যুদ্ধের উত্তাপ, তেলের চড়া দাম: ২১ পয়সা পড়ে ডলারপিছু টাকা ৯৪.৯৫

যা জানা জরুরি
- মুম্বই: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের উত্তাপ এসে পড়ল ভারতের বিদেশি মুদ্রার বাজারেও।
- প্রাথমিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার দর কমল ২১ পয়সা।
- ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম ভারতীয় মুদ্রার উপর চাপ তৈরি করেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মুম্বই: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের উত্তাপ এসে পড়ল ভারতের বিদেশি মুদ্রার বাজারেও। প্রাথমিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার দর কমল ২১ পয়সা। এক ডলারের দাম দাঁড়াল ৯৪ টাকা ৯৫ পয়সা। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম ভারতীয় মুদ্রার উপর চাপ তৈরি করেছে। ডলারপিছু ৯৫ টাকার সীমার কাছে পৌঁছে গেল বিনিময় হার।
মিরায়ে অ্যাসেট শেয়ারখানের গবেষণা বিশ্লেষক অনুজ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দুর্বল অবস্থায় লেনদেন শুরু করেছে টাকা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইরানের পারস্পরিক হামলার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপিছু ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ভারতের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি উদ্বেগের। দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ মেটে আমদানির মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল মহার্ঘ হলে একই পরিমাণ তেল কিনতেও বেশি বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয়। তার সঙ্গে টাকার দর কমলে বোঝা বাড়ে আরও। ডলারে নির্ধারিত আমদানি মূল্য মেটাতে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে আগের চেয়ে বেশি টাকা জোগাড় করতে হয়।
এই দ্বিমুখী চাপের সরল হিসাব হল, তেলের নিজস্ব দাম অপরিবর্তিত থাকলেও টাকার অবমূল্যায়নে দেশে তার আমদানি খরচ বাড়তে পারে। আবার বিনিময় হার স্থির থাকলেও আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা আসে। দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে আমদানিকারকদের ব্যয় আরও বাড়ে। তাই বিদেশি মুদ্রার বাজারে তেলের দামের ওঠানামা ভারতের ক্ষেত্রে এত গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও বাড়তে পারে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ববাজারে তেল পরিবহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। বিকল্প উৎস থেকে তেল আনা সম্ভব হলেও দীর্ঘতর যাত্রাপথ এবং বাড়তি পরিবহণ খরচ আমদানি ব্যয়ের উপর চাপ ফেলতে পারে।
এর প্রভাব শুধু তেল সংস্থার হিসাবেই আটকে থাকে না। জ্বালানির বাড়তি খরচ ক্রেতাদের উপর চাপানো হলে পরিবহণ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সেই সূত্রে বিভিন্ন পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, সংস্থাগুলি খরচ নিজেরা বহন করলে মুনাফায় চাপ পড়ে। সরকার সহায়তা দিলে তার প্রভাব পড়ে সরকারি অর্থের হিসাবে।
টাকার দরপতনের আরও কিছু প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। ডলারে মূল্য নির্ধারিত যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা অন্যান্য সামগ্রী আমদানির খরচ বাড়তে পারে। বিদেশে পড়াশোনা কিংবা ভ্রমণের জন্য যাঁদের ডলার কিনতে হয়, তাঁদেরও বেশি টাকা দিতে হয়। একইভাবে, ডলারে নেওয়া ঋণের কিস্তি মেটাতে বাড়তি খরচ হতে পারে, যদি সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা বিনিময় হারের ঝুঁকি আগে থেকে সামলানোর ব্যবস্থা না করে থাকেন।
তবে রফতানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রভাব কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। ডলারে আয় করা সংস্থা সেই অর্থ টাকায় বদলালে তুলনামূলক বেশি টাকা পেতে পারে। কিন্তু উৎপাদনে আমদানি করা উপকরণ লাগলে সেই সুবিধার অংশবিশেষ বাড়তি খরচে চলে যেতে পারে। ফলে টাকার দুর্বলতা থেকে সব রফতানিকারক সমান লাভবান হবেন, এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
এ দিনের ২১ পয়সার পতন প্রাথমিক লেনদেনের হিসাব। বাজার বন্ধের সময়কার দর এর থেকে আলাদা হতে পারে। কয়েক ঘণ্টার লেনদেনে ডলারের চাহিদা ও জোগানের পরিবর্তনেও বিনিময় হার বদলায়। ফলে সকালের এই দরকে দিনের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই কারণে শুধু এই তথ্য থেকে পরবর্তী দিনের দরপতনের পরিমাণও নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সামনের সময়ে টাকার গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে তেলের দাম এবং আমেরিকা–ইরান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হবে। উত্তেজনা কমে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রশমিত হলে আমদানি ব্যয়ের চাপ হালকা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, সংঘাত বাড়লে তেল ও বিদেশি মুদ্রা, দুই বাজারেই অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



