আর জি কর-কাণ্ডে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক গ্রেফতার, আদালতে যাওয়ার পথে ডিম-জুতো ছুড়ল জনতা

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার পরে তাঁর দেহ তড়িঘড়ি দাহ করার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক…
- ওড়িশার বালেশ্বরের একটি গোপন আস্তানা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের পুলিশ।
- একই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার পরে তাঁর দেহ তড়িঘড়ি দাহ করার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ। ওড়িশার বালেশ্বরের একটি গোপন আস্তানা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের পুলিশ। একই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়। শুক্রবার তাঁদের আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে খড়দহ থানার বাইরে প্রবল জনরোষের মুখে পড়ে পুলিশ। নির্মলকে লক্ষ্য করে ডিম, জুতো এবং কাদা ছোড়ার পাশাপাশি কিল-চড়-লাথিও মারা হয় বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ ও র্যাফকে কার্যত হিমশিম খেতে হয়। নির্মলকে থানার ভিতর থেকে বার করে বন্দি-বাহী গাড়িতে তোলার সময়ে তাঁর মাথায় হেলমেট পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চার পাশে নিরাপত্তারক্ষীদের বলয় থাকা সত্ত্বেও উত্তেজিত জনতার একাংশ সেই বলয় ভেঙে তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। সাদা পাঞ্জাবিতে ডিম ও কাদার দাগ নিয়েই তাঁকে গাড়িতে তুলতে দেখা যায়। একই ভাবে আক্রান্ত হন সঞ্জীবও। তাঁদের ব্যারাকপুর মহকুমা আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও অপেক্ষমাণ বিক্ষোভকারীরা ‘চোর, চোর’ স্লোগান দেন।
থানার বাইরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরাও বিক্ষোভ দেখান। বাজানো হয় উচ্চস্বরে গান, প্রদর্শিত হয় জুতোর মালা। তবে অভিযুক্তদের উপরে শারীরিক আক্রমণ এবং পুলিশের নিরাপত্তাবলয় ভাঙার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আর জি কর-কাণ্ড ঘিরে মানুষের ক্ষোভ যতই তীব্র হোক, বিচারাধীন কোনও অভিযুক্তকে মারধর করার অধিকার জনতার নেই—এই মতও উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
তরুণী চিকিৎসকের বাবার দায়ের করা নতুন অভিযোগের ভিত্তিতেই নির্মল, সঞ্জীব এবং পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-র বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়েছে। অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের মৃতদেহ উদ্ধারের পরে ময়নাতদন্ত এবং দাহের গোটা প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখানো হয়েছিল। পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে পানিহাটি শ্মশানে দ্রুত দেহ দাহ করানোর জন্য তৎকালীন বিধায়ক হিসেবে নির্মল নিজের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
সঞ্জীব মৃতার পরিবারের প্রতিবেশী এবং নির্মলের ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত। অভিযোগ, তিনি শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন এবং দাহ-সংক্রান্ত কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। কলকাতার চিনার পার্ক এলাকার একটি বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তৃতীয় অভিযুক্ত সোমনাথ এখনও পলাতক। তাঁকে খুঁজতে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তরুণী চিকিৎসকের পরিবারের দাবি, দেহটি এত দ্রুত দাহ না করা হলে দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তের সুযোগ থাকত। সেই পরীক্ষায় ধর্ষণ ও হত্যার পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র বা একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারত। তাঁদের অভিযোগ, দেহ দাহের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ স্থায়ী ভাবে নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল। ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নতুন করে এই দিকটির তদন্তের নির্দেশ দেন। তার পরেই মৃতার বাবা অভিযোগ দায়ের করেন এবং সেটিকে এফআইআরে রূপান্তরিত করে ব্যারাকপুর পুলিশ।
দুই অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনারের প্রশংসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু বলেন, মৃতার বাবার অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ দুই অভিযুক্তকে খুঁজে বার করেছে। পলাতক তৃতীয় ব্যক্তিকেও শীঘ্র গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সোমনাথকে আত্মসমর্পণ করার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল অবশ্য তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে নির্মলদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকারও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ঘটনার দিন মমতা দলীয় নেতা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন বলে নিজেই জানিয়েছিলেন—সেই সূত্রে কার নির্দেশে এত দ্রুত ময়নাতদন্ত ও দাহ সম্পন্ন হয়েছিল, তা সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা।
আর জি করের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক সঞ্জয় রায় ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু মৃতার পরিবার প্রথম থেকেই বলে আসছে, এই অপরাধ একা সঞ্জয়ের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয় এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এখনও আড়ালেই রয়েছে। নির্মল ও সঞ্জীবের গ্রেফতার সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলিকে আবার সামনে নিয়ে এল। এখন তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে, তড়িঘড়ি দাহ নিছক প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ছিল, না কি তার পিছনে সত্যিই প্রমাণ মুছে দেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা ছিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



