৬০ কোটির ‘প্রতারণা’: রাতভর তল্লাশির পরে ইডির জেরায় তৃণমূল সাংসদ নাদিমুল

যা জানা জরুরি
- উর্দু দৈনিকের আর্থিক লেনদেনে প্রায় ৬০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ নাদিমুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
- সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চলে।
- কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ‘আখবার-ই-মাশরিক’ সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহজনক লেনদেনের ব্যাখ্যা খোঁজা হচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইডি সূত্রের খবর, কলকাতা, দিল্লি ও রাঁচি মিলিয়ে সাতটি ঠিকানায় অভিযান চালানো হয়। তালিকায় ছিল কলকাতার পার্ক সার্কাসে সংবাদপত্রের দফতর এবং দিল্লিতে সাংসদের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। দিল্লির ঠিকানাটি তৃণমূলের দলীয় কাজেও ব্যবহৃত হয়। তদন্তকারীদের দাবি, সংবাদপত্রের দফতরের মাধ্যমে বেআইনি লেনদেন হয়েছে কি না এবং সেই অর্থের সঙ্গে তৃণমূলের তহবিলের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তল্লাশি শুরুর সময়ে নাদিমুল ছিলেন রাঁচিতে। সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পরে সোমবার রাত ১১টা ২০ মিনিট নাগাদ তাঁর নিজের গাড়িতেই কলকাতার দফতরে নিয়ে আসেন ইডির আধিকারিকেরা। এর পরে দফায় দফায় প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। রাতে দরগা রোডে তাঁর বোনের ফ্ল্যাট থেকেও কিছু নথি আনা হয়। দফতর থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র ও বৈদ্যুতিন যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করার খবরও জানিয়েছে ওই সংবাদমাধ্যম।
ব্যাঙ্কের হিসাব, লেনদেনের বিবরণ এবং বৈদ্যুতিন তথ্য পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা প্রায় ৬০ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইডি সূত্রের দাবি, ওই অঙ্কের লেনদেনের পক্ষে পর্যাপ্ত নথি নাদিমুল দিতে পারেননি। তবে এটি তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য। সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস বা লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে দায়ের হওয়া একটি এফআইআরের ভিত্তিতে ইডি তদন্ত শুরু করেছে। পরে কেন্দ্রীয় সংস্থা নিজস্ব মামলা নথিভুক্ত করে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বেআইনি ও হিসাববহির্ভূত লেনদেন এবং সন্দেহজনক উৎস থেকে অর্থ গ্রহণ। তদন্তকারীরা এখন আর্থিক নথির সঙ্গে লেনদেনের প্রকৃত গতিপথ মিলিয়ে দেখতে চাইছেন। কোন সূত্র থেকে টাকা এসেছে এবং কোথায় গিয়েছে, সেই প্রশ্নই তদন্তের কেন্দ্রে।
পিটিআইকে এক ইডি আধিকারিক জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট লেনদেনগুলি প্রকৃত ব্যবসায়িক আদানপ্রদান ছিল, নাকি হাওয়ালা-সহ অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ সরানো হয়েছিল, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সংবাদপত্রের আর্থিক কার্যকলাপের পাশাপাশি তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থ চলাচলের অভিযোগও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ফলে প্রকাশনা সংস্থার হিসাব এবং রাজনৈতিক দলের অর্থের মধ্যে কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তদন্তে আভাস মিলেছে সাংকেতিক ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেনেরও। ইডি সূত্র দাবি করেছে, ব্যক্তিগত ডিজিটাল ওয়ালেটে ৩০৭টি বিটকয়েন স্থানান্তরের তথ্য এবং হিসাবে দেড় কোটি টাকা নগদ দেখানো হলেও সমপরিমাণ অর্থ না মেলার বিষয়টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই তথ্যগুলির স্বাধীন সমর্থন অবশ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। নাদিমুলের তরফে তৃণমূলের এক সাংসদের দাবি, তাঁর লেনদেন বৈধ এবং করও দেওয়া হয়েছে। নাদিমুল সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীও। উর্দু দৈনিকটি যে সংস্থা প্রকাশ করে, তিনি তার অন্যতম পরিচালক। সেই সূত্রেই প্রকাশনা সংস্থার আয়ব্যয় এবং অর্থের উৎস নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।
অভিযানের প্রথম দিন নাদিমুল জানিয়েছিলেন, তিনি সরকারি প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সফরে রয়েছেন। রবিবার পটনায় থাকার পরে সোমবার কমিটির সঙ্গে রাঁচিতে গিয়েছিলেন। দিল্লির সরকারি বাসভবনে ইডির তল্লাশির বিষয়টি কমিটির চেয়ারম্যান এম থাম্বিদুরাইকে জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ, অভিযান শুরু হওয়ার সময় সংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে বাইরে থাকার কথা স্পষ্ট করেছিলেন সাংসদ। ইডি সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, কলকাতা ও দিল্লিতে তাঁর মেয়ে এবং জামাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বাড়িতেও অভিযান হয়েছে। তল্লাশির সময়ে নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ছিল।
অন্য দিকে, তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন এই অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দিল্লিতে ভবন ধসে পড়ুয়াদের মৃত্যুর ঘটনা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই তাঁদের সাংসদের বাসভবন ও দলীয় কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে তদন্তের সময় এবং লক্ষ্য নির্বাচনের বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।
ডেরেকের আরও অভিযোগ, নাদিমুল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বলেই তাঁকে নিশানা করা হচ্ছে। তাঁর পরিবার একটি উর্দু সংবাদপত্র চালায়, সেটিকেও আক্রমণের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন তৃণমূল নেতা। যদিও ইডির বক্তব্য, অভিযানের ভিত্তি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ। ফলে তল্লাশিকে ঘিরে সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক হিসাবের প্রশ্নের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার তৃণমূল এই তল্লাশিকে ‘অপারেশন লোটাস ২.০’-এর অংশ বলে বর্ণনা করেছে। দলের অভিযোগ, যাঁরা দলবদলে রাজি নন, তাঁদের উপর তদন্তের মাধ্যমে চাপ দেওয়া হচ্ছে। দিল্লির দফতরে তল্লাশি শেষ হওয়ার পরেও আধিকারিকেরা দীর্ঘ সময় ছিলেন বলেও দাবি করেছে দল। ডেরেক জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে রাজ্যসভার সভাপতির কাছে তাঁরা অভিযোগ জানাবেন। ডেরেকের অভিযোগ, দিল্লির কার্যালয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ে কর্মীদের হুমকিও দিয়েছেন তদন্তকারীরা।
মঙ্গলবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ফোন ও বার্তার উত্তর নাদিমুল দেননি বলে ওই সংবাদপত্র জানিয়েছে। ফলে ৬০ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে ইডির নির্দিষ্ট দাবির বিস্তারিত জবাব তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। পিটিআইয়ের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই মামলায় তখনও কাউকে গ্রেফতার করেনি ইডি। আপাতত জব্দ করা নথি, ব্যাঙ্কের হিসাব ও বৈদ্যুতিন তথ্য যাচাই করেই অভিযোগের ভিত্তি নির্ধারণের কাজ চলছে। তবে সন্দেহজনক লেনদেনের হদিশ পাওয়ার দাবি আর প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; উদ্ধার করা তথ্যের যাচাই এখনও বাকি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



