থাইল্যান্ডের একটি নামী স্কুলে শুক্রবার ঘটে গেল মর্মান্তিক বন্দুক হামলা। রাজধানী ব্যাঙ্ককের উত্তরে ননথাবুরি প্রদেশের দেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে এক ছাত্রের এলোপাথাড়ি গুলিতে হামলাকারী-সহ সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। পুলিশের দাবি, হামলার পর অভিযুক্ত ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। তবে কী কারণে সে এই হামলা চালাল এবং আগ্নেয়াস্ত্র কোথা থেকে পেল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনার পরই স্কুল চত্বরে পৌঁছয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, উদ্ধারকারী দল এবং জরুরি চিকিৎসাকর্মী। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী এবং শুরু হয় তল্লাশি অভিযান।
ননথাবুরি প্রাদেশিক পুলিশের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেচরাপি কংদি জানান, নিহতদের মধ্যে সন্দেহভাজন বন্দুকবাজও রয়েছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের স্থায়ী সচিব আরসিত সাম্পানথারাত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত ওই স্কুলেরই ছাত্র। প্রথম গুলিবর্ষণের খবর পাওয়ার পরও সে স্কুলের ভেতরেই ছিল, ফলে দীর্ঘ সময় জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্যাম্পাসে।
শ্রেণিকক্ষে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা
হামলার সময় বহু ছাত্রছাত্রী শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ করে ভেতরে আশ্রয় নেন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, অন্য একটি ভবন থেকে একের পর এক গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। বাইরে কী ঘটছে, তা বুঝতে না পেরে তারা আতঙ্কে অপেক্ষা করতে থাকেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর পুলিশ প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার পর তাঁদের একে একে স্কুল ভবন থেকে বের করে আনা হয়।
ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পরেও স্কুলের বাইরে আতঙ্কের পরিবেশ ছিল স্পষ্ট। অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। এদিকে পুলিশের তল্লাশি চলছিল স্কুলের বিভিন্ন অংশে, আর বাইরে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল একাধিক অ্যাম্বুল্যান্স।
তিন হাজারের বেশি পড়ুয়ার স্কুল
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে দেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে প্রায় ৩,১০০ জন ছাত্রছাত্রী এবং ১৪৭ জন শিক্ষক ছিলেন। ফলে হামলার খবর প্রকাশ্যে আসতেই কয়েক হাজার পড়ুয়ার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
এই স্কুলটি থাইল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি দেবসিরিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেটওয়ার্কের অংশ, যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল থাই রাজপরিবারের উদ্যোগে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীদের মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিকরাও রয়েছেন।
কেন হামলা, উত্তর খুঁজছে পুলিশ
পুলিশ এখনও হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানায়নি। অভিযুক্তের সঙ্গে নিহতদের কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না, নাকি সে নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, একজন ছাত্র কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে স্কুলে ঢুকতে পারল। অস্ত্রটি তার নিজের ছিল, নাকি অন্য কারও কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায়।
হামলাকারী আত্মহত্যা করায় ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি কোনও জবানবন্দি পাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অভিযুক্তের সাম্প্রতিক গতিবিধিই এখন তদন্তের মূল ভরসা।
এই হামলা ফের থাইল্যান্ডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী থাকা একটি স্কুলে একজন পড়ুয়া কীভাবে অস্ত্র নিয়ে ঢুকে প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারল, তার উত্তর খুঁজতেই এখন জোর দিয়েছে প্রশাসন।