২৫ বছর আগে তিন বন্ধুর গল্প শুধু হিন্দি সিনেমার দর্শককেই নতুন করে ভাবায়নি, বদলে দিয়েছিল শহুরে তরুণ প্রজন্মকে পর্দায় দেখার ভাষাও। ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া দিল চাহতা হ্যায় আজও তাই বলিউডের অন্যতম স্মরণীয় ছবি।
সেই ছবিতে সমীরের প্রেমিকা পূজার চরিত্রে দেখা গিয়েছিল সোনালি কুলকার্নিকে। ছবির ২৫ বছর পূর্তির আবহে ‘স্ক্রিন স্পটলাইট’-এ ফিরে তাকিয়ে অভিনেত্রী জানালেন, সেই ছবিতে সুযোগ পাওয়ার গল্প থেকে শুরু করে ঝকঝকে সেটে নিজেকে প্রথমে ‘বেমানান’ মনে হওয়া—সবটাই আজও তাঁর মনে টাটকা।
আর সেই গল্পের শুরু জোয়া আখতারকে দিয়ে।
একটি ছবি থেকেই অডিশন
সোনালির একটি ছবি দেখে জোয়া আখতার নাকি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি, ছবির মানুষটি সত্যিই সোনালি কি না। কারণ, তত দিনে অভিনেত্রীকে মূলত অন্য ধরনের ছবিতেই দেখা গিয়েছিল।
জোয়া তাঁকে অডিশনে ডাকেন। আর সেই অডিশনও ছিল একেবারে গতানুগতিক নয়। জোয়া নিজেই সংলাপের বিপরীত চরিত্রের অংশ বলছিলেন। দু’জনে মিলে তাৎক্ষণিক ভাবে কিছু সংলাপও যোগ করছিলেন।
সোনালির কাছে পুরো অভিজ্ঞতাটাই ছিল আনন্দের।
কিন্তু অডিশন পেরিয়ে যখন সত্যিই দিল চাহতা হ্যায়-এর সেটে পৌঁছলেন, তখন আনন্দের পাশাপাশি এল অন্য এক অনুভূতি—ভয়।
‘আমি কি এখানে মানাব?’
সোনালির বেড়ে ওঠা পুণের এক সাধারণ মরাঠি পরিবারে। তাঁর কাছে নব্বইয়ের দশকের শেষের পুণেও অনেকটাই ছোট শহরের মতো।
তার উপর দিল চাহতা হ্যায়-এর দুনিয়া ছিল একেবারেই অন্য রকম—ঝকঝকে, আধুনিক, শহুরে এবং ফ্যাশননির্ভর।
সোনালির নিজের কথায়, তিনি তখন “ফ্যাশন বা বিলাসিতা কিছুই জানতেন না।”
ফলে মনে প্রশ্ন জেগেছিল—এই পরিবেশে তিনি আদৌ মানিয়ে নিতে পারবেন তো?
সেই ভয় কাটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন জোয়া।
সোনালির চোখে জোয়া কখনও এমন কোনও মানুষ হয়ে ওঠেননি, যাঁর অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান তাঁকে দূরে সরিয়ে দেয়। বরং জোয়াকে তাঁর মনে হয়েছিল অত্যন্ত মাটির কাছাকাছি থাকা এবং সিনেমার প্রতি গভীর ভাবে আবেগী একজন মানুষ।
আজ জোয়া নিজেই প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। তবু সোনালির ইচ্ছা, সুযোগ পেলে তাঁর সঙ্গে আবারও কাজ করবেন।
সেটের আসল তারকা ছিল ‘মানুষ’
দিল চাহতা হ্যায়-এর সেটের সবচেয়ে বড় স্মৃতি কী?
সোনালির উত্তর—মানুষ।
পরিচালক ফারহান আখতার এবং সহ-প্রযোজক রীতেশ সিধওয়ানির বন্ধুত্ব তাঁকে বিশেষ ভাবে মুগ্ধ করেছিল। তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা চোখে পড়লেও, দু’জনকে কখনও নিজেদের বন্ধুত্ব জাহির করতে হয়নি।
পঁচিশ বছর পরেও সেই বন্ধুত্বই একসঙ্গে এক্সেল এন্টারটেনমেন্ট চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম ভিত্তি।
প্রীতি জিন্টার সঙ্গেও কাজ করে খুশি হয়েছিলেন সোনালি। এর আগে মিশন কাশ্মীর-এ একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তাঁরা। সোনালির মতে, দু’জনেই একে অপরকে উৎসাহ দিতেন।
আর সেটের বাকি কলাকুশলীরাও তাঁকে নতুন জগতে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছিলেন।
পোশাক পরিকল্পক অর্জুন ভাসিন তাঁকে পোশাক ও স্টাইলিংয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন। অধুনা ভবানি এবং আভান কনট্রাক্টর তাঁর চুলে রং করে তাঁকে একেবারে নতুন লুকে হাজির করেছিলেন।
সবচেয়ে বড় কথা, কেউ তাঁকে কখনও ‘গ্রাম্য’ বা ‘বেমানান’ বলে অনুভব করাননি।
সোনালির কথায়, সবাই তাঁকে পূজা হিসেবেই দেখেছিলেন।
আর সেই স্বীকৃতিটাই ধীরে ধীরে তাঁর ভয় কাটিয়ে দিয়েছিল।
গাড়ির বনেটে বসে পূজা!
দিল চাহতা হ্যায়-এর ‘ও লড়কি হ্যায় কহাঁ’ গানটির শুটিং আজও সোনালির স্মৃতিতে বিশেষ জায়গা করে আছে।
পুরনো দিনের নায়িকার মতো সাজানো চুল। গাড়ির বনেটে বসে অভিনয়। পাশে সইফ আলি খান।
আর সেই দৃশ্য দেখে জোয়া আখতার এবং নৃত্য পরিচালক ফারাহ খান হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিলেন বলে জানান সোনালি।
তবে মজার ব্যাপার হল, সোনালি তখন মোটেই অপ্রস্তুত ছিলেন না। বরং প্রশংসা পাওয়ার জন্য বেশ মুখিয়ে ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশংসা এসেছিলও।
আর সেই মুহূর্তটাই হয়ে উঠেছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আরেকটি ধাপ।
সকাল ৯টা মানে ৯টাই!
ছবিটির সেটে শুধু বন্ধুত্ব আর মজা ছিল না, ছিল দুর্দান্ত কর্মশৃঙ্খলাও।
সোনালির কথায়, দিল চাহতা হ্যায় ছিল তাঁর কর্মজীবনের প্রথম ছবি, যেখানে সকাল ৯টায় শট থাকলে ঠিক সকাল ৯টাতেই ক্যামেরা চলত।
সময় ভাগ করা ছিল প্রায় ঘড়ির কাঁটার মতো—
সকাল ৮টা থেকে আধ ঘণ্টা মেকআপ।
তার পর ১৫ মিনিট চুলের জন্য।
১০ মিনিট পোশাক।
আর সেটে পৌঁছতে পাঁচ মিনিট।
ব্যস, সময় শেষ।
পরে সোনালি জানতে পারেন, এই নিখুঁত সময়সূচির নেপথ্যে ছিলেন সহকারী পরিচালক রীমা কাগতি এবং অপূর্ব লাখিয়া—যাঁরা পরবর্তী সময়ে নিজেরাই পরিচিত পরিচালক হয়ে ওঠেন।
এই কর্মসংস্কৃতি সোনালির কাছে ছিল একেবারেই নতুন।
কাজের পাশাপাশি আনন্দেরও জায়গা ছিল। তবে সব কিছুই ছিল পরিকল্পিত।
তাঁর স্মৃতিতে, এমন দিন প্রায় আসেনি যখন সেটে কেউ রেগে আছেন, কারও মন খারাপ বা বড় কোনও ঝামেলা হয়েছে।
সইফের গানেই বদলে যেত সেট
সোনালির কাছে সইফ আলি খানের সঙ্গে কাজের স্মৃতিও বেশ উষ্ণ।
তাঁর মতে, সইফ ছিলেন শান্ত, যত্নশীল এবং অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ সহ-অভিনেতা।
শুধু অভিনয় নয়, সেটে কী ভাবে নিজের মতো করে থাকা যায়, সেটিও যেন সইফের কাছ থেকে শিখেছিলেন তিনি।
সইফের একটি অভ্যাস বিশেষ ভাবে মনে আছে সোনালির।
সেটেই সঙ্গে রাখতেন নিজের পছন্দের গান। এখনকার মতো ফোনে কয়েক হাজার গান নয়—তখন ছোট মিউজিক প্লেয়ার, সিডি, ক্যাসেটই ছিল ভরসা।
গান চালু হলেই যেন সেটের পরিবেশ বদলে যেত।
শর্মিলার ছেলে—কিন্তু সেটে শুধু ‘সইফ’
সোনালির কাছে সইফের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক দিক ছিল তাঁর তারকা-পরিচয়ের কোনও বাড়তি ভার না থাকা।
সইফ যে কিংবদন্তি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর এবং ক্রিকেটার মনসুর আলি খান পতৌদির ছেলে—সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু কাজের সময় সেই পরিচয়ের কোনও চাপ অনুভব করেননি।
সকলের লক্ষ্য ছিল একটাই—দৃশ্যটা আরও ভাল করা।
সোনালির মতে, দিল চাহতা হ্যায় থেকেই সইফ যেন নিজের অভিনয়-ব্যক্তিত্বকে নতুন ভাবে খুঁজে পেতে শুরু করেছিলেন। একটি দৃশ্য কী ভাবে তৈরি করতে হয়, চরিত্রকে কী ভাবে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়—সইফের সেই প্রক্রিয়া বরাবরই তাঁর ভাল লেগেছে।
আর এখন, ২৫ বছর পরেও তাঁর একটি ইচ্ছা রয়ে গিয়েছে।
সম্প্রতি কেউ সোনালিকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিনি বিরল অভিনেত্রীদের একজন যিনি শর্মিলা ঠাকুর এবং তাঁর ছেলে সইফ—দু’জনের সঙ্গেই অভিনয় করেছেন।
সোনালির নিজের হিসাব অবশ্য আরও এক ধাপ এগোয়।
সারা আলি খানই শুধু বাকি!
২০২৪ সালের আউটহাউস-এ শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি। এ বার যদি সইফের সঙ্গে ‘সমীর-পূজা’র সেই পুরনো chemistry আবার কোনও ছবিতে ফিরে আসে?
সোনালি সেই সম্ভাবনাকে এখনও একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
কারণ ২৫ বছর পরেও দিল চাহতা হ্যায়-এর স্মৃতি তাঁর কাছে শুধু একটি সফল ছবির গল্প নয়।
এটি এমন একটি সময়ের গল্প, যখন তিনি নিজেকে নিয়ে ভয় পেয়েছিলেন—আর একটি দল তাঁকে সেই ভয় কাটিয়ে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল।
সেই কারণেই হয়তো ‘দিল চাহতা হ্যায়’ শুধু তাঁর কেরিয়ারের একটি ছবি নয়, তাঁর আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার গল্পও।