হাইলাইটস:

  • আগামী ছয় মাসের মধ্যে শুরু হতে পারে জনগণনা।
  • জাতি-তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে দুটি বিকল্প বিবেচনায় কেন্দ্র।
  • স্বঘোষণা নাকি স্বীকৃত জাতির তালিকা—কোনটি হবে চূড়ান্ত, তা এখনও স্থির নয়।
  • আরএসএস-সহ একাধিক মহল স্বঘোষণা পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
  • প্রশাসনিক নির্ভুলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ারআগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশজুড়ে বহু প্রতীক্ষিত জনগণনা শুরু করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে কেন্দ্র। এবারের জনগণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় হল জাতি (কাস্ট) সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ। সেই তথ্য কীভাবে নেওয়া হবে, তা নিয়ে সরকারের অন্দরে এখনও আলোচনা চলছে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, দুটি সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে—এক, প্রত্যেকে নিজের জাতি নিজেই জানাবেন (স্বঘোষণা বা সেলফ-ডিক্লারেশন); দুই, সরকার স্বীকৃত জাতিগুলির একটি নির্দিষ্ট তালিকা বা ড্রপ-ডাউন মেনু থেকে উত্তরদাতা নিজের জাতি নির্বাচন করবেন।

সরকারি সূত্রের মতে, জনগণনার মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে তথ্যের নির্ভুলতা ও একরূপতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বঘোষণার ক্ষেত্রে মানুষ নানা বানান, আঞ্চলিক নাম বা উপগোষ্ঠীর পরিচয় লিখতে পারেন। ফলে একই জাতির জন্য বহু ধরনের নাম উঠে আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরবর্তী তথ্য বিশ্লেষণকে জটিল করে তুলতে পারে।

এই কারণেই আর একটি বিকল্প হিসেবে স্বীকৃত জাতিগুলির তালিকা থেকে নির্বাচন করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। ডিজিটাল জনগণনা ব্যবস্থায় এটি একটি ড্রপ-ডাউন মেনুর মাধ্যমে করা যেতে পারে। এতে তথ্যের মান একরকম থাকবে এবং বিশ্লেষণও সহজ হবে বলে প্রশাসনের একাংশের মত।

তবে এই পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একই জাতির একাধিক স্থানীয় নাম প্রচলিত। আবার বহু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। নির্দিষ্ট তালিকার বাইরে থাকা কোনও গোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে না পারলে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তাই তালিকা কতটা বিস্তৃত হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্রের খবর, স্বঘোষণা পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে আরএসএস-সহ কয়েকটি সংগঠন। তাদের যুক্তি, সম্পূর্ণ উন্মুক্তভাবে জাতির নাম লেখার সুযোগ থাকলে একই সম্প্রদায়ের বহু ভিন্ন নাম উঠে আসবে। এতে সরকারি তথ্যভান্ডারে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ বা সংরক্ষণ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে, বহু সমাজবিজ্ঞানী ও সামাজিক সংগঠনের মতে, স্বঘোষণাই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কারণ মানুষের সামাজিক পরিচয় তিনি নিজেই নির্ধারণ করবেন। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পরিচয় সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হলে বাস্তব সামাজিক বৈচিত্র্যের পূর্ণ প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।

জনগণনায় জাতি-তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বড় পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলগুলি সর্বভারতীয় জাতগণনার দাবি জানিয়ে আসছিল। কেন্দ্র সেই দাবি মেনে নেওয়ার পর এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা, যা প্রশাসনিকভাবে কার্যকর, আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে কম বিতর্কিত।

জনগণনা পরিচালনার জন্য গণনাকারীদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা, তথ্য যাচাই এবং সফটওয়্যার প্রস্তুতির কাজও সমান্তরালে চলছে। জাতি-তথ্য সংগ্রহের চূড়ান্ত পদ্ধতি নির্ধারিত হলে সেই অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ও তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তিগত কাঠামোও চূড়ান্ত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম সর্বভারতীয় জনগণনায় জাতি-সংক্রান্ত বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি শুধু পরিসংখ্যানগত দিক থেকেই নয়, ভবিষ্যতের সামাজিক নীতি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষণা করা না হলেও, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জাতি-তথ্য সংগ্রহের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরই জনগণনার মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি পূর্ণমাত্রায় শুরু হবে।