Home সংস্কৃতি ও বিনোদন মোহনলালের গাড়িচালক থেকে মালয়ালম সিনেমার ‘হিটমেকার’ অ্যান্টনি

মোহনলালের গাড়িচালক থেকে মালয়ালম সিনেমার ‘হিটমেকার’ অ্যান্টনি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 4 minutes read
A+A-
Reset

সিনেমা সফল হলে সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন নায়ক-নায়িকা, পরিচালক কিংবা চিত্রনাট্যকার। কিন্তু পর্দার আড়ালে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের সিদ্ধান্ত ও পরিশ্রম ছাড়া সেই সাফল্য সম্ভবই নয়। মালয়ালম চলচ্চিত্র জগতের অ্যান্টনি পেরুম্বাভুর তেমনই এক ব্যতিক্রমী নাম।

একসময় সুপারস্টার মোহনলালের গাড়িচালক ছিলেন তিনি। আজ সেই অ্যান্টনিই মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী প্রযোজক। তাঁর প্রযোজনা সংস্থা আশীর্বাদ সিনেমাস-এর ঝুলিতে রয়েছে একের পর এক ব্লকবাস্টার। কিন্তু এই সাফল্যের শুরুটা হয়েছিল একেবারে অন্য জায়গা থেকে।

মাত্র ২২ দিনের কাজ, বদলে গেল জীবন

১৯৮৮ সাল। পরিচালক সত্যন আন্তিকাদের পট্টণপ্রবেশম ছবির শুটিং চলছে। মোহনলালের জন্য একজন গাড়িচালকের প্রয়োজন ছিল। সেই কাজেই সুযোগ পান অ্যান্টনি পেরুম্বাভুর।

কাজটি ছিল মাত্র ২২ দিনের। কিন্তু সেই অল্প সময়ই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়।

প্রায় এক মাস পর বন্ধুদের সঙ্গে মুন্নাম মুরা ছবির শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন অ্যান্টনি। দূর থেকেই তাঁকে চিনে ফেলেন মোহনলাল। অভিনেতা নিজেই তাঁকে ডেকে আবার গাড়িচালকের কাজের প্রস্তাব দেন।

ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর মোহনলাল অ্যান্টনিকে বলেন, “অ্যান্টনি, তুমি আমার সঙ্গেই থেকে যাও।”

সেই মুহূর্ত থেকেই বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণ। অ্যান্টনি আর শুধু গাড়িচালক থাকেননি। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন মোহনলালের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী, বন্ধু এবং কার্যত পরিবারেরই একজন।

‘আমার সাফল্যের পেছনে অ্যান্টনির অবদান’

তিন দশকেরও বেশি সময়ের এই সম্পর্ক নিয়ে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মোহনলাল নিজেই অ্যান্টনির প্রতি তাঁর আস্থার কথা বলেছিলেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় একই সময়ে তাঁর জীবনে এসেছিলেন স্ত্রী সুচিত্রা এবং অ্যান্টনি। এমনকি মজা করে মোহনলাল বলেছিলেন, কখনও কখনও তাঁর স্ত্রীরও মনে হয়, তিনি হয়তো অ্যান্টনিকে তাঁর থেকেও বেশি ভালোবাসেন!

কারণটা অবশ্য সহজ—ভ্রমণ থেকে কাজ, জীবনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অ্যান্টনি ছিলেন তাঁর পাশে।

মোহনলালের কথায়, তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্য এবং জীবনের বহু ভালো কিছুর পেছনে অ্যান্টনির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এই সম্পর্ক যে শুধুই পেশাগত নয়, বরং গভীর ব্যক্তিগত আস্থার, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।

মোহনলালের উৎসাহেই প্রযোজনায়

মোহনলালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর অ্যান্টনির জীবনে আসে আরও বড় পরিবর্তন।

১৯৯০-এর দশকে মোহনলাল নিজেই প্রণবম আর্টস ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করেছিলেন। হিজ হাইনেস আবদুল্লা, ভারতম, কমলাদলম, কালাপানি এবং বানপ্রস্থম-এর মতো প্রশংসিত ছবি এই ব্যানারে তৈরি হলেও প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য সবসময় আসেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৯ সালে মোহনলাল প্রযোজনা থেকে সরে দাঁড়ান।

এরপর তাঁর উৎসাহেই অ্যান্টনি নিজে প্রযোজনার দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জন্ম নিল ‘আশীর্বাদ সিনেমাস’

অ্যান্টনি প্রতিষ্ঠা করলেন আশীর্বাদ সিনেমাস। ২০০০ সালে শাজি কৈলাস পরিচালিত নারসিমহম দিয়ে শুরু হল পথচলা।

প্রায় $1 million-এর সমপরিমাণ বাজেটে তৈরি ছবিটি প্রায় $22 million-এর ব্যবসা করে বিশাল সাফল্য পায়। পরের বছর রঞ্জিত পরিচালিত রাবণপ্রভু-ও বক্স অফিসে দারুণ সাড়া ফেলে।

দুটি ছবির সাফল্যই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছিল। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অ্যান্টনিকে।

একের পর এক হিট, বদলে গেল পরিচয়

আশীর্বাদ সিনেমাসের ব্যানারে এরপর তৈরি হয়েছে একাধিক জনপ্রিয় ছবি। তালিকায় রয়েছে—

  • নাট্টুরাজাভু (২০০৪)
  • নারান (২০০৫)
  • রসতন্ত্রম (২০০৬)
  • পরদেশি (২০০৭)
  • সাগর অ্যালিয়াস জ্যাকি রিলোডেড (২০০৯)
  • দৃশ্যম (২০১৩)
  • ওপ্পম (২০১৬)
  • আধি (২০১৮)
  • ওডিয়ান (২০১৯)
  • লুসিফার (২০১৯)
  • দৃশ্যম ২ (২০২১)
  • মারাক্কার: আরবিকাডালিন্টে সিংহম (২০২১)
  • ব্রো ড্যাডি (২০২২)
  • এল২: এমপুরান (২০২৫)
  • হৃদয়পূর্বম (২০২৫)
  • দৃশ্যম ৩ (২০২৬)

এই তালিকাই বলে দেয়, কেন অ্যান্টনি পেরুম্বাভুরকে মালয়ালম সিনেমার অন্যতম সফল প্রযোজক হিসেবে দেখা হয়।

সাম্প্রতিক বছরেও তাঁর প্রযোজনা সংস্থার দাপট অব্যাহত। এল২: এমপুরান প্রায় ২৬৬.৮১ কোটি টাকা এবং দৃশ্যম ৩ প্রায় ২৩৯.৮৩ কোটি টাকা ব্যবসা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোহনলালের পরিবারের সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক

অ্যান্টনির সঙ্গে মোহনলালের সম্পর্ক শুধু পেশার গণ্ডিতে আটকে নেই। দুই পরিবারের মধ্যেও তৈরি হয়েছে গভীর বন্ধন।

মোহনলালের ছেলে প্রণব মোহনলাল নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আশীর্বাদ সিনেমাস প্রযোজিত আধি ছবিতে। এবার মোহনলালের মেয়ে বিস্ময়া মোহনলালের প্রথম ছবি থুডাক্কম নিয়েও এই প্রযোজনা সংস্থার নাম জড়িয়ে রয়েছে।

অ্যান্টনি নিজেও শুটিংয়ের সময় নিয়মিত লোকেশনে উপস্থিত থাকেন। কাজের ক্ষেত্রে তাঁর শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি নজরে রাখার অভ্যাস ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

স্ত্রী শান্তি অ্যান্টনি এবং দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। মোহনলালের পরিবারের সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠতা এতটাই গভীর যে দুই পরিবারকে প্রায়ই একসঙ্গে সময় কাটাতে দেখা যায়।

চালকের আসন থেকে প্রযোজনার চেয়ারে

অ্যান্টনি পেরুম্বাভুরের গল্প আসলে শুধুই একজন সফল প্রযোজকের গল্প নয়। এটি আস্থা, নিষ্ঠা এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর গল্প

একসময় মাত্র ২২ দিনের জন্য মোহনলালের গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়েছিলেন অ্যান্টনি। সেই সামান্য কাজই তাঁকে এমন একজন মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে, যিনি পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পেশাগত সুযোগের দরজা খুলে দেন।

গাড়িচালক থেকে বিশ্বস্ত সহযোগী, সেখান থেকে প্রযোজক—আর তারপর একের পর এক সফল ছবির নির্মাতা। অ্যান্টনি পেরুম্বাভুরের উত্থান তাই মনে করিয়ে দেয়, জীবনের বড় মোড় অনেক সময় আসে ছোট্ট একটি সুযোগের হাত ধরেই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles