কলেজছাত্রীদের তিন বছরে ৫০ হাজার টাকা, ‘নিবেদিতা’ প্রকল্পে সায় মন্ত্রিসভার

যা জানা জরুরি
- উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা, সরকারি চাকরি এবং স্বল্পবেতনের কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধিকে সামনে রেখে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভা।
- সোমবার, ৫ অক্টোবর নবান্নে বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কলেজে পাঠরত অবিবাহিত ছাত্রীদের জন্য চালু হচ্ছে ‘ভগিনী নিবেদিতা’ প্রকল্প।
- পাশাপাশি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ১৪,৪৫৪টি শূন্যপদে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা, সরকারি চাকরি এবং স্বল্পবেতনের কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধিকে সামনে রেখে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভা। সোমবার, ৫ অক্টোবর নবান্নে বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কলেজে পাঠরত অবিবাহিত ছাত্রীদের জন্য চালু হচ্ছে ‘ভগিনী নিবেদিতা’ প্রকল্প। পাশাপাশি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ১৪,৪৫৪টি শূন্যপদে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পুজোর মুখে এই ঘোষণাগুলির কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান।
নতুন প্রকল্পে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করা অবিবাহিত ছাত্রীরা তিন বছরে মোট ৫০ হাজার টাকা পাবেন। প্রথম বর্ষে দেওয়া হবে ১৭ হাজার টাকা, দ্বিতীয় বর্ষেও সমপরিমাণ অর্থ এবং তৃতীয় বর্ষে ১৬ হাজার টাকা। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়া হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। নির্বাচনী সংকল্পপত্রে ছাত্রীদের এই আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। মন্ত্রিসভার অনুমোদনকে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পটি কন্যাশ্রী প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশ বা ‘কন্যাশ্রী–২’-এর জায়গা নেবে। আগের ব্যবস্থায় যোগ্য অবিবাহিত মেয়েদের ১৮ বছর বয়সে এককালীন ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার সংস্থান ছিল। নতুন ব্যবস্থায় মোট সহায়তা দ্বিগুণ হলেও তা একবারে মিলবে না; কলেজের তিন বছরে ভাগ করে দেওয়া হবে। ফলে শুধু টাকার অঙ্ক নয়, সহায়তা দেওয়ার সময় ও পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে।
তবে আবেদনকারীদের জন্য কয়েকটি বিষয় এখনও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পরিবারের আয়ের সীমা থাকবে কি না, কোন ধরনের কলেজ বা পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত হবে, কী নথি লাগবে এবং আবেদন কীভাবে করতে হবে— সংবাদপ্রতিবেদনগুলিতে তার পূর্ণ বিবরণ নেই। আগে কন্যাশ্রীর টাকা পাওয়া ছাত্রীরা নতুন সুবিধা পাবেন কি না, সেটিও বিস্তারিত নির্দেশিকায় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ঘোষণার ভিত্তিতে তাই সব কলেজছাত্রীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সুবিধার আওতাভুক্ত ধরে নেওয়া যাবে না।
শিক্ষাসহায়তার এই কাঠামোর তাৎপর্য হলো, কলেজে ভর্তি হওয়ার পরের বছরগুলিতেও অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকছে। বই কেনা, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি বা অন্যান্য পড়াশোনার খরচে সেই টাকা কাজে লাগতে পারে। তবে শুধু ভর্তি হলেই শিক্ষাজীবনের বাধা দূর হয় না। নিয়মিত ক্লাস, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। কারণে নগদ সহায়তার সাফল্য বিচার করতে হবে ছাত্রীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগের সঙ্গে মিলিয়ে।
চাকরির ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদিত ১৪,৪৫৪টি পদে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং রাজ্য পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা ও নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবে। সরকারের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের বকেয়া নিয়োগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীসংখ্যা বাড়ানো হবে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, বন, দমকল ও জরুরি পরিষেবা এবং সংশোধনাগারসহ একাধিক দপ্তরে নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অর্থ আবেদন গ্রহণ শুরু হয়ে যাওয়া নয়। কোন পদে কতজন নেওয়া হবে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমা ও পরীক্ষার সূচি জানতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী সংস্থার বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতে হবে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সেই বিজ্ঞপ্তিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
চলতি অর্থবর্ষে রাজ্যে এক লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যের কথাও আবার বলেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, পিএসসি এখন বকেয়া পরীক্ষা ও নিয়োগের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনও ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে। পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ করেন, ওবিসি শংসাপত্র নিয়ে জটিলতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আটকে ছিল। এগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রশাসনিক অগ্রগতির দাবি।
মন্ত্রিসভার আরেকটি সিদ্ধান্তে ‘কর্মবন্ধু’দের মাসিক পারিশ্রমিক পাঁচ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে বাড়ছে তিন হাজার টাকা, যা আগের অঙ্কের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি। অক্টোবর থেকেই বর্ধিত পারিশ্রমিক কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কম পারিশ্রমিকে কাজ করা এই কর্মীদের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ সামলানোর ক্ষেত্রে বৃদ্ধিটি সহায়ক হতে পারে, যদিও তার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে নিয়মিত টাকা পাওয়ার ওপর।
তফশিলি জাতি ও তফশিলি জনজাতির হস্টেলবাসী পড়ুয়াদের খাবারের জন্য মাসিক বরাদ্দও বাড়ছে। এতদিন এই খাতে দেওয়া হতো ১,৮০০ টাকা; নতুন বরাদ্দ হবে ৩,৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে বাড়ছে দেড় হাজার টাকা। সরকারি হস্টেলে থাকা সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার অনুদানের পাশাপাশি আবাসিক পড়ুয়াদের খাদ্যব্যয়ের সহায়তাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এল একই বৈঠকে।
পুলিশে নিয়োগের বিষয়েও পৃথক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সংবাদসংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার পদের নিয়োগসংক্রান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠান হবে। সেদিন প্রায় পাঁচ হাজার প্রার্থীকে নিয়োগপত্র দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন অনুমোদিত শূন্যপদ এবং এই নিয়োগপত্র বিতরণের ঘোষণাকে তাই আলাদা পর্যায়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বোঝা প্রয়োজন।
পুলিশি পরিষেবার ক্ষেত্রে ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন রাজ্যে ১১২ জরুরি পরিষেবা নম্বর চালুর ঘোষণাও হয়েছে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে থানাগুলির জন্য নতুন গাড়ি ও মোটরসাইকেল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জরুরি খবর পাওয়ার পরে পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর সময় কমানোই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। কর্মী নিয়োগের সঙ্গে বাহিনীর চলাচল ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও উন্নত করতে চাইছে সরকার।
সিদ্ধান্তগুলির বাস্তব গুরুত্ব বিচার করতে হবে কার্যকর হওয়ার পরে। কলেজছাত্রীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুদান পড়াশোনার খরচ সামলাতে সাহায্য করতে পারে; চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি স্বচ্ছ পরীক্ষা, নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং শেষ পর্যন্ত কাজে যোগদানের সুযোগ। সরকার যে সময়সীমা জানিয়েছে, তার মধ্যে কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেটিই এখন নজরে থাকবে। ঘোষণার পাশাপাশি প্রকল্পের বিস্তারিত নিয়ম, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং সুবিধাপ্রাপকদের কাছে অর্থ পৌঁছনোর ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



