সুমন চট্টোপাধ্যায়: স্থান—দক্ষিণ ভারতের এক নামকরা খামারে বসেছে এই আলোচনা।বাইরে বিশাল ফ্লেক্স—“অখিল ভারতীয় মুর্গি ঐক্য পরিষদ”। নিচে লেখা—“ডিম দেব, কিন্তু বদনাম নেব না।”
মঞ্চে তিনটি চেয়ার। একটিতে বসেছে পশ্চিমবঙ্গের গর্বিত দেশি মুর্গি বঙ্গলক্ষ্মী। গলায় লাল-সাদা গামছা, মুখে এমন ভাব যেন সে রবীন্দ্রনাথের ডিমতত্ত্ব মুখস্থ বলে দিতে পারে।
দ্বিতীয় চেয়ারে তামিলনাড়ুর কাবেরী। চকচকে পালক, চোখে ব্যবসায়ীর আত্মবিশ্বাস। তার রাজ্যের ডিম বহুদিন ধরেই ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়।
তৃতীয় চেয়ারে অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী। তাকে দেখেই বোঝা যায়, এই মুর্গি শুধু ডিম পাড়ে না, বাজারদরও জানে। ট্রাক, কোল্ড চেন, পাইকার, সব তার নখদর্পণে।
সভাপতি মোরগ ঠোঁট দিয়ে টেবিলে ঠুকঠুক করে বলল, — “সভা শুরু হচ্ছে। আজকের আলোচ্য বিষয়—‘মানুষ ডিমকে নিয়ে ঠিক কী করতে চাইছে?’”
বঙ্গলক্ষ্মী প্রথমেই গলা খাঁকারি দিল।
“আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমাদের ডিমের আর কোনও সম্মান রইল না। একদিন শুনি নেতাদের দিকে ডিম ছোড়া হচ্ছে। আরেকদিন শুনি স্কুলের বাচ্চাদের থালা থেকে ডিম উধাও। মানুষ কি ডিমকে খাদ্য বলে, না রাজনৈতিক অস্ত্র বলে?”
কাবেরী মুচকি হেসে বলল—
“முட்டை சாப்பிடுவதற்குத்தான்; அரசியல் செய்ய அல்ல.” (ডিম খাওয়ার জন্য, রাজনীতি করার জন্য নয়।)
গোদাবরী মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“గుడ్డు పుట్టింది పిల్లల కోసం… రాజకీయ నాయకుల కోసం కాదు.” (ডিম জন্মায় বাচ্চাদের জন্য, রাজনীতিকদের জন্য নয়।)
বঙ্গলক্ষ্মী বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোমরা বুঝবে না। আমাদের এখানে ডিম এখন সর্বগুণসম্পন্ন। কখনও পুষ্টি, কখনও প্রতিবাদ, কখনও নির্বাচন, কখনও সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম।”
কাবেরী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
“எங்கள் ஊரில் முட்டை என்றால் புரோட்டீன். உங்களிடம் அது ‘பிரேக்கிங் நியூஸ்’ போல இருக்கிறது.” (আমাদের রাজ্যে ডিম মানেই প্রোটিন। তোমাদের রাজ্যে মনে হচ্ছে ডিম মানেই ‘ব্রেকিং নিউজ’।)
গোদাবরী সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
“టీవీలో చూసాను. మీ దగ్గర గుడ్డు కూడా ఎన్నికల్లో పోటీ చేస్తున్నట్టుంది!” (টেলিভিশনে দেখেছি। তোমাদের ওখানে মনে হচ্ছে ডিমও যেন নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে!)
বঙ্গলক্ষ্মী একটু অপ্রস্তুত।
“তা… কিছুটা ঠিকই বলেছ। তবে আমাদের ডিমেরও ইতিহাস আছে।”
কাবেরী বলল—
“வரலாறு இருக்கலாம். ஆனால் ஆம்லெட் ஆகும் முன் அமைதியாக இருக்க விடுங்கள்.” ইতিহাস থাকতেই পারে। কিন্তু অমলেট হওয়ার আগে অন্তত একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
গোদাবরী হেসে গড়িয়ে পড়ল।
“మా గుడ్లు మార్కెట్కి వెళ్తాయి. మీ గుడ్లు ముందుగా టీవీ స్టూడియోకి వెళ్తున్నాయేమో!” আমাদের ডিম আগে বাজারে যায়। তোমাদের ডিম বোধহয় আগে টিভি স্টুডিওতে যায়!
বঙ্গলক্ষ্মী মুখ গম্ভীর করে,
“এত হাসছ কেন? তোমাদের ডিমও তো আমাদের রাজ্যে আসে।”
এই কথা শুনেই দু’জন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল।
কাবেরী ধীরে ধীরে বলল—
“அது பழைய கதை…” ওটা পুরনো গল্প
গোদাবরী ঠোঁট চুলকে বলল—
“ఇప్పుడు కథ కొంచెం మారింది…” এখন গল্পটা একটু বদলেছে…
বঙ্গলক্ষ্মী অবাক।
“মানে?”
কাবেরী উত্তর দিল—
“இப்போது நீங்களும் நிறைய முட்டை போடுகிறீர்கள் என்று கேட்டோம்.” এখন শুনছি তোমরাও অনেক ডিম উৎপাদন করছ।
গোদাবরী মাথা নেড়ে বলল—
“అందుకే వచ్చాం. అభినందించడానికి… ఇంకా కొంచెం అసూయ పడడానికి!” তাই এসেছি। অভিনন্দন জানাতে… আর একটু হিংসেও করতে!
বঙ্গলক্ষ্মীর বুক যেন এক ইঞ্চি ফুলে উঠল।
“হ্যাঁ, এখন আমরা কার্যত স্বনির্ভর। আগে যারা ভাবত বাংলা শুধু কবিতা লেখে, তারা এখন দেখুক,বাংলা ডিমও পাড়ে!”
কাবেরী সঙ্গে সঙ্গে খোঁচা দিল—
“அப்படியென்றால், உங்களிடம் முட்டை அதிகம். ஆனால் அதை குழந்தைகள் சாப்பிடுகிறார்களா, அரசியல்வாதிகள் பேசுகிறார்களா?” তা হলে ডিম বেশি হয়েছে। কিন্তু সেটা বাচ্চারা খাচ্ছে, নাকি রাজনীতিবিদরা শুধু তা নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন?
এই প্রশ্ন শুনে পুরো সভাঘর চুপ।
বঙ্গলক্ষ্মী একটু ইতস্তত করে বলল,
“সত্যি কথা বলতে কী… বক্তৃতা খাওয়ানোর লোকের অভাব নেই।”
গোদাবরী এমন জোরে হেসে উঠল যে পাশের খাঁচায় থাকা এক হাঁস ভয় পেয়ে তিনটে ডিম একসঙ্গে পেড়ে ফেলল।
ঠিক তখনই দরজা খুলে এক তরুণ ব্রয়লার মুর্গি হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকল।
“বাঁচান! বড় বিপদ!”
সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল।
“কী হয়েছে?”
সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “দিল্লি থেকে খবর এসেছে… মানুষ নাকি এবার ডিম নিয়েও জাতীয় বিতর্ক করতে বসেছে!”
তিন মুর্গি একসঙ্গে আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর একসঙ্গে শুধু একটি কথাই বলল—
“কক্…!”
( এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয়ই তামিল আর তেলুগু পড়তে শিখে গিয়েছেন। তাই বাদবাকিটা বাংলাতেই)
গোপন সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন শুরু হতেই দেখা গেল তিন মুর্গির মুখই গম্ভীর। প্রথম দিনের হাসি-ঠাট্টা যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে। কারণ, আজকের আলোচ্য বিষয়—“শিশুর পাতে ডিম না রাজনীতির পাতে ডিম?”
সভাপতি মোরগ ঘোষণা করল,
“আজ যে কোনও মুর্গি আবেগপ্রবণ হতে পারে। তবে কেউ যেন রাগের মাথায় ডিম না পাড়ে। গতবার এক প্রতিনিধি উত্তেজনায় পাঁচ মিনিটে চারটে ডিম পেড়েছিলেন।”
বঙ্গলক্ষ্মী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি একটা কথা বুঝি না। মানুষ যখন ছোট থাকে, তখন ডাক্তার বলে,ডিম খাও। বড় হলে জিম ট্রেনার বলে ডিম খাও। বুড়ো হলে পুষ্টিবিদ বলে ডিম খাও। কিন্তু রাজনীতিবিদ হলেই সবাই বলে ডিম নিয়ে কথা বলো!”
সারা হলঘরে চাপা হাসি।
কাবেরী চশমা পরে একটি মোটা ফাইল খুলল।
আমাদের এখানে স্কুলের বাচ্চাদের ডিম দেওয়া রাজনীতি নয়, পুষ্টির বিষয়।
সে আরেকটি পাতা উল্টে বলল— একটি শিশুর পেট দলীয় প্রতীক দেখে ক্ষুধার্ত হয় না।
গোদাবরী তালি দিয়ে উঠল।
একদম ঠিক! বাচ্চার পেট নির্বাচনী ভাষণ খেয়ে ভরে না।
বঙ্গলক্ষ্মী একটু লজ্জা পেল।
“তা ঠিক। কিন্তু আমাদের এখানে এখন ডিম নিয়ে এমন বিতর্ক হচ্ছে যে মনে হচ্ছে ডিম একটা সাংবিধানিক পদ।”
ঠিক তখনই এক কবুতর উড়ে এসে একটি সংবাদপত্র ফেলে গেল।
শিরোনাম দেখে তিন মুর্গিই হতবাক।
“ডিম নিয়ে নতুন রাজনৈতিক তরজা।”
বঙ্গলক্ষ্মী কপালে হাত ঠুকল।
“এই তো! আবার শুরু হল!”
কাবেরী কাগজটা পড়ে মুচকি হাসল।
মানুষ বড় অদ্ভুত। মুর্গির সাক্ষাৎকার কেউ নেয় না, কিন্তু ডিম নিয়ে সারাদিন বিতর্ক করে।
গোদাবরী গম্ভীর মুখে বলল—
ডিম পেড়েছি আমরা। ঝগড়া করছে দামড়া।
বঙ্গলক্ষ্মী এবার একটু চাঙ্গা হয়ে বলল,
“আমার একটা প্রস্তাব আছে।”
“কী?”
“যাঁরা ডিম নিয়ে টিভিতে তিন ঘণ্টা বিতর্ক করেন, তাঁদের একদিন একটা পোলট্রি ফার্মে পাঠানো হোক।”
গোদাবরী হেসে কুটোপাটি।
সেখানে গিয়েই প্রথম প্রশ্ন করবেন—এই মুর্গি কোন দলের?
কাবেরী সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
তখন মুর্গি উত্তর দেবে—‘আমি ডিম পার্টির!
হাসিতে সভাঘর কেঁপে উঠল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটি বৃদ্ধ দেশি মোরগ উঠে দাঁড়াল।
“আমার বয়স বারো বছর। অনেক কিছু দেখেছি। আগে মানুষ বলত ‘মুরগি আগে না ডিম আগে?’ এখন শুনি, ‘ডিম নিরামিষ না আমিষ?’”
হলঘর আবার হেসে উঠল।
বঙ্গলক্ষ্মী বলল,
“এর পর হয়তো প্রশ্ন উঠবে—ডিম বামপন্থী, ডানপন্থী না মধ্যপন্থী?”
কাবেরী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
ডিমের ডান-বাম কিছু নেই।বাইরে শুধু খোলস আর ভিতরে কুসুম
গোদাবরী সঙ্গে সঙ্গে বলল—
কিন্তু মানুষ প্রতিটি ডিমকেই যেন কোনও না কোনও দলের সদস্য করে দিচ্ছে।
এমন সময় সম্মেলনের বাইরে হট্টগোল।
একটা হাঁস দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল—
“সাংবাদিকরা এসেছে! সাংবাদিকরা এসেছে!”
সব মুর্গি একসঙ্গে চমকে উঠল।
“কেন?”
“ওরা জানতে চাইছে—তোমাদের মধ্যে কে নিরামিষ, কে আমিষ, আর কে রাজনৈতিক!”
বঙ্গলক্ষ্মী মাথা নেড়ে বলল,
“এবার বুঝলাম, মানুষ শুধু প্রশ্ন করতেই পৃথিবীতে এসেছে।”
কাবেরী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
(আমাদের বাইরে যাওয়া উচিত নয়।)
গোদাবরী ফিসফিস করে বলল—
কেন?
কাবেরী গভীর গলায় উত্তর দিল—
আমাদের সাক্ষাৎকার নেবে না। আমাদের নিয়ে বিতর্ক করবে।
এই কথাটা শুনে তিন মুর্গিই একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
দূরে কোথাও একটি ডিম সেদ্ধ হচ্ছিল।
সেদ্ধ হতে হতে সে বিড়বিড় করে বলল—
“হায় রে! আমাকে কেউ খেলে আপত্তি নেই। কিন্তু আমাকে নিয়ে এত কথা কেন?”
সভাপতি মোরগ ঘণ্টা বাজাল।
“আগামী অধিবেশনের বিষয়—‘ডিম ছোড়া: প্রতিবাদের নতুন ভাষা, না মুর্গি সমাজের অপমান?’”
তিন মুর্গি একে অপরের দিকে তাকাল।
তারপর বঙ্গলক্ষ্মী আস্তে করে বলল,
“মনে হচ্ছে কালকের সভা আরও গরম হবে…” (চলবে)