Home দৃষ্টিভঙ্গিসুমন নামা পরাজয়ের পর পলায়ন: আদর্শ নয়, বেঁচে থাকার রাজনীতি

পরাজয়ের পর পলায়ন: আদর্শ নয়, বেঁচে থাকার রাজনীতি

Authored By সুমন চট্টোপাধ্যায়
14 views 5 minutes read
A+A-
Reset

নির্বাচনে পরাজয়ের পর কোনও রাজনৈতিক দলের নেতারা যদি একে একে বিজয়ী শিবিরে নাম লেখাতে শুরু করেন, তাহলে সেটিকে আদর্শগত পরিবর্তন বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং সেটি ক্ষমতার বাস্তব অঙ্ক। রাজনীতিতে আদর্শ, নীতি, কর্মসূচি—এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর যে নির্মম বাস্তবতা সামনে আসে, তা অনেক সময় সমস্ত আদর্শকে ছাপিয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক ভাঙন সেই বাস্তবতারই এক স্পষ্ট উদাহরণ।

ভারতের রাজনীতিতে দলবদল নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই নানা সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দলবদলের গতি সবচেয়ে বেশি হয় তখনই, যখন কোনও দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দল হঠাৎ ক্ষমতা হারায়। কারণ ক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নয়; সেটি রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সাংগঠনিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক মর্যাদারও উৎস। ক্ষমতা চলে গেলে এই চারটি স্তম্ভই একসঙ্গে নড়ে ওঠে।

তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও সেই চিত্রই ফুটে উঠছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের বহু নেতা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছিলেন। তাঁদের সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশই নির্ভর করত সরকার, প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রভাবের উপর। ভোটে পরাজয়ের পর সেই ভিত্তি ভেঙে পড়তেই অনেকের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিরোধী দলে থেকে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব, নাকি নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি নিরাপদ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বহু নেতা প্রকাশ্যে কিংবা নেপথ্যে নতুন সমীকরণের দিকে ঝুঁকছেন। বিদ্রোহী তৃণমূল নেতাদের অনেকেই সরাসরি স্বীকার করছেন, বিরোধী দলে থাকলে জনরোষের মুখে পড়তে হবে। এতদিন যাঁরা ক্ষমতার প্রতীক ছিলেন, তাঁদের এখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, পুরনো অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নির্বাচনে পরাজয় কেবল ভোটের ফল নয়; এটি জনমতের পরিবর্তনেরও বার্তা। সেই পরিবর্তিত জনমতের চাপ সামলানো সহজ নয়।

এর সঙ্গে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা। ক্ষমতায় থাকার সময় বহু অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সরকার বদল হলে সেই অভিযোগগুলির আইনি পরিণতি সামনে আসতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য তদন্তকারী সংস্থার নজরদারি অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা অভিযোগ জমা হয়েছে, তাঁদের কাছে ক্ষমতাসীন শিবিরের নৈকট্য অনেক সময় এক ধরনের রাজনৈতিক নিরাপত্তাবলয় বলে মনে হয়। এই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভাঙন তাই কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প নয়; এটি ক্ষমতার মনস্তত্ত্বেরও প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দলের সাংগঠনিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে ওঠে যে, অনেক নেতা বিরোধী রাজনীতির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতই থাকেন না। তাঁদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছে ক্ষমতার ভিতরে, বেড়ে উঠেছে প্রশাসনিক সুবিধার পরিবেশে। ফলে হঠাৎ বিরোধী দলে বসে আন্দোলন, জনসংযোগ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন—এসবের জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তা অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত।

এখানেই প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতানির্ভর নেতৃত্বের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। যাঁদের ভিত্তি আদর্শ, সংগঠন এবং জনসংযোগের উপর নির্মিত, তাঁরা পরাজয়ের পরও লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু যাঁদের শক্তি মূলত ক্ষমতা থেকে এসেছে, তাঁদের কাছে ক্ষমতা হারানো মানেই রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট। ফলে দলবদল তখন আদর্শের নয়, আত্মরক্ষার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এই প্রবণতা শুধু দলত্যাগী নেতাদের দোষ বলে দেখলেও ভুল হবে। রাজনৈতিক দলগুলির সাংগঠনিক সংস্কৃতিও এর জন্য দায়ী। যখন কোনও দলে ব্যক্তিনির্ভরতা প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যায়, যখন মতাদর্শের চেয়ে ক্ষমতার সুবিধা বড় হয়ে ওঠে, তখন সেই দলে রাজনৈতিক কর্মীর বদলে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ক্ষমতা থাকলে তাঁরা আনুগত্য দেখান, ক্ষমতা চলে গেলে নতুন আশ্রয় খোঁজেন। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক, কারণ এতে রাজনৈতিক আদর্শের মূল্য ক্রমশ কমে যায়।

তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি আরও একটি শিক্ষা দেয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন যে সাংগঠনিক শক্তিকে অটুট বলে মনে হয়, তার বড় অংশই আসলে ক্ষমতার আকর্ষণে তৈরি। নির্বাচনের ফল বদলাতেই সেই শক্তির প্রকৃত চরিত্র সামনে আসে। অনেক নেতা যাঁরা গতকাল পর্যন্ত দলীয় নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের কথা বলতেন, আজ তাঁরাই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই পরিবর্তন ব্যক্তিগত হলেও এর প্রভাব পড়ছে গোটা দলের উপর।

অবশ্য দলত্যাগের আরেকটি অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। ক্ষমতার সঙ্গে নানা ধরনের সুযোগ, প্রভাব এবং সম্পদের প্রবাহ যুক্ত থাকে। ক্ষমতা হারালে সেই প্রবাহও থেমে যায়। ফলে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক সময় অর্থনৈতিক হিসাবের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন শিবিরের কাছে থাকা মানে শুধু রাজনৈতিক নিরাপত্তা নয়; ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সুবিধার দরজাও খোলা রাখা। যদিও এই অভিযোগ সব ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়, তবু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ মনে করেন, এই হিসাব দলবদলের অন্যতম চালিকাশক্তি।

গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, যদি রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পূর্ণভাবে লেনদেনের সম্পর্কে পরিণত হয়, তাহলে ভোটারের বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ একজন প্রার্থীকে ভোট দেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, দল এবং প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। নির্বাচনের কিছুদিনের মধ্যেই যদি সেই প্রতিনিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে চলে যান, তাহলে ভোটারের রায়ের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে দলবদল কেবল দলীয় সমস্যা নয়; এটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রেরও একটি বড় সংকট।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বর্তমান ভাঙন তাই কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি কত দ্রুত আনুগত্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক দলগুলির জন্যও সতর্কবার্তা। সংগঠন যদি আদর্শ, নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের উপর দাঁড়িয়ে না থাকে, তাহলে ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই সংগঠন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

রাজনীতিতে দলবদল কখনও পুরোপুরি বন্ধ হবে না। ব্যক্তিগত মতাদর্শগত পরিবর্তন, নীতিগত মতভেদ কিংবা রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—এসব গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যখন দলবদলের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে আত্মরক্ষা, তদন্তের ভয়, জনরোষ এড়ানোর চেষ্টা কিংবা ক্ষমতার সম্ভাব্য সুবিধা, তখন সেটি আর গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক লেনদেনের প্রকাশ।

তৃণমূলের বর্তমান অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—আমাদের রাজনীতি কি এখনও আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে, নাকি ক্ষমতাই এখন আনুগত্যের একমাত্র মুদ্রা?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles