Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মাইস্পেস ফিরছে?

মাইস্পেস ফিরছে?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
10 views 4 minutes read
A+A-
Reset

একটা সময় ছিল, যখন সোশ্যাল মিডিয়া মানেই অ্যালগরিদমের তৈরি অন্তহীন ফিড নয়। নিজের প্রোফাইল নিজের মতো সাজানো যেত। পছন্দের গান বাজত প্রোফাইলে ঢুকলেই। বন্ধুদের তালিকায় কে সবার আগে থাকবে, সেটাও ছিল আলাদা ব্যাপার।

আর সেই সময়ের অন্যতম রাজা ছিল মাইস্পেস

আজকের জেন জি-র কাছে নামটা হয়তো নস্ট্যালজিক কোনও ইন্টারনেট-গল্প। কিন্তু সহস্রাব্দ প্রজন্মের অনেকের কাছেই মাইস্পেস মানে প্রথম ডিজিটাল পরিচয়, নিজের মতো করে সাজানো একটি ভার্চুয়াল ঘর এবং ইন্টারনেটের এক তুলনায় অনেক বেশি ব্যক্তিগত সময়।

এ বার সেই পুরনো নামটাই কি ফিরতে চলেছে?

মাইস্পেসের বর্তমান মালিক ভ্যান্ডারহুক ভাইয়েরা সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্রে জানিয়েছেন, তাঁরা এখনও মাইস্পেসের মালিক এবং প্ল্যাটফর্মটিকে নতুন করে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তাঁদের কথায়, “মাইস্পেস এখনও আমাদেরই। আমরা ব্র্যান্ডটির রক্ষণাবেক্ষণ করছি। আমরা মাইস্পেসকে আবার চালু করব। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।”

কবে সেই ‘সঠিক সময়’, তার অবশ্য কোনও নির্দিষ্ট উত্তর এখনও নেই।

এক বার ফিরেছিল, টেকেনি

মাইস্পেসকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অবশ্য এই প্রথম নয়।

২০১৩ সালেও নতুন রূপে প্ল্যাটফর্মটি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন বিশেষ সফল হয়নি।

এ বার পরিস্থিতি আরও কঠিন।

২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের সেই স্বর্ণযুগের ইন্টারনেট আর নেই। এখন সামাজিক মাধ্যম মানেই অ্যালগরিদম-নির্ভর ফিড, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিয়ো, বিজ্ঞাপন এবং ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা।

ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট এবং রেডিটের মতো প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যেই ব্যবহারকারীদের অভ্যাস বদলে দিয়েছে।

এই বাজারে মাইস্পেসকে জায়গা করে নিতে হলে শুধু পুরনো নাম ফিরে আসাই যথেষ্ট হবে না।

তবে মজার ব্যাপার হল, বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্যাই হয়তো মাইস্পেসের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

যে ইন্টারনেটে ‘টম’ ছিল সবার বন্ধু

মাইস্পেসের জন্ম ২০০৩ সালে। টম অ্যান্ডারসন এবং ক্রিস ডিউলফ তৈরি করেছিলেন প্ল্যাটফর্মটি।

২০০৫ থেকে ২০০৮—এই কয়েক বছরেই মাইস্পেস হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০০৬ সালে আমেরিকায় গুগলকেও ছাপিয়ে যায় সেটি—ওয়েবসাইটটি তখন এতটাই জনপ্রিয়।

২০০৮ সালের মধ্যে প্রতি মাসে মাইস্পেসের দর্শকসংখ্যা ১১ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সংখ্যার থেকেও বড় ছিল তার চরিত্র।

মাইস্পেসে ব্যবহারকারী নিজের প্রোফাইলকে নিজের মতো করে সাজাতে পারতেন। রং বদলানো যেত। নকশা পাল্টানো যেত। পছন্দের গান বসানো যেত।

প্রোফাইলে ঢুকলেই সেই গান বাজত।

এমনকি ২০০৫ সালে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ইউটিউবের ভিডিয়োও মাইস্পেস প্রোফাইলে বসিয়ে দেওয়া যেত।

আর ছিল সেই বিখ্যাত ‘টম’।

নতুন অ্যাকাউন্ট খুললেই টম অ্যান্ডারসন হয়ে যেতেন আপনার প্রথম বন্ধু।

সেটাই ছিল সেই সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া—কম পালিশ করা, একটু অগোছালো, কিন্তু অনেক বেশি নিজের মতো।

তার পর এল ফেসবুক

মাইস্পেসের রাজত্ব অবশ্য চিরস্থায়ী হয়নি।

ফেসবুক দ্রুত জনপ্রিয় হতে শুরু করল। ব্যবহারকারী বদলালেন প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞাপনদাতারাও ঘুরে গেলেন নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে।

মাইস্পেস আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তত দিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে।

ভ্যান্ডারহুক ভাইয়েরা পরে প্ল্যাটফর্মটির মালিকানা নেন এবং নতুন করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁদের কথায়, ক্ষতি বাড়তেই থাকে।

ক্রিস ভ্যান্ডারহুকের দাবি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত তাঁদের ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ডলারের কিছু বেশি হয়েছিল।

মাইস্পেসের এক সময়ের সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ফেসবুকের ছায়ায়।

কিন্তু মানুষ কি আবার পুরনো ইন্টারনেট চাইছে?

এখানেই গল্পটা আবার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারী কী দেখবেন, কতক্ষণ দেখবেন এবং পরের ভিডিয়োটি কী হবে—তার বড় অংশই ঠিক করে অ্যালগরিদম।

একটি ভিডিয়ো শেষ হতে না হতেই আর একটি হাজির।

স্ক্রল থামানোর সুযোগ নেই।

আর এই অবিরাম ডিজিটাল দৌড় থেকেই তৈরি হচ্ছে ‘ডিজিটাল ক্লান্তি’।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের উপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশে আইনি ও নিয়ন্ত্রক চাপও বাড়ছে।

ফলে অনেক ব্যবহারকারীই এমন ডিজিটাল অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, যেখানে ফোন তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করবে না—বরং তাঁরা নিজেরাই ঠিক করবেন কী দেখবেন।

নতুন অ্যাপেও পুরনো নেশা কাটানোর চেষ্টা

এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে নতুন ধরনের অ্যাপের জনপ্রিয়তায়।

গুগল ল্যাবসের ‘ড্রিমবিনস’-এর মতো উদ্যোগ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন জীবনকে ঘিরে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিগত গল্প দেখানোর দিকে জোর দিচ্ছে। উদ্দেশ্য, অবিরাম স্ক্রলিংয়ের বদলে নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

অন্য দিকে ‘মিভো স্ক্রলিং’-এর মতো অ্যাপ ব্যবহারকারীর স্ক্রিন-টাইম এবং ফোন ব্যবহারের অভ্যাসের দিকে নজর রেখে সচেতন ভাবে পর্দার সময় কমাতে সাহায্য করতে চাইছে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল দুনিয়ায় একটা প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—

আরও বেশি কনটেন্ট চাই, নাকি আরও ভাল কনটেন্ট?

আর এই জায়গাতেই মাইস্পেসের জন্য একটি ছোট দরজা খুলতে পারে।

ফিরলে কেমন হবে নতুন মাইস্পেস?

মাইস্পেস যদি সত্যিই ফিরে আসে, তবে শুধু পুরনো লোগো আর নীল-কমলা স্মৃতি ফিরিয়ে আনলে চলবে না।

তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হতে পারে সেই পুরনো ধারণাগুলিই নতুন করে ফিরিয়ে আনা—

নিজের প্রোফাইল নিজের মতো সাজানো।

অ্যালগরিদমের বদলে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া।

ব্যক্তিগত জায়গার অনুভূতি তৈরি করা।

আর এমন একটি সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারকারী শুধু কনটেন্টের দর্শক নন, নিজের ডিজিটাল পরিচয়ের নির্মাতাও।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়।

ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ইউটিউবের মতো দৈত্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে ব্যবহারকারী এবং বিজ্ঞাপনদাতা—দুই পক্ষকেই আকৃষ্ট করতে হবে।

বর্তমানের কঠোর গোপনীয়তা, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক মাধ্যম সংক্রান্ত আইনও মেনে চলতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, মাইস্পেসকে বোঝাতে হবে—এটি শুধু পুরনো দিনের স্মৃতি বিক্রি করতে আসেনি।

নস্ট্যালজিয়া বনাম অ্যালগরিদম

প্রায় দুই দশক আগে ফেসবুকের কাছে যে সাম্রাজ্য হারিয়েছিল মাইস্পেস, তার ফিরে আসা নিঃসন্দেহে অদ্ভুত এক প্রত্যাবর্তন হবে।

কিন্তু হয়তো সময়টাও অদ্ভুত ভাবে তার পক্ষে।

কারণ মানুষ যখন অ্যালগরিদমের তৈরি অন্তহীন ফিডে ক্লান্ত, তখন এমন একটি সোশ্যাল মিডিয়ার কথা আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠতেই পারে যেখানে নিজের প্রোফাইল সত্যিই নিজের।

যেখানে পছন্দের গান নিজের।

ছবির বিন্যাস নিজের।

বন্ধু বাছাই নিজের।

আর পরের মুহূর্তে কী দেখতে হবে, সেটাও নিজের সিদ্ধান্ত।

তবে একটা জিনিস হয়তো আর ফিরবে না।

নতুন অ্যাকাউন্ট খুললেই টমকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া।

যদি না মাইস্পেস সত্যিই বুঝে থাকে—কখনও কখনও নস্ট্যালজিয়াই সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যালগরিদম।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles