়াল করার চেষ্টাও গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবারের নারী ও শিশুদের প্রতি দোষীর পূর্ববর্তী হিংসাত্মক আচরণও আদালতের মূল্যায়নের বাইরে থাকেনি।
একই সঙ্গে বিচারপতিরা দোষীর ব্যক্তিগত ইতিহাস ও কারাবন্দি অবস্থার তথ্য পরীক্ষা করেছেন। অল্প বয়সে মাতৃহারা হওয়া, শৈশবের অবহেলা ও বঞ্চনা, আগে অন্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া এবং কারাগারে সন্তোষজনক আচরণকে সাজা নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করা হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন থেকেও এমন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি যে, তার সংশোধন অসম্ভব। রাষ্ট্রপক্ষ সেই অসম্ভাব্যতা প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
সাজা ঘোষণার পদ্ধতিতেও ত্রুটি চিহ্নিত করেছে সুপ্রিম কোর্ট। নিম্ন আদালত দোষী সাব্যস্ত করার দিনই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। বেঞ্চ মনে করিয়েছে, শাস্তি নির্ধারণের শুনানি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। দোষীকে নিজের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং শাস্তি লঘু করার পক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য পেশের কার্যকর সুযোগ দিতে হবে। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে সেই সুযোগের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
এই অবস্থান ভারতের প্রতিষ্ঠিত ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ নীতিরই ধারাবাহিকতা। বচন সিং মামলার সাংবিধানিক বেঞ্চের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হত্যার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ম, মৃত্যুদণ্ড ব্যতিক্রম। শাস্তি নির্ধারণে অপরাধের পরিস্থিতির পাশাপাশি অপরাধীর পরিস্থিতিও বিবেচ্য। ফলে অপরাধের নির্মমতার বিবরণ দিয়েই বিচার শেষ করা যায় না; সর্বোচ্চ দণ্ডের প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
বর্তমান মামলায় আদালত মনে করেছে, সাধারণভাবে সাজা মকুবের সম্ভাবনাযুক্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অপরাধের গুরুত্বের তুলনায় অপর্যাপ্ত হবে। তবে আমৃত্যু কারাবাস যথেষ্ট কঠোর বিকল্প। প্রায় আট বছরের বন্দিজীবন, যার বড় অংশ মৃত্যুদণ্ডের ছায়ায় কেটেছে, তাও বিবেচনায় এসেছে। এই সাজায় দোষীর স্বাধীনতা স্থায়ীভাবে সীমিত থাকবে এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তিও নিশ্চিত হবে। রায়ের তাৎপর্য এখানেই: ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করতে কঠোরতম কারাদণ্ডের পথ খোলা থাকলে, সংশোধনের সম্ভাবনা যাচাই না করে মৃত্যুদণ্ড বেছে নেওয়া চলে না। কোনও অপরাধের প্রতি আইনের তীব্র নিন্দা এবং অপরাধীর জীবন নেওয়ার অপরিহার্যতা যে এক বিষয় নয়, সেই পার্থক্যও এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



