স্টার ট্রেকের জগতের বাইরে প্রজন্মভেদে কথ্যভাষা, রাজনীতি ও সামাজিক রীতিনীতিতে ফারাক প্রায় অনিবার্য। অথচ এই কল্পবিজ্ঞান ধারাবাহিকই পুরনো ও নতুন অনুরাগীদের মধ্যে যোগসূত্র হয়ে উঠেছে।

৭৬ বছর বয়সি ফ্র্যান ফ্রিডরিখের মূল ‘স্টার ট্রেক’ ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বের সংলাপ মুখস্থ। তাঁর বিশ্বাস, প্রয়োজন হলে স্মৃতি থেকেই সব সংলাপ আউড়ে যেতে পারবেন।

“ওদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও সংলাপ বলে যাই। এত অসংখ্য বার দেখেছি যে!” বললেন ফ্রিডরিখ। কেব্‌ল টেলিভিশনে প্রতি রাতে মূল ধারাবাহিকটির পুনঃসম্প্রচার দেখেন তিনি। পাশাপাশি দিনের বেলায় অনলাইনে দেখেন ‘স্টার ট্রেক’-এর অন্য ধারাবাহিকগুলিও। “এটা ছাড়া আমি থাকতে পারি না। আমার জীবনেরই একটা অংশ।”

ফ্রিডরিখের ছেলে রবার্টের স্মৃতিতেও ছবিটা একই রকম। নিজেকে তিনি ‘জন্মসূত্রে’ স্টার ট্রেকের অনুরাগী বলেন। তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে মা আর মাসিকে ওই ধারাবাহিকের নানা সংলাপ পরস্পরের উদ্দেশে বলতে শুনে। কখনও আবার দু’জনে একসঙ্গে একই সংলাপ বলে উঠতেন।

“কখনও বুঝতে পারতাম, কখনও পারতাম না,” বললেন রবার্ট। “আর যখন বুঝতাম না, তখনও জানতাম, এটা স্টার ট্রেক থেকেই এসেছে। সব সময়ই ওটা স্টার ট্রেকের সংলাপ হত।”

২০২৬ সালে ষাট বছরে পা দেওয়া এই কল্পবিজ্ঞান বিনোদনজগতের অনুরাগী কার্বনে গড়া প্রাণীরা—থুড়ি, মানুষেরা—অন্তত তিনটি প্রজন্ম জুড়ে ছড়িয়ে আছেন।

১৯৬৬ সালে যার শুরু হয়েছিল ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ মহাকাশযানের পাঁচ বছরের এক অভিযানের কাহিনি দিয়ে—লক্ষ্য ছিল, “সাহসের সঙ্গে সেখানে যাওয়া, যেখানে আগে কোনও মানুষ যায়নি”—আজ তা দুই শতাব্দীর বিভিন্ন সময়ে তৈরি পঁচিশটিরও বেশি ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে থাকা মহাকাশভ্রমণের এক বিপুল সংকলন।

একসময় জেমস টি কার্ক ছাড়া অন্য কাউকে ভাবাই যেত না। এখন কিন্তু এমন অনুরাগীর দেখা পাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়, যাঁদের পছন্দের অধিনায়ক পিকার্ড, জেনওয়ে কিংবা সিসকো। এতগুলি ধারাবাহিকের হিসাব রাখতে হয় যে অনুরাগীরা প্রায়ই দেশ চেনানোর সংক্ষিপ্ত সংকেতের মতো অক্ষরগুচ্ছ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। যেমন, টিওএস মানে ‘দ্য অরিজিনাল সিরিজ’, টিএনজি হল ‘দ্য নেক্সট জেনারেশন’, ডিএস৯ ‘ডিপ স্পেস নাইন’, ইএনটি ‘এন্টারপ্রাইজ’—এই রকম আরও কত।

স্টার ট্রেকের জগতের বাইরে প্রজন্মভেদে কথ্যভাষা, রাজনীতি এবং সামাজিক রীতিনীতির ফারাক প্রায় অনিবার্য বলেই ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু স্টার ট্রেক পুরনো ও নতুন অনুরাগীদের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে।

সেই সংযোগের একটা অংশ তৈরি হয় সকলের চেনা কিছু অনুষঙ্গ দিয়ে। সেখানে অধিনায়কের দিনলিপি থাকবেই, সময়ের হিসাব রাখা হবে নক্ষত্র-তারিখে, থাকবে এক থেকে দশ পর্যন্ত ‘ওয়ার্প’ গতির মাত্রা, ফেজার অস্ত্র এবং ফোটন টর্পেডো। আর মাঝেমধ্যে কোনও চিকিৎসক জোর দিয়ে বলে উঠবেন, “আমি একজন ডাক্তার, কোনও ____ নই!”

ভালকানদের বিশেষ অভিবাদনভঙ্গি এখন কোনও বিষয়ে মগ্ন একজন মানুষের আর এক সমমনস্ককে চিনে নেওয়ার সর্বজনীন সংকেত হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকৃত ‘ট্রেকি’রা—কেউ কেউ অবশ্য নিজেদের ‘ট্রেকার’ বলতে পছন্দ করেন—জানেন, “দীর্ঘজীবী হও, সমৃদ্ধ হও” কথাটি আসলে বার্তার অর্ধেক। যাঁকে বলা হচ্ছে, তাঁর উত্তর দেওয়ার কথা, “শান্তি ও দীর্ঘ জীবন।”

তবে এই ধারাবাহিকগুলির দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণ এবং যে সহজতায় প্রত্যেক প্রজন্মের মানুষ এর জগতে প্রবেশ করেন, তা বুঝিয়ে দেয়, সব বয়সের অনুরাগীদের মধ্যে মিল শুধু ভাষায় নয়, মূল্যবোধেও।

ক্যাথলিক পরিবারে বড় হওয়া ফ্রিডরিখ এখনও ধর্মবিশ্বাসী। চরিত্রগুলি পরস্পরের সঙ্গে যে ভাবে আচরণ করে, তার মধ্যেও তিনি নীতিবাক্যের মতো কিছু জীবনবোধ খুঁজে পেয়েছেন।

“সবাই সবার জন্য ভাবে,” বললেন তিনি। “এটা আমার বরাবর ভাল লেগেছে। কারণ, আমিও বেশ সহানুভূতিশীল মানুষ। আর এর সঙ্গে ঈশ্বরেরও যথেষ্ট যোগ রয়েছে।”

রবার্টও মায়ের সঙ্গে ধারাবাহিকটি দেখতে শুরু করার পর তার মধ্যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা খুঁজে পেয়েছিলেন। স্পক যখন বলেছিলেন, “শেষ পর্যন্ত, কোনও কিছু পাওয়াটা তাকে চাওয়ার মতো অতটা আনন্দের নয়,” তখন তাঁর মনে হয়েছিল, কথাটি “হয়তো বাইবেলের মতো কোনও জায়গা থেকে এসেছে”।

কোনও বিষয় নিয়ে মাকে এত স্বচ্ছন্দে মেতে থাকতে দেখে রবার্টও নিজের ভাললাগার একটি জগতে ডুবে যাওয়ার সাহস পেয়েছিলেন। তাঁর সেই জগৎ ছিল কমিকস।

এখন পঞ্চাশ বছর বয়সে নিজের দশ বছরের মেয়ের কাছে এই ধরনের গভীর অনুরাগকে স্বাভাবিক করে তুলতে পেরে তিনি আনন্দ পান।

“ছেলেমেয়েরা তো সব সময় কৌতূহল নিয়ে তাকাবেই, তাই না?” বললেন তিনি। “‘আরে, আমার মা কী করছে? বাবা কী করছে?’ আর এ ভাবেই বীজটা আবার বোনা হয়ে যায়।”

কিছু পরিবারে অবশ্য সেই বীজ বোনার ব্যাপারটা এত প্রচ্ছন্ন নয়।

লস অ্যাঞ্জেলেসের কৌতুকলেখক কার্ক জেমস ডামাটোর নাম রাখা হয়েছিল ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের অধিনায়কের নাম অনুসারে। সম্পর্কটা বিশেষ ভাবে স্পষ্ট করতে ক্যাপ্টেন কার্কের নাম ও পদবি উল্টে দেওয়া হয়েছিল তাঁর নামে।

একটি বার্তায় ডামাটো লিখেছেন, “কার্ক, স্পক এবং ম্যাককয়ের পারস্পরিক সম্পর্ককে আমার বাবা-মা খুবই মূল্য দিতেন।”

এক অর্থে তাঁর রক্ষা হয়েছিল বলেই মনে করেন ডামাটো। “ওঁরা আমার দাদার নাম স্পক রাখতে চেয়েছিলেন। সৌভাগ্যবশত, পরে সিদ্ধান্তটা নতুন করে ভেবেছিলেন।”

নাম যেন মানুষের ভবিষ্যতের পথও ঠিক করে দেয়—এই ধারণাকে সত্যি করেই ডামাটো স্টার ট্রেকের প্রেমে পড়ে যান। অনুরাগীদের সম্মেলনে যোগ দিতে থাকেন এবং ধারাবাহিকটির সঙ্গে নিজের মতো করে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

মৌলিক মানবতাবাদী আদর্শের সুবাদে রাজনৈতিক প্রশ্নে স্টার ট্রেকের ঝোঁক সাধারণত মধ্যপন্থার কিছুটা বাঁ দিকে। সেখানে এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করা হয়, যেখানে অভাবের আশঙ্কা মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে না; যেখানে প্রতিটি আদানপ্রদানের মধ্যেই অন্যের সংস্কৃতি ও সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা নিহিত থাকে। অর্থাৎ, এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে প্রত্যেকেই দীর্ঘ জীবন পায় এবং সমৃদ্ধ হয়।

আমার এক বন্ধু, যিনি দীর্ঘদিনের স্টার ট্রেক অনুরাগী, ধারাবাহিকটিকে বর্ণনা করলেন এই ভাবে: “আমাদের হাতে ভবিষ্যতের যত কল্পনা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে আশাবাদী।”