সুমন চট্টোপাধ্যায়: সবচেয়ে বড় দুর্নীতি টাকা চুরি নয়। সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হল এমন একটি মানসিকতা, যেখানে একজন ক্ষমতাবান মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন—“আমার সিদ্ধান্তই আইন।”

এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নহীন ক্ষমতা, অন্ধ আনুগত্য, চারপাশের স্তাবকবৃত্তি এবং প্রশাসনের নীরবতা মিলে একটি অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। সেই আত্মবিশ্বাসের নাম আত্মবিশ্বাস নয়, আসলে অহংকারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

সেবাশ্রয় বিতর্ককে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার।

এই বিতর্কের শেষ বিচার আদালত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হবে কি না, তদন্ত কী বলবে, তা বিচারব্যবস্থার বিষয়। কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আজই করা যায়। এমন একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি, যাকে ঘিরে অনুমোদন, চিকিৎসা-প্রোটোকল, আইনি বিধি, চিকিৎসায় অবহেলা এবং একাধিক এফআইআরের মতো গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে—সেটি শুরু করার সাহস কোথা থেকে আসে?

সাহস এবং দুঃসাহস এক জিনিস নয়।

সাহস আইন মেনে কাজ করে। দুঃসাহস মনে করে, আইন পরে দেখা যাবে।

রাজনীতিতে একটি পুরনো অসুখ আছে। তার নাম—“আমিই প্রতিষ্ঠান।” এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ আর মনে করেন না যে তিনি একটি সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ। বরং তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, প্রতিষ্ঠান তাঁর পরে আসে। হাসপাতাল, প্রশাসন, নিয়ম, বিশেষজ্ঞ—সবাই যেন তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্যই আছে।

এটাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত।

কারণ গণতন্ত্রে কোনও ব্যক্তির জনপ্রিয়তা তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ বানায় না। বিপুল জনসমর্থন কোনও অস্ত্রোপচারকে নিরাপদ করে না। হাজার হাজার সমর্থকের হাততালি কোনও প্রেসক্রিপশনকে বৈজ্ঞানিক করে তোলে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি নিষ্ঠুর শাস্ত্র। সেখানে আবেগের কোনও মূল্য নেই। সেখানে নেতা আর সাধারণ নাগরিকের শরীর একই নিয়মে কাজ করে। সংক্রমণ ভোট দেখে আসে না। ভুল রোগ নির্ণয় দলীয় পতাকা দেখে ক্ষমা করে না। চিকিৎসার প্রোটোকল কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনে বদলে যায় না।

এই সহজ সত্যটি যখন ক্ষমতার করিডরে হারিয়ে যায়, তখনই বিপদ।

ক্ষমতার আর একটি বৈশিষ্ট্য আছে। তা ধীরে ধীরে মানুষের চারপাশ থেকে ‘না’ শব্দটিকে মুছে দেয়।

প্রথমে কর্মকর্তারা বলেন না।

তারপর দলীয় নেতারা বলেন না।

তারপর চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, আমলারা আর আপত্তি তোলেন না।

শেষ পর্যন্ত এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক বাক্যটি শোনা যায়—“হয়ে যাবে স্যার।”

গণতন্ত্রের ইতিহাসে অসংখ্য বিপর্যয়ের শুরু এই দুটি শব্দ দিয়ে।

“হয়ে যাবে।”

কোনও অনুমতি নেই?

হয়ে যাবে।

নিয়মে বাধা আছে?

হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞের আপত্তি?

হয়ে যাবে।

এই ‘হয়ে যাবে’ সংস্কৃতিই রাষ্ট্রকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।

যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন নেতাকে ঘিরে এমন ধারণা তৈরি হয় যে তিনি যা চাইবেন তাই হবে, সেখানে আইন ধীরে ধীরে বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রশাসনের কাজ তখন আইন প্রয়োগ নয়; নেতার ইচ্ছার ব্যাখ্যা করা। আমলাতন্ত্রের কাজ নীতি বাস্তবায়ন নয়; রাজনৈতিক নির্দেশকে বৈধতার ভাষা দেওয়া। এই অবস্থাকে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা বলেন institutional capture—প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকে, কিন্তু তার স্বাধীনতা ক্রমশ ক্ষয়ে যায়।

এই কারণেই প্রশ্নটি কোনও এক ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নিয়ে।

যে সংস্কৃতিতে ব্যক্তির ছবি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে যায়।

যে সংস্কৃতিতে হাসপাতালের চেয়ে স্বাস্থ্য শিবির বেশি আলোচিত হয়।

যে সংস্কৃতিতে চিকিৎসকের নামের চেয়ে নেতার নাম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেখানে সমস্যার বীজ আগেই বপন হয়ে যায়।

ব্যঙ্গের বিষয় হল, ক্ষমতা নিজেকে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত করে।

স্তাবকেরা কখনও বলে না, “এটা করবেন না।”

তারা বলে, “আপনার মতো আর কেউ পারে না।”

তারা বলে, “মানুষ শুধু আপনাকেই চায়।”

তারা বলে, “আইন? ওসব পরে দেখা যাবে।”

ক্ষমতার চারপাশে যারা থাকে, তারা প্রায়ই নেতাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সমালোচনা পৌঁছাতে দেয় না। সতর্কবার্তাকে ষড়যন্ত্র বলে ব্যাখ্যা করে। ফলত সিদ্ধান্তগ্রহণের জগৎ ক্রমশ একটি প্রতিধ্বনি-কক্ষে পরিণত হয়। সবাই একই কথা বলে। সবাই একই প্রশংসা করে। সবাই একই আশ্বাস দেয়।

এমন পরিবেশে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

কারণ কেউ আর প্রশ্ন করে না।

গণতন্ত্রে বিরোধী দল যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা। একজন জেলা শাসক যদি প্রয়োজনে ‘না’ বলতে না পারেন, একজন স্বাস্থ্য আধিকারিক যদি নিয়ম ভাঙার অভিযোগে আপত্তি তুলতে না পারেন, একজন পুলিশ অফিসার যদি অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করতে স্বাধীন না হন, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হতে শুরু করে।

এখানেই সেবাশ্রয় বিতর্কের প্রকৃত তাৎপর্য।

এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে নিয়ে নয়।

এটি একটি প্রশ্ন—পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠান বড়, না ব্যক্তি?

যদি ব্যক্তি বড় হন, তাহলে আগামীকাল অন্য কেউ একই পথ অনুসরণ করবেন। অন্য একটি দল, অন্য একটি মুখ, অন্য একটি নাম। সমস্যার সমাধান হবে না; শুধু পোস্টার বদলাবে।

কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠান বড় হয়, তাহলে যে-ই ক্ষমতায় থাকুন, তাঁকে একই নিয়ম মানতে হবে। একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। একই আইনের সামনে দাঁড়াতে হবে।

এই কারণেই প্রকৃত গণতন্ত্র ব্যক্তিকে অপমান করে না; ব্যক্তিকে সীমাবদ্ধ করে। কারণ গণতন্ত্র জানে, সীমাহীন ক্ষমতা কোনও মানুষের পক্ষেই নিরাপদ নয়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনও ক্যারিশম্যাটিক নেতা নন। সবচেয়ে বড় শক্তি হল এমন প্রতিষ্ঠান, যা প্রয়োজনে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাকেও বলতে পারে—“না, এটি নিয়মবিরুদ্ধ।”

যেদিন এই ‘না’ শব্দটি হারিয়ে যায়, সেদিনই গণতন্ত্র অসুস্থ হতে শুরু করে।

আর সেই অসুখের লক্ষণ প্রথমে দেখা যায় আদালতে নয়, ভোটে নয়—দেখা যায় মানুষের মনে। যখন নাগরিক ভাবতে শুরু করেন, “আইন সবার জন্য সমান নয়”, তখনই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নড়ে ওঠে।

সেবাশ্রয় বিতর্কের তদন্ত একদিন শেষ হবে। মামলা একদিন নিষ্পত্তি হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতাও একদিন বদলাবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে—আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই, যেখানে কোনও বড় উদ্যোগ শুরু করার আগে প্রথম প্রশ্ন হবে, “আইন কী বলছে?”, নাকি এমন সংস্কৃতি, যেখানে প্রথম প্রশ্ন হবে, “আমাকে আটকাবে কে?”

একটি সুস্থ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এই দুটি প্রশ্নের উত্তরের উপরই নির্ভর করে।