বাংলাস্ফিয়ার:  জাপানের টোকিয়োয় রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘চিতাভস্ম’ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তাঁর কন্যা অনিতা বসু পাফের দায়ের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ মঙ্গলবার কেন্দ্র, বিদেশ মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে নোটিস দিয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হতে পারে।

জার্মানিতে বসবাসকারী অশীতিপর অনিতা নেতাজির একমাত্র জীবিত প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, রেনকোজি মন্দিরে রাখা দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরে কোনও চূড়ান্ত, যুক্তিসঙ্গত ও সময়বদ্ধ সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাঁর দাবি, ওই দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হলে তিনি কন্যা ও আইনসম্মত উত্তরাধিকারী হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবেন। ভারত সরকার নিজে দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনুক; তা সম্ভব না হলে তাঁকে সেই ব্যবস্থা করার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়া হোক।

অনিতার হয়ে আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। তিনি বলেন, নেতাজির দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে সম্মানের সঙ্গে শেষকৃত্য করার দাবি অনিতা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে জানিয়ে আসছেন। আদালতের কাছে তাঁর আবেদন কোনও নতুন আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং কয়েক দশকের অমীমাংসিত প্রশ্নের একটি মর্যাদাপূর্ণ নিষ্পত্তির চেষ্টা। সুপ্রিম কোর্ট আপাতত দাবির সত্যতা বা রেনকোজিতে রাখা চিতাভস্মের পরিচয় সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। কেন্দ্রের বক্তব্য জানতেই নোটিস জারি করা হয়েছে। ফলে এই পর্যায়ে আদালতের পদক্ষেপকে চিতাভস্মের পরিচয়ের বিচারবিভাগীয় স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যাবে না।

চলতি বছরের মার্চ মাসে নেতাজির প্রপৌত্র আশিস রায়ের করা একই ধরনের একটি আবেদন গ্রহণ করতে রাজি হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। সেই শুনানিতে বেঞ্চ বলেছিল, নেতাজির আইনসম্মত উত্তরাধিকারী যদি দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনতে চান, তা হলে তাঁকেই সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে। আদালত মন্তব্য করেছিল, পরিবারের অনুভূতির প্রতি তার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে এবং সেই অনুভূতিকে আইনি পদক্ষেপে রূপ দিতে তারা সহায়তা করবে; কিন্তু উত্তরাধিকারীকেই সামনে আসতে হবে। আদালতের অনীহা দেখে আশিস রায়ের আইনজীবী আবেদন প্রত্যাহারের অনুমতি চান। পরে অনিতা নিজেই নতুন আবেদন করেন।

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু, বর্তমান তাইপেইয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছিল বলে সরকারি বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সেই বিবরণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হওয়ার পরে একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। সেখানেই তাঁর মরদেহ দাহ করা হয় এবং চিতাভস্ম পরে টোকিয়োর রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই ভস্ম সংরক্ষণ করে চলেছে।

তবে নেতাজির অন্তর্ধান ভারতের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত রহস্যগুলির একটি। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কি না, তা নিয়ে অসংখ্য বিকল্প তত্ত্ব রয়েছে। শাহনওয়াজ কমিটি এবং বিচারপতি জি ডি খোসলা কমিশন বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু বিচারপতি মনোজকুমার মুখোপাধ্যায় কমিশন বলেছিল, নেতাজি ওই বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি এবং রেনকোজির ভস্মও তাঁর নয়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য মুখোপাধ্যায় কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তই বিষয়টিকে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে রেখেছে।

অনিতা অতীতেও চিতাভস্মের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, প্রয়োজনে ডিএনএ বিশ্লেষণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হলে দীর্ঘদিনের সংশয় দূর হতে পারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নেতাজির ১২৯তম জন্মবার্ষিকীতেও তিনি কেন্দ্রের কাছে আবেদন নতুন করে তুলে ধরেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও তিনি চিঠি লিখেছিলেন।

অনিতার ভাষায়, তাঁর বাবা জীবনের বড় অংশ ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে গিয়ে নির্বাসনে কাটিয়েছিলেন। স্বাধীন ভারতে তাঁর দেহাবশেষও অনির্দিষ্টকাল বিদেশে পড়ে থাকা উচিত নয়। তাই এই প্রত্যাবর্তনকে তিনি কেবল চিতাভস্ম স্থানান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না; তাঁর কাছে এটি নেতাজির দীর্ঘ ‘নির্বাসন’-এর প্রতীকী অবসান।

কেন্দ্র এখন আদালতে কী অবস্থান নেয়, তার উপর মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে। দেহাবশেষের পরিচয় যাচাই, জাপান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এবং ভারতে আনার পরে তা কোথায় ও কীভাবে সংরক্ষণ বা সমাধিস্থ করা হবে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জটিল প্রশ্ন রয়েছে। তবে সরাসরি নেতাজির কন্যার আবেদনে সুপ্রিম কোর্ট নোটিস জারি করায় আট দশকের পুরনো বিতর্কে নতুন আইনি অধ্যায় শুরু হল।