Home খবররাজ্য কংক্রিটের জঙ্গলেই বাড়ছে কলকাতার উষ্ণতা, সতর্কবার্তা আইআইটি-খড়্গপুরের গবেষণায়

কংক্রিটের জঙ্গলেই বাড়ছে কলকাতার উষ্ণতা, সতর্কবার্তা আইআইটি-খড়্গপুরের গবেষণায়

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
13 views 3 minutes read
A+A-
Reset

কলকাতার দ্রুত নগরায়ন, বহুতল নির্মাণ এবং কংক্রিটের বিস্তার শুধু শহরের চেহারাই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে তার আবহাওয়াও। শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সবুজের জায়গা দখল করে নিয়েছে কংক্রিট, অ্যাসফল্ট ও নির্মাণকাজ। তারই প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে কলকাতায় ক্রমশ তীব্র হচ্ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাব। আইআইটি-খড়্গপুরের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং ভূমির ব্যবহার বদলের ফলে শহরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।

গবেষকদের মতে, শহরে কংক্রিট, ইট, কাচ ও বিটুমিনের মতো নির্মাণসামগ্রী দিনের বেলায় বিপুল পরিমাণ সৌর তাপ শোষণ করে। রাতে সেই তাপ ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এই ঘটনাকেই বলা হয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’। কলকাতায় গত দুই দশকে বহুতল, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স, প্রশস্ত সড়ক ও নির্মিত এলাকার দ্রুত সম্প্রসারণ এই প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

আইআইটি-খড়্গপুরের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নগর তাপমাত্রা এবং বায়ুদূষণকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার সম্পূর্ণ চিত্র ধরা যায় না। বরং এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর অনেক বেশি ক্ষতিকর। সেই কারণেই গবেষকেরা ‘আরবান হিট অ্যান্ড পলিউশন ইনডেক্স’ (Urban Heat and Pollution Index বা UHPI) নামে একটি সূচক তৈরি করেছেন, যা তাপপ্রবাহ ও দূষণের সম্মিলিত ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক হবে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, নগরায়নের ফলে গাছপালা ও খোলা মাটির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভূমির স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ভিদের মাধ্যমে যে বাষ্পীভবন ও জলীয় বাষ্প নির্গমন ঘটে, তা পরিবেশকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু কংক্রিটের বিস্তারে সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, গাড়ির ধোঁয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, শিল্পকারখানা এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ড থেকেও অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হচ্ছে, যা শহরের সামগ্রিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রবীণ মানুষ, শিশু, নির্মাণশ্রমিক, পথবিক্রেতা এবং খোলা আকাশের নীচে দীর্ঘ সময় কাজ করা মানুষজন। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা একসঙ্গে বেড়ে গেলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্‌রোগ ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বায়ুদূষণের সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ যুক্ত হলে সেই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।

গবেষকেরা মনে করছেন, নগর পরিকল্পনায় পরিবর্তন না আনলে আগামী দিনে কলকাতার তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে সবুজ পরিসর সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা, ছাদে সবুজায়ন, প্রতিফলক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং রাস্তার ধারে বড় আকারে বৃক্ষরোপণের মতো পদক্ষেপ জরুরি। এতে শহরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আইআইটি-খড়্গপুরে এর আগেও এমন বিশেষ ধরনের ছিদ্রযুক্ত কংক্রিট নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যা প্রচলিত কংক্রিটের তুলনায় কম তাপ শোষণ করে এবং বৃষ্টির জল মাটিতে ঢুকতে সাহায্য করে। গবেষকদের দাবি, এই ধরনের উপাদান রাস্তা, ফুটপাত বা পার্কিং এলাকায় ব্যবহার করলে নগর তাপমাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে তা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কলকাতার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু নতুন বহুতল নির্মাণ নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পনাহীন কংক্রিটের বিস্তার অব্যাহত থাকলে তাপপ্রবাহের সময় শহরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নগর পরিকল্পনাকে পরিবেশবান্ধব না করলে কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরগুলির সামনে স্বাস্থ্য, জ্বালানি ব্যবহার এবং জীবনযাত্রার মান—সব ক্ষেত্রেই নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles