সিগারেট চোরাচালান থেকে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র, দুবাই থেকে ধৃত ‘মাফিয়া’ বিরেন্দ্র বসোয়া

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ দিল্লির সরোজিনী নগরের পিলানজি গ্রামের একটি পরিবারের ভাড়ার আয়ের উপর নির্ভরশীল যুবক থেকে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের কথিত নিয়ন্ত্রক—বিরেন্দ্র সিংহ বসোয়া ওরফে বিরুর…
- ভারত ছেড়ে ব্রিটেন, সেখান থেকে দুবাই—দেশ বদলে দীর্ঘদিন তদন্তকারীদের চোখে ধুলো দিলেও শেষরক্ষা হল না।
- সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনার পর দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো বা এনসিবি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ দিল্লির সরোজিনী নগরের পিলানজি গ্রামের একটি পরিবারের ভাড়ার আয়ের উপর নির্ভরশীল যুবক থেকে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের কথিত নিয়ন্ত্রক—বিরেন্দ্র সিংহ বসোয়া ওরফে বিরুর উত্থানের কাহিনি যেন অপরাধজগতের কোনও চিত্রনাট্য। ভারত ছেড়ে ব্রিটেন, সেখান থেকে দুবাই—দেশ বদলে দীর্ঘদিন তদন্তকারীদের চোখে ধুলো দিলেও শেষরক্ষা হল না। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনার পর দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো বা এনসিবি।
পঞ্চাশ বছর বয়সি বসোয়াকে গত জুনে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এনসিবির অনুরোধে তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ জারি হয়। তার পর ভারতীয় সংস্থা ও আমিরশাহি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ সমন্বয়ের মাধ্যমে তাঁকে দেশে ফেরানো হয়েছে। ‘অপারেশন গ্লোবাল হান্ট’-এর অধীনে বিদেশে আশ্রয় নেওয়া বড় মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে দেশে ফেরানোর যে অভিযান চলছে, বসোয়ার প্রত্যর্পণ তারই অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলে দাবি করেছে কেন্দ্র। তাঁর ছেলে ঋষভ বসোয়াকেও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তদন্তকারীদের দাবি, বসোয়ার অপরাধজীবনের শুরু মাদক দিয়ে নয়, বিদেশি সিগারেটের চোরাচালান দিয়ে। পিলানজিতে পারিবারিক সম্পত্তির ভাড়া থেকে তাঁর সংসার চলত। ২০০৬ সাল নাগাদ তিনি দুবাই থেকে চোরাপথে আনা সিগারেট ও গুটখার কারবারে নামেন। ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স তাঁকে গ্রেফতারও করে। জামিন পাওয়ার পরে তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা হয় এবং এক সময় তাঁকে পলাতক অভিযুক্ত ঘোষণা করা হয়।
এর পরে বসোয়া চলে যান ব্রিটেনে। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় পটনার শিকড় থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সন্দীপ ধুনের সঙ্গে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই পরিচয়ই বসোয়াকে সাধারণ চোরাচালান থেকে বিপুল অঙ্কের আন্তর্জাতিক মাদক কারবারে পৌঁছে দেয়। পরে দুবাইকে ঘাঁটি করে তিনি ভারতীয় উৎপাদনকেন্দ্র, বিদেশি ক্রেতা, পরিবহণকারী এবং অর্থ জোগানদাতাদের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করতেন।
বসোয়ার বিরুদ্ধে তদন্তের প্রধান সূত্রটি মিলেছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পুনে পুলিশ প্রথমে মাত্র ৫০০ গ্রাম মেফেড্রোন বাজেয়াপ্ত করেছিল। সেই ছোট চালানের উৎস খুঁজতে গিয়েই তদন্তকারীরা অনেক বড় জালের সন্ধান পান। পুনে থেকে প্রায় ৮৬৭ কিলোগ্রাম এবং দিল্লি থেকে আরও ৯৭০ কিলোগ্রাম মেফেড্রোন উদ্ধার হয়। মোট বাজেয়াপ্ত মাদকের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৮৩৭ কিলোগ্রাম। পরে মামলাটি এনসিবির মুম্বই শাখার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, দিল্লিতে উদ্ধার হওয়া ৯৭০ কিলোগ্রাম মেফেড্রোনের একটি বড় অংশ বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। বসোয়ার সঙ্গে যুক্ত ক্যুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই মাদক রফতানির পরিকল্পনা ছিল। বিদেশে বসেই তিনি মাদক সংগ্রহ, অর্থ জোগান, মজুত, পরিবহণ এবং বিভিন্ন দেশে সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করতেন বলে দাবি এনসিবির। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈধ ও কাগুজে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাকেও এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখার ২০২৪ সালের আর একটি তদন্তেও বসোয়ার নাম উঠে আসে। দিল্লির মহিপালপুর, হাপুড়, গাজিয়াবাদ এবং গুজরাতের অঙ্কলেশ্বরের একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে কোকেন, মেফেড্রোন ও জলচাষ-পদ্ধতিতে উৎপাদিত গাঁজা মিলিয়ে ১,৩০০ কিলোগ্রামের বেশি মাদক উদ্ধার করা হয়। সংবাদমাধ্যমে এই চক্রের বাজেয়াপ্ত মাদকের বাজারমূল্য প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ১৯ জনের নাম ছিল; ১৪ জন গ্রেফতার হলেও বসোয়া-সহ পাঁচজন পলাতক ছিলেন।
২০২৩ সালে ছেলের বিয়ের পরদিনই বসোয়া ভারত ছাড়েন বলে তদন্তকারীদের দাবি। ঋষভের বিয়ে হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের এক প্রাক্তন বিধায়কের মেয়ের সঙ্গে। ২০২৪ সালে বিশাল মাদক চক্রটি প্রকাশ্যে আসার পরে বসোয়ার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। কিন্তু তত দিনে দুবাইয়ে পৌঁছে বারবার আস্তানা বদল করে তিনি চক্র পরিচালনা করছিলেন বলে অভিযোগ।
অবশেষে আর্থিক লেনদেন, স্থানীয় সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—দুই প্রান্ত থেকেই অনুসন্ধান চালিয়ে তাঁর অবস্থান নির্ণয় করে ভারতীয় সংস্থাগুলি। দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই বসোয়াকে গ্রেফতার করে আদালতে পেশ করা হয়েছে। এখন এনসিবির লক্ষ্য তাঁর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সরবরাহপথ, মাদক-অর্থ সাদা করার ব্যবস্থা এবং ভারতে সক্রিয় সহযোগীদের পরিচয় জানা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, বিদেশে আশ্রয় নেওয়া মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানে বসোয়ার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



