হাইলাইটস

  • দীর্ঘ প্রায় আট বছর কলকাতা পুরসভার নেতৃত্বে ছিলেন ফিরহাদ হাকিম।
  • জল সরবরাহ, নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তি ও দৈনন্দিন পরিষেবায় কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
  • বেআইনি নির্মাণ, জলাবদ্ধতা ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন থেকে গেছে।
  • মাঠে নেমে কাজ করা মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও শহরের রূপান্তরমূলক পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি।
  • সামগ্রিক বিচারে তাঁর মেয়রত্বকে মাঝারি মানের সাফল্য ও অপূর্ণ সম্ভাবনার মিশ্রণ বলা যায়।

একজন সর্বক্ষণ দৃশ্যমান মেয়র

কলকাতা পুরসভার সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফিরহাদ হাকিমের মতো এতটা দৃশ্যমান মেয়র খুব কমই দেখা গেছে। শহরের কোথাও রাস্তা ভেঙেছে, কোথাও জল জমেছে, কোথাও ড্রেন বন্ধ হয়ে গিয়েছে—সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় সেখানে পৌঁছে যেতেন তিনি। সাধারণ নাগরিকের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তিনি অন্তত সমস্যার কথা শুনতেন।

এই সহজলভ্যতার রাজনীতি তাঁকে জনপ্রিয় করেছে। কিন্তু একজন মেয়রের মূল্যায়ন কেবল তাঁর উপস্থিতি দিয়ে হয় না। প্রশ্ন হল, তাঁর আমলে কলকাতা কতটা বদলেছে?


নাগরিক পরিষেবায় উন্নতির দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায় না

ফিরহাদ হাকিমের সমর্থকেরা প্রথমেই জল সরবরাহের প্রসঙ্গ তুলবেন। গত কয়েক বছরে কলকাতার প্রান্তিক ও নবসংযুক্ত বহু এলাকায় পানীয় জলের পাইপলাইন পৌঁছেছে। এমন অনেক অঞ্চল ছিল যেখানে আগে ট্যাঙ্কার বা গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হত। সেই পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

একইভাবে নাগরিক অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘টক টু মেয়র’-এর মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। নাগরিকরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধানও পেতেন।

শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার ক্ষেত্রেও পুরসভার কর্মতৎপরতা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে অনেকের মত। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, বিশেষ পরিষ্কার অভিযান এবং ওয়ার্ডভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার ফলে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা গেছে।


জলাবদ্ধতা: আংশিক সাফল্য, পূর্ণ ব্যর্থতা নয়

কলকাতার জলাবদ্ধতার সমস্যা শতাব্দীপ্রাচীন। তাই কোনও মেয়রের পক্ষে একে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সহজ নয়।

ফিরহাদের আমলে নতুন পাম্পিং স্টেশন তৈরি হয়েছে, পুরনো নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার হয়েছে এবং বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে কিছু এলাকায় আগের তুলনায় দ্রুত জল নামতে দেখা গেছে।

তবে এটাও সত্য যে প্রবল বৃষ্টির পর বেহালা, গার্ডেনরিচ, টালিগঞ্জ, পাটুলি কিংবা পূর্ব কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে জল জমার দৃশ্য এখনও প্রায় নিয়মিত। ফলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না।


সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা: বেআইনি নির্মাণ

যদি ফিরহাদ হাকিমের মেয়রত্বের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বেআইনি নির্মাণ।

গত কয়েক বছরে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম ভেঙে বহুতল নির্মাণ, অনুমোদনবিহীন সম্প্রসারণ এবং পুকুর ভরাটের অভিযোগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করলেও ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই বিষয়ে স্বয়ং মেয়রকেও একাধিকবার প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যদি মেয়র নিজেই বেআইনি নির্মাণ রুখতে না পারেন, তাহলে প্রশাসনিক দায় এড়ানো যায় কীভাবে?

এখানেই তাঁর নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


শহর কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে?

এখানেই মূল্যায়নের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে।

কলকাতার দৈনন্দিন পরিষেবার কিছু উন্নতি হয়েছে, কিন্তু শহরের চরিত্র কি বদলেছে?

দিল্লি মেট্রোকে কেন্দ্র করে নতুন নগরজীবন গড়ে তুলেছে। ইন্দোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জাতীয় মডেল হয়েছে। সুরত নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে কলকাতায় এমন কোনও বৃহৎ নগর-রূপান্তর প্রকল্প দেখা যায়নি যা আগামী কয়েক দশকের জন্য শহরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

ফলে ফিরহাদ হাকিমের আমলকে প্রশাসনিক রক্ষণাবেক্ষণের সময় বলা যেতে পারে, কিন্তু নগর পুনর্জাগরণের যুগ বলা কঠিন।


রাজনীতি বনাম প্রশাসন

ফিরহাদ হাকিমের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি একই সঙ্গে মন্ত্রী, দলের শীর্ষ নেতা এবং মেয়র ছিলেন।

এর সুবিধা যেমন ছিল, তেমনি অসুবিধাও ছিল। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় সহজ হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন যে পুরসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব অত্যধিক বেড়েছে।

একটি মহানগরের প্রশাসন চালানোর জন্য পূর্ণ সময়ের মনোযোগ প্রয়োজন। সেই সুযোগ তিনি সবসময় পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।


চূড়ান্ত রায়: না ব্যর্থ, না ঐতিহাসিক সফল

ফিরহাদ হাকিমকে এক কথায় ব্যর্থ মেয়র বলা অন্যায় হবে। কারণ তাঁর আমলে জল সরবরাহ, নাগরিক পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াশীলতার ক্ষেত্রে বাস্তব উন্নতি হয়েছে।

আবার তাঁকে কলকাতার সেরা মেয়রদের একজন বলাও কঠিন। কারণ বেআইনি নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর-দৃষ্টিভঙ্গির অভাব তাঁর প্রশাসনের বড় দুর্বলতা হয়ে থাকবে।

ইতিহাস সম্ভবত তাঁকে এমন একজন মেয়র হিসেবেই মনে রাখবে, যিনি শহরকে সচল রেখেছিলেন, সমস্যার কথা শুনেছিলেন, মাঠে নেমে কাজ করেছিলেন; কিন্তু কলকাতাকে নতুন রূপ দেওয়ার যে ঐতিহাসিক সুযোগ তাঁর সামনে ছিল, তাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি।