সুমন নামা

গুণ্ডোপনিষৎ অথ গুণ্ডাতত্ত্বং

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: ঋষিগণ বলিয়াছেন “যাহা সর্বত্র বিরাজমান, অথচ কোথাও দেখা যায় না, তাহাই ব্রহ্ম।” আধুনিক বঙ্গদেশে এই সংজ্ঞার সামান্য সংশোধন করিয়া বলা যাইতে পারে…
  • তিনি সমাজসেবক, সংস্কৃতিপ্রেমিক, ক্রীড়ানুরাগী, শ্রমিকবন্ধু, যুবনেতা, প্রবীণ অভিভাবক, জনদরদী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, মধ্যস্থতাকারী, শান্তিরক্ষক, সমস্যাসমাধানকারী।
  • এক অঙ্গে তাঁহার অজস্র রূপ।অর্থাৎ তিনি এমন এক বহুরূপী জীব, যাঁহাকে ধরিবার পূর্বেই তিনি পরিচয় পরিবর্তন করিয়া ফেলেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: ঋষিগণ বলিয়াছেন “যাহা সর্বত্র বিরাজমান, অথচ কোথাও দেখা যায় না, তাহাই ব্রহ্ম।” আধুনিক বঙ্গদেশে এই সংজ্ঞার সামান্য সংশোধন করিয়া বলা যাইতে পারে “যাহা সর্বত্র বিরাজমান, সকলেই যাহাকে চেনে, কিন্তু কেহ স্বীকার করে না, তাহাই গুণ্ডা।”

গুণ্ডা কাহাকে বলে?

ইহার উত্তর দেওয়া দুঃসাধ্য। কারণ গুণ্ডা কখনও গুণ্ডা নাম ধারণ করেন না। তিনি সমাজসেবক, সংস্কৃতিপ্রেমিক, ক্রীড়ানুরাগী, শ্রমিকবন্ধু, যুবনেতা, প্রবীণ অভিভাবক, জনদরদী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, মধ্যস্থতাকারী, শান্তিরক্ষক, সমস্যাসমাধানকারী। এক অঙ্গে তাঁহার অজস্র রূপ।অর্থাৎ তিনি এমন এক বহুরূপী জীব, যাঁহাকে ধরিবার পূর্বেই তিনি পরিচয় পরিবর্তন করিয়া ফেলেন।

প্রাচীনকালে গ্রামে পাঁচজন পণ্ডিত থাকিতেন। পরে পাঁচজন মাতব্বর হইলেন। আরও পরে পাঁচজন নেতা হইলেন। সভ্যতার ক্রমোন্নতির ফলে আজ পাঁচজনই গুণ্ডা বলিয়া পরিচিত। ইহাই বিবর্তন।

পৃথিবীতে তিন প্রকার সরকার রহিয়াছে। প্রথম,সংবিধান অনুসারে পরিচালিত সরকার। দ্বিতীয়, সংবিধান অমান্য করিয়া পরিচালিত সরকার। তৃতীয়, যেখানে সংবিধান, সরকার এবং বাস্তব জীবন, তিনটি আলাদা বিষয়। গুণ্ডা প্রধানত তৃতীয় শ্রেণির আবহাওয়ায় বিকশিত হন। তাঁহারা রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নন; বরং রাষ্ট্রের পরোক্ষ সহযোগী। রাষ্ট্র যাহা করিতে পারে না, গুণ্ডা তাহা করেন। রাষ্ট্রর যাহা করা উচিত নহে, গুণ্ডা তাহাও করেন।

একবার এক জিজ্ঞাসু শিষ্য গুরুদেবকে প্রশ্ন করিল,“গুরুদেব, আইন কাহাকে বলে?”

গুরুদেব কহিলেন—“যাহা বইতে লেখা থাকে।”

শিষ্য পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল—“তাহা হইলে বাস্তবে যাহা চলে?”

গুরুদেব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন—“বৎস, তাহারই নাম ব্যবস্থা।” এই “ব্যবস্থা” শব্দটির মধ্যে গুণ্ডাতন্ত্রের সমগ্র দর্শন লুক্কায়িত।

ইহা সর্বজনবিদিত যে, আমাদের দেশে কোনও সমস্যার দুইটি সমাধান থাকে। প্রথমটি আইনি, দ্বিতীয়টি দ্রুত। প্রথমটি রাষ্ট্রের, দ্বিতীয়টি গুণ্ডার। অতএব বহু নাগরিকই রাষ্ট্রকে সম্মান করেন, কিন্তু গুণ্ডাকে ব্যবহার করেন। ইহাই নাগরিক দর্শনের দ্বৈতবাদ।

গুণ্ডার আর-একটি অসাধারণ গুণ আছে। তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তবে ভোটের পরে। ভোটের পূর্বে তিনি নাগরিককে চমকাইতে ব‍্যস্ত থাকেন, ভোটের পরে নাগরিক তাঁহাকে ধন্যবাদ দেন। উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকে।

এখন ধরুন, একদিন প্রভাতে এক অলৌকিক বিপর্যয় ঘটিল।পশ্চিমবঙ্গে আর একটি গুণ্ডাও রহিল না। ইহা প্রথমে কেহ বিশ্বাস করিল না। কারণ, বাঙালি ভূমিকম্প বিশ্বাস করে, বন্যা বিশ্বাস করে, নির্বাচনোত্তর প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত বিশ্বাস করে, ভূতে বিশ্বাস করে, গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাস করে, ভগবানে বিশ্বাস করে, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অমর এমন বেদান্তীয় বুলিতে বিশ্বাস করে। কিন্তু গুণ্ডাহীন সমাজ বিশ্বাস করা তাহার পক্ষেও কঠিন।

প্রথম দিনেই ক্লাবগুলিতে বিপ্লব ঘটিল। চাঁদার রসিদে প্রথমবার “ইচ্ছানুযায়ী অনুদান” লিখিত হইল। আশ্চর্য, মানুষ স্বেচ্ছায় টাকা দিল। ক্লাবকর্তারা সন্দেহ করিলেন, ইহা নিশ্চয়ই কোনও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।

নির্মাণক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটিল। প্রকৌশলী নকশা দেখাইয়া বলিলেন, “এখানে ছয়তলা হইবে।” কেহ বলিল না “আটতলা করো, পরে দেখা যাইবে।” নির্মাণশ্রমিকেরা প্রথমে ভাবিলেন, পৃথিবী শেষ হইতে চলিয়াছে।এতো দেখি গরীবের পেটে কষিয়ে এক লাথি মারার ব‍্যবস্থা।

পুলিশের অবস্থা শোচনীয়। থানায় কাজ কমিয়া গেল। বড়বাবু বহুদিন পরে আইনপুস্তক খুলিলেন। পড়িতে পড়িতে আবিষ্কার করিলেন, এত সুন্দর ভাষায় আইন লেখা হয়! তিনি আবেগে কনস্টেবলকে ডাকিয়া কয়েকটি ধারা পড়িয়া শোনাইলেন। কনস্টেবল বিনীতভাবে বলিল,“স্যার, এগুলো কি পরীক্ষায় আসিবে?”

সংবাদমাধ্যমে অস্থিরতা। অপরাধ সংবাদ লুপ্ত। টেলিভিশনের পর্দায় একটানা পাঁচ মিনিট কোনও উচ্চকণ্ঠ বিতর্ক নাই।চোর, জোচ্চোর, তোলাবাজ, দাঙ্গাবাজ, দেশবিরোধী ইত‍্যাদি প্রিয় শব্দগুলি রোজ নানাভাবে বলিতে বলিতে এক রকম মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল । সহসা তাহাদের অন্তর্ধানে স্টুডিওর ময়ূরপুচ্ছধারী কাক্কেশ্বর-কাক্কেশ্বরীরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষেও গঙ্গা-যমুনার কুলুকুলু স্রোতের মতো দরদর করিয়া ঘামিয়া চলিয়াছেন।দর্শক প্রথমে অস্বস্তি বোধ করিলেন। পরে টিভি বন্ধ করিয়া সস্তায় পুষ্টিকর বিকল্প বিনোদনের অন্বেষণে ব‍্যস্ত হইয়া পড়িলেন।

সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইলেন সিনেমাওয়ালারা। তাঁহাদের মুগুর-ভাঁজা নায়ক তাহলে কাহার সহিত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হইবেন? দুর্নীতির সহিত? অজ্ঞতার সহিত? নিজের বিবেকের সহিত? এমনিতেই বারো মাস টালমাটাল খাওয়া টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় সিনেমার দৃশ‍্যের চেয়েও করুণভাবে হাহাকার শুরু হইয়া গেল! তারকাদের গোল-টেবিল বৈঠক হইল, তাহাতে পরমব্রত প্রস্তাব করিলেন কালক্ষেপ না করিয়া এই প্রাঙ্গনে ধূমধাম করিয়া মা বিপদতারিনীর পূজার আয়োজন করা প্রয়োজন।

কিন্তু তিন মাস পরে এক আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটিল।বিদ্যালয়ের ছাত্র জানিল, পরীক্ষায় পাশ করিবার জন্য কেবল পড়াশোনা যথেষ্ট। ব্যবসায়ী জানিলেন, হিসাবপত্রই সর্বোত্তম রক্ষাকবচ। কৃষক জানিলেন, জমির দলিল লাঠির চেয়ে শক্তিশালী। বৃদ্ধা বিধবা জানিলেন, পেনশন পাইতে কাহারও পা ধরিতে হয় না। কিশোর জানিল, শক্তিমান হওয়া আর ভয়ঙ্কর হওয়া একই কথা নহে।

সমাজ তখন অস্বস্তিতে পড়িল। কারণ, বহুদিন ধরিয়া আমরা ভয়কে এমনভাবে ব্যবহার করিয়াছি যে, ভয় না থাকিলে কী করিব, তাহা ভুলিয়া গিয়াছি। স্বাধীনতারও অভ্যাস লাগে।

তখন এক শতবর্ষীয় বৃদ্ধ কহিলেন,“তোমরা গুণ্ডাকে গাল দিও না। সে তো শূন্য হইতে জন্মায় নাই। আমরা প্রত্যেকে একটু একটু করিয়া তাহাকে সৃষ্টি করিয়াছি। যেদিন লাইনে দাঁড়াইতে লজ্জা পাইয়াছি, নিয়ম মানিতে বিরক্ত হইয়াছি, পরিচয়ের জোরে সুবিধা লইয়াছি, সেদিনই গুণ্ডার জন্মের অন্নপ্রাশন করিয়াছি। যেদিন অন্যায় দেখিয়া চুপ করিয়াছি, সেদিন তাহার উপনয়ন সম্পন্ন হইয়াছে। আর যেদিন বলিয়াছি ‘একজন লোক থাকিলে সব ঠিক করিয়া দেবে’ সেদিন তাহাকে রাজ্যাভিষেক করাইয়াছি।”অতএব গুণ্ডামুক্ত সমাজ গড়িবার পূর্বে গুণ্ডানির্ভর মনকে বিদায় দিতে হইবে। কারণ, গুণ্ডা কোনও পেশা নহে; তিনি একটি সামাজিক চুক্তি। তিনি ক্ষমতার স্ব-নিযুক্ত দালাল, নাগরিক ভীরুতার অনুমোদিত প্রতিনিধি এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার জীবন্ত বিজ্ঞাপন।

সুতরাং “গুণ্ডা কাহাকে বলে”—ইহা প্রশ্ন নহে।

প্রকৃত প্রশ্ন—“আমরা কবে এমন নাগরিক হইব, যাহার দরজায় কড়া নাড়িয়া কোনও গুণ্ডা বলিতে সাহস করিবে না ‘আমি আছি, ভয় কী?’”

যেদিন সেই উত্তর মিলিবে, সেদিন ইতিহাসে গুণ্ডার মৃত্যু ঘটিবে না; ঘটিবে গুণ্ডার অপ্রয়োজনীয়তা। আর কোনও সভ্যতার পক্ষে তাহার চেয়ে বড় শোকসংবাদ একইসঙ্গে  তাহার চেয়ে বড় আনন্দবার্তা, আর কিছু হইতে পারে না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

সুমন চট্টোপাধ্যায়

<p data-path-to-node="3">সুমন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং লেখক, যিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অনন্য রচনাশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="239">আজকাল</i> পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ বছর <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="337">আনন্দবাজার পত্রিকা</i>-র কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাহসিকতার সাথে কভার করার পাশাপাশি স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি ও তারা বাংলার মতো টেলিভিশন মাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সংবাদপত্র <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="664">একদিন</i> চালু করেন এবং ২০১২ সালে 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গ্রুপের বাংলা দৈনিক <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="738">এই সময়</i>-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ 'বাংলাস্ফিয়ার' (Banglasphere)-এ নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ লেখা ও মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="950">মাই ডেট উইথ হিস্ট্রি</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="972">প্রথম নাগরিক</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="986">সেদিনের সপ্তারোহী</i> ও <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="1006">গুমঘর গুলজার</i>-এর মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।</p>

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles