Home সংস্কৃতি ও বিনোদন সিনেমার স্বর্গ মাল্টা: কীভাবে ইউরোপের ক্ষুদ্রতম দেশ হয়ে উঠল হলিউডের বড় ছবির প্রিয় ঠিকানা

সিনেমার স্বর্গ মাল্টা: কীভাবে ইউরোপের ক্ষুদ্রতম দেশ হয়ে উঠল হলিউডের বড় ছবির প্রিয় ঠিকানা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
3 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন রোম, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, এনিড ব্লাইটনের কল্পনার ‘ল্যান্ড অব স্পেলস’, দক্ষিণ ফ্রান্স কিংবা গেম অব থ্রোনস-এর ‘বে অব পেন্টস’—পর্দায় জায়গাগুলির মধ্যে কোনও মিল নেই। অথচ সাম্প্রতিক ও আসন্ন একাধিক ছবি ও ধারাবাহিকে এই সব জায়গার ভূমিকাই পালন করেছে ভূমধ্যসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টা। আয়তনে যা ইংল্যান্ডের শেফিল্ড শহরের চেয়েও বড় নয়।

গত এক দশকে আমেরিকা ও ব্রিটেনের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম পছন্দের শুটিং কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মাল্টা। বড় বাজেটের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা নিজেদের দেশে টেনে আনতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে কর-ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনার যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে অনেকটাই এগিয়ে মাল্টা।

গত তিন বছর ধরে প্রতি বছর ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রকল্পের শুটিং হয়েছে সেখানে। ২০২৩ এবং ২০২৫—দু’বছরেই সংখ্যাটি পৌঁছেছিল রেকর্ড ৩৬-এ। তালিকায় রয়েছে জুরাসিক ওয়ার্ল্ড রিবার্থ, রিডলি স্কটের গ্ল্যাডিয়েটর II, এনিড ব্লাইটনের কাহিনি অবলম্বনে দ্য ম্যাজিক ফারঅ্যাওয়ে ট্রি এবং জেসন স্ট্যাথামের নতুন অ্যাকশন থ্রিলার মিউটিনি

পর্দায় মাল্টার রূপ বদলেছে বারবার। বিবিসির টু উইকস ইন অগাস্ট-এ সেটি হয়েছে গ্রিস। হাইডি ইউইংয়ের আসন্ন ব্রিটিশ ছবি দ্য ট্রাভেল রাইটার-এ মাল্টা আশির দশকের সিসিলি। চ্যানেল ফাইভের অপরাধমূলক ধারাবাহিক দ্য ম্যাডাম ব্ল্যাঙ্ক মিস্ট্রিজ-এ সেটি দক্ষিণ ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চল। আবার গাই রিচির আসন্ন ভিভা লা ম্যাডনেস-এ মাল্টাই হয়ে উঠেছে ক্যারিবিয়ান।

এ বার অবশ্য মাল্টা শুধু অন্য দেশের ছদ্মবেশ ধারণ করছে না, নিজের পরিচয়েও পর্দায় আসতে শুরু করেছে। নেটফ্লিক্সের গোয়েন্দা ধারাবাহিক এনোলা হোমস-এর তৃতীয় পর্বে ভিক্টোরীয় লন্ডন থেকে কাহিনি চলে যাচ্ছে তৎকালীন ব্রিটিশ-অধিকৃত মাল্টায়। পাশাপাশি, ১৫৬৫ সালে অটোমান বাহিনীর মাল্টা অবরোধের প্রাক্কালকে কেন্দ্র করে স্টিফেন পোলিয়াকফের দ্য অর্ডার-এর মূল শুটিং আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা।

ব্রিটিশ ফিল্ম কমিশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাড্রিয়ান উটনের কথায়, ‘‘এত ছোট একটি ইউরোপীয় দেশ হয়েও মাল্টা নিজের ওজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে। নিজেদের চলচ্চিত্র শিল্পকে বহুমুখী করে তোলার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সক্রিয়।’’

মাল্টায় সিনেমার শুটিং অবশ্য নতুন নয়। ১৯২৫ সালের নির্বাক সামুদ্রিক ছবি সন্স অব দ্য সি থেকে তার ইতিহাস শুরু। সত্তরের দশক থেকে সেখানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম চলচ্চিত্র-শুটিংয়ের জলাধারগুলির মধ্যে দু’টি। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সমুদ্রের দৃশ্য ধারণের জন্য এগুলি ব্যবহার করেন নির্মাতারা।

তবে অতীতে মাল্টার চলচ্চিত্র শিল্প মূলত মরসুমি ছিল। মাল্টার ফিল্ম কমিশনার জোহান গ্রেশের কথায়, এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। ‘‘এখন আমাদের এমন একটি শিল্প রয়েছে, যা বছরের প্রতিটি দিন কাজ করছে।’’

এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রে অর্থ জোগানের পদ্ধতির বড় পরিবর্তন। একুশ শতকের গোড়া পর্যন্ত ইউরোপে ছবি বা টেলিভিশন প্রযোজনার বড় অংশের অর্থ আসত চলচ্চিত্র তহবিল বা নির্বাচিত সরকারি অনুদানের মতো প্রত্যক্ষ সাহায্য থেকে। গত দুই দশকে সেই জায়গা ক্রমশ দখল করেছে কর-ছাড় এবং নগদ অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা।

অর্থাৎ কোনও প্রযোজনা সংস্থা নির্দিষ্ট দেশে শুটিং করলে, স্থানীয় কর্মী নিয়োগ করলে কিংবা সেখানকার পরিকাঠামো ভাড়া নিলে খরচের একটি অংশ সরকার ফেরত দেয়। ইউরোপীয় অডিয়োভিস্যুয়াল অবজারভেটরির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বক্তব্য, এই ধরনের আর্থিক সুবিধা এখন ইউরোপীয় কাহিনিচিত্রের বাজেটের প্রায় অর্ধেক জোগাচ্ছে। ফলে ছবি বা ধারাবাহিক এখন আর শুধু কোনও জায়গায় গিয়ে শুটিং করে না—আর্থিক সুবিধার কথা মাথায় রেখেই অনেক ক্ষেত্রে শুটিংয়ের জায়গা বেছে নেওয়া হচ্ছে।

মাল্টা ২০০৫ সালে নগদ অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা চালু করেছিল। গত এক দশকে সেই সুবিধা ক্রমাগত বাড়ানো হয়েছে। নেপোলিয়ন এবং গ্ল্যাডিয়েটর II-এর প্রযোজকের ভাষায়, এটি সম্ভবত ‘‘বিশ্বের সবচেয়ে উদার নগদ ফেরতের ব্যবস্থা’’।

২০২৫ সালে মাল্টায় শুটিং হওয়া ৩৬টি বড় প্রযোজনার প্রত্যেকটিই ৪০ শতাংশ নগদ ফেরতের সুবিধা পেয়েছে। অন্য অনেক দেশের তুলনায় মাল্টার বিশেষত্ব হল, প্রয়োজনীয় কর্মী বা যন্ত্রপাতি স্থানীয় ভাবে না পাওয়া গেলে বিদেশ থেকে আনা কর্মী ও সরঞ্জামের খরচও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।

জুনে মাল্টায় অনুষ্ঠিত মেডিটেরেন চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রেশ জানিয়েছেন, ২০২৮ সালে বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ এনে প্রায় আট কোটি ইউরোর একটি নতুন স্টুডিয়ো কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনাও চলছে।

গ্রেশের দাবি, ‘‘নগদ ফেরত প্রকল্পে আমরা প্রতি এক ইউরো বিনিয়োগ করলে চলচ্চিত্র শিল্প অর্থনীতিতে চার ইউরো ফিরিয়ে দেয়। চলচ্চিত্র শিল্প এখন আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠছে।’’

তবে এই সাফল্যের সমালোচনাও রয়েছে। মাল্টার একাংশের চলচ্চিত্রকর্মীদের অভিযোগ, বিদেশি বড় প্রযোজনা আকর্ষণ করতে গিয়ে দেশের নিজস্ব পরিচালক, অভিনেতা এবং স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাণকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। মাল্টার নিজস্ব ছবি আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছেছে—এমন উদাহরণ এখনও হাতে গোনা। অ্যালেক্স কামিলেরির ২০২১ সালের লুজু, যা সানডান্স চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় ছিল, বিরল ব্যতিক্রম।

ফলে মাল্টার সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে গ্ল্যাডিয়েটর II-র মতো বিশাল আন্তর্জাতিক প্রযোজনাকে ধরে রেখে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, অন্য দিকে সেই অর্থ ও পরিকাঠামোর সুফল দেশের নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া। ভূমধ্যসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপটি ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বড় ‘চলচ্চিত্রের সেট’ হয়ে উঠেছে—এ বার প্রশ্ন, সেই সাফল্যের ভিতের উপর মাল্টা নিজের চলচ্চিত্র পরিচয়ও গড়ে তুলতে পারে কি না।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles