হাইলাইটস:
- ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের মামলায় প্রকাশিত নথিতে অ্যামাজনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার দাম বাড়ানোর জন্য সরবরাহকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ।
- অভ্যন্তরীণ ই-মেল, উপস্থাপনা এবং সাক্ষ্যে দাবি, অ্যামাজন কম দামে বিক্রি হওয়া পণ্যকে অদৃশ্য করা, ক্ষতিপূরণ দাবি করা বা বিক্রি কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিত।
- অ্যামাজনের দাবি, তারা গ্রাহকদের জন্য কম দাম নিশ্চিত করতেই সরবরাহকারীদের সঙ্গে কঠোর দরকষাকষি করে; মূল্য-নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকায় বহু বছর ধরেই অ্যামাজন নিজেদের এমন একটি সংস্থা হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা অনলাইনে সবচেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের মামলায় প্রকাশিত একগুচ্ছ অভ্যন্তরীণ নথি ও ই-মেল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগ, অ্যামাজন শুধু নিজেদের দাম কম রাখতেই চায়নি, বরং সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে চাপ দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বিক্রেতাদের ওয়েবসাইটে একই পণ্যের দাম বাড়াতে বা সেইসব ওয়েবসাইট থেকে পণ্য সরিয়ে নিতে উৎসাহিত করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা আদালতের নথি, অভ্যন্তরীণ ই-মেল, উপস্থাপনা এবং বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে উঠে এসেছে, গত এক দশকে অ্যামাজন একাধিকবার সরবরাহকারীদের জানিয়েছে—যদি অন্য কোথাও একই পণ্য কম দামে বিক্রি হয়, তবে অ্যামাজন সেই পণ্যের বিক্রি কমিয়ে দেবে, নতুন অর্ডার বন্ধ করবে অথবা সরবরাহকারীকে লক্ষ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন এক ব্যবসায়িক কৌশল, যা ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টার মতে কার্যত মূল্য-নিয়ন্ত্রণের সমতুল্য। তাঁর অভিযোগ, অ্যামাজনের চাপের ফলে অনেক সরবরাহকারী বাধ্য হয়েছেন অন্য খুচরো বিক্রেতাদের কাছে নিজেদের পণ্যের দাম বাড়াতে অথবা তাদের কাছে সরবরাহ বন্ধ করতে।
একটি উদাহরণে দেখা যায়, “মডার্ন লেদার” নামে একটি টেবিল ল্যাম্পের দাম ওয়ালমার্টে ২৪.৯৯ ডলার থেকে বেড়ে ৩৯ ডলার হয়ে যায়। আরেকটি ঘটনায় একটি এয়ার ফ্রায়ারের দাম নিউএগ-এ ৮৪.৯৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৪৯.৯৯ ডলার হয়।
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা একটি বৈদ্যুতিক আইসক্রিম মেশিনকে ঘিরে। প্রথমে সেটি অ্যামাজন এবং বেস্ট বাই—দুই জায়গাতেই ১৭.৯৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। পরে বেস্ট বাই থেকে পণ্যটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং একই দিনে অ্যামাজনে তার দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯.৯৯ ডলার।
ক্যালিফোর্নিয়ার মামলায় বলা হয়েছে, ওই ঘটনার আগে অ্যামাজন সাময়িকভাবে প্রস্তুতকারক সংস্থা ম্যাক্সি-ম্যাটিকের পণ্য নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সংস্থাটি দ্রুত বেস্ট বাই থেকে নিজেদের মজুত প্রত্যাহার করে। ফলে প্রতিযোগিতা কার্যত শেষ হয়ে যায়। তারপরই অ্যামাজনে পণ্যটি আবার বিক্রির জন্য তোলা হয়, তবে তিন গুণেরও বেশি দামে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে রান্নাঘরের যন্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা শেফম্যানকে ঘিরেও। মামলার নথি অনুযায়ী, অ্যামাজন তাদের একটি এয়ার ফ্রায়ারের বিক্রি সীমিত করে দেয় এবং জানায়, প্রতিযোগীদের কম দামের কারণে অ্যামাজনের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ না দিলে ভবিষ্যতে একাধিক পণ্যের অর্ডার বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অভ্যন্তরীণ ই-মেল থেকে জানা যায়, এই চাপের মুখে শেফম্যান টার্গেট এবং নিউএগ-এর মতো বিক্রেতাদের কাছে ওই পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। পাশাপাশি অ্যামাজনকে অতিরিক্ত এক লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতেও রাজি হয়। সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্তা মার্ক ফ্রিডম্যান দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমি এখনও অ্যামাজনের সঙ্গে ব্যবসা করি। যে হাত আমাকে খাওয়ায়, তাকে কামড়াতে চাই না।”
ল্যাম্প প্রস্তুতকারী সংস্থা অল দ্য রেজেস-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ই-মেল সামনে এসেছে। সেখানে এক কর্মী অ্যামাজনকে জানান, বিভিন্ন খুচরো বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে “খুচরো দাম ঠিক করা” হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই বহু পণ্যের দাম বেড়েছে। দু’দিন পরে তিনি আবার জানান, ওয়ালমার্টে ল্যাম্পটির দাম ২৪.৯৯ ডলার থেকে ৩৯ ডলারে উঠেছে। তাঁর মন্তব্য ছিল, “এখন সব ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা।”
যদিও পরে ওই সংস্থা দাবি করে, এটি ছিল একটি মূল্য নির্ধারণের ভুল সংশোধনের ফল এবং কোন খুচরো বিক্রেতা কত দামে বিক্রি করবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদের নয়।
গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা প্রাক্তন অ্যামাজন কর্মীদের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অ্যামাজনের এক প্রাক্তন ভেন্ডর ম্যানেজার জানান, তিনি সরবরাহকারীদের স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার দাম যদি বাড়ানো যায়, তাহলে অ্যামাজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
আরেক প্রাক্তন কর্মীর দাবি, তাঁদের বলা হত, “টার্গেটে যান, ওয়ালমার্টে যান, তাদের দাম বাড়াতে বলুন।”
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, এই ধরনের সংবেদনশীল আলোচনা ই-মেলে না করার নির্দেশ দেওয়া হত। এক প্রাক্তন কর্মীর কথায়, “একটাই নিয়ম ছিল—এগুলো লিখিতভাবে করবেন না।”
আদালতে জমা দেওয়া অ্যামাজনের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ উপস্থাপনায়ও দেখা যায়, কর্মীদের কিছু আলোচনার ক্ষেত্রে “ই-মেল ব্যবহার না করার” পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের একটি ই-মেলেও বলা হয়, এ ধরনের বিষয় ফোনে আলোচনা করাই ভালো।
অবশ্য অ্যামাজন জানিয়েছে, তাদের সংস্থার নীতিতেই কর্মীদের প্রতিযোগীদের সঙ্গে মূল্য সংক্রান্ত কোনও সমঝোতা না করার নির্দেশ রয়েছে।
আরও একটি উদাহরণ এসেছে আসবাব প্রস্তুতকারী সংস্থা আর্মেন লিভিং-এর ক্ষেত্রে। ২০২০ সালের ব্ল্যাক ফ্রাইডের ঠিক আগে অ্যামাজন একটি অফিস চেয়ার নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দেয়। কারণ, অন্য এক বিক্রেতা সেটি এত কম দামে বিক্রি করছিল যে অ্যামাজন একই দাম মেলাতে গিয়ে প্রতিটি বিক্রিতে লোকসান করছিল।
অ্যামাজনের এক কর্মকর্তা সরবরাহকারীকে তিনটি বিকল্প দেন—প্রথমত ক্ষতিপূরণ দিন, দ্বিতীয়ত অ্যামাজনের কাছে কম দামে পণ্য বিক্রি করুন, অথবা তৃতীয়ত অন্য বিক্রয়মাধ্যম “পরিচালনা” করুন। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের অভিযোগ, “চ্যানেল ম্যানেজমেন্ট” বা “চ্যানেল অপ্টিমাইজেশন” ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী বিক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সাংকেতিক ভাষা।
এরপর আর্মেন লিভিং জানায়, তারা কম দামে বিক্রি করা বিক্রেতাদের চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনে তাদের কাছে সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। পরে তারা অ্যামাজনকে জানায়, “সমস্যাজনক” বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গার্ডিয়ানের হাতে আসা আরও কিছু উপস্থাপনায় দেখা যায়, অ্যামাজন কর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার নাম সরাসরি উল্লেখ না করার পরামর্শ দেওয়া হত। বরং বলা হত, “নীল রঙের একটি বিক্রেতা”—যা ওয়ালমার্টের প্রতি ইঙ্গিত বলে অভিযোগ।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা বলেন, “আপনি একে ‘দাম আপডেট’ বলুন বা ‘সমস্যার সমাধান’ বলুন, শেষ পর্যন্ত তার অর্থ একটাই—অন্যত্র দাম বাড়ান, নইলে শাস্তি ভোগ করুন। আর সেটাই বেআইনি।”
অন্যদিকে অ্যামাজনের দাবি, অভিযোগটি আইনগতভাবে টেকসই নয়। সংস্থার বক্তব্য, প্রায় দশ লক্ষ সরবরাহকারী-সংক্রান্ত যোগাযোগের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ই-মেলকে প্রসঙ্গচ্যুত করে একটি ষড়যন্ত্রের ছবি আঁকার চেষ্টা হচ্ছে। তাদের মতে, সরবরাহকারীদের সঙ্গে কঠোর দরকষাকষি করা খুচরো ব্যবসায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এর লক্ষ্য গ্রাহকদের জন্য কম দাম নিশ্চিত করা।
অ্যামাজন আরও জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা ঘটনাগুলির বেশিরভাগই বহু বছর আগের এবং সেগুলি এমন কিছু কর্মীর সঙ্গে সম্পর্কিত, যাঁদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাই ছিল না।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার মামলা ছাড়াও মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) পৃথক মামলা, সিয়াটলে একটি সমষ্টিগত দেওয়ানি মামলা এবং ওয়াশিংটন ডিসির অ্যাটর্নি জেনারেলের মামলা—সব মিলিয়ে অ্যামাজন এখন একাধিক মূল্য-নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ের মুখে। ক্যালিফোর্নিয়া এবং এফটিসির মামলার বিচার ২০২৭ সালের শুরুতে হওয়ার কথা।
এর আগে ২০২২ সালে “সোল্ড বাই অ্যামাজন” কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের মামলার নিষ্পত্তিতে অ্যামাজন ২২.৫ লক্ষ ডলার দিতে রাজি হয়েছিল। যদিও তখনও সংস্থাটি কোনও দায় স্বীকার করেনি।
মামলাগুলির চূড়ান্ত রায় এখনও হয়নি। ফলে অভিযোগগুলি এখনও আদালতে বিচারাধীন। কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রকাশিত নথিগুলি বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন খুচরো বিক্রেতার ব্যবসায়িক কৌশল এবং বাজারে তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।