এল নিনো সতর্কতা: বর্ষা বাঁচলেও আসল বিপদ শীত ও গ্রীষ্মে!

যা জানা জরুরি
- প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো এখন আর আশঙ্কা নয়, বাস্তব।
- বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা এই জলবায়ুগত ঘটনা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ‘অত্যন্ত প্রবল’ এল নিনোয় পরিণত হতে পারে।
- আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো এখন আর আশঙ্কা নয়, বাস্তব। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা এই জলবায়ুগত ঘটনা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ‘অত্যন্ত প্রবল’ এল নিনোয় পরিণত হতে পারে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। সংস্থার পাঁচ দশকের ইতিহাসে এল নিনো সম্পর্কে এত নিশ্চিত পূর্বাভাস আগে দেওয়া হয়নি। তবে ভারতের ক্ষেত্রে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব এ বছরের বিদায়ী বর্ষায় নয়, পড়তে পারে শীত থেকে পরবর্তী গ্রীষ্মের মধ্যে।
নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি হয়ে উঠলে এল নিনোর জন্ম হয়। সমুদ্রের এই উত্তাপ বায়ুমণ্ডলের প্রবাহ বদলে দেয়। তার প্রভাবে পৃথিবীর এক প্রান্তে খরা, অন্য প্রান্তে অতিবৃষ্টি, কোথাও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা দিতে পারে। এ বার প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা এবং বায়ুমণ্ডলীয় লক্ষণগুলি এতটাই স্পষ্ট যে, পূর্বাভাসদাতা বিভিন্ন মডেলের মধ্যে বিরল ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, এল নিনো বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছতে পারে। কিন্তু সমুদ্রের উত্তাপ কমতে শুরু করলেও তার অভিঘাত সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে না। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের উপরে এর প্রভাব ২০২৭ সালেও বহু মাস বজায় থাকতে পারে। প্রবল এল নিনো বিশ্বজুড়ে খরা, বন্যা এবং চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সংস্থাটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, এল নিনো শক্তিশালী হলেই প্রতিটি দেশে সমান মাত্রায় বিপর্যয় ঘটবে—এমন সরল সমীকরণ নেই। স্থানীয় সমুদ্রতাপ, ভারত মহাসাগরের অবস্থা এবং আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহও ফল নির্ধারণ করে।
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ইতিমধ্যেই শেষ পর্বে পৌঁছে গিয়েছে। ফলে এখন এল নিনো আরও শক্তিশালী হলেও এ বছরের বর্ষার প্রধান অংশ তার সরাসরি ধাক্কা এড়িয়ে যেতে পারে। স্কাইমেটের আবহাওয়াবিদ মহেশ পালাওয়াত হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন, বিদায়ী বর্ষার উপরে তাৎক্ষণিক প্রভাব সম্ভবত সীমিত থাকবে। কিন্তু বৃষ্টির ভৌগোলিক বণ্টন বদলে যেতে পারে এবং পরবর্তী মাসগুলিতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের উপরে থাকার আশঙ্কা বাড়বে।
প্রথম নজর থাকবে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর দিকে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের এই বর্ষাই তামিলনাড়ু এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের জলের প্রধান উৎস। এল নিনোর বছরে উত্তর-পূর্ব বর্ষা কখনও বেশি সক্রিয় হয়। কিন্তু তার অর্থ সর্বত্র সমান বৃষ্টি নয়। দীর্ঘ শুষ্ক বিরতির পরে স্বল্প সময়ে প্রবল বর্ষণ হলে কৃষি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনই শহরে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও শক্তির ক্ষেত্রেও সমুদ্রের অতিরিক্ত উত্তাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় উদ্বেগ শীতকাল। এল নিনোর প্রভাবে ভারতের বহু অঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। অর্থাৎ শীতের স্থায়িত্ব কমা, শৈত্যপ্রবাহের প্রকৃতি বদলে যাওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় তুষারপাতের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। উত্তর-পশ্চিম ভারতে শীতকালীন বৃষ্টি গম, সর্ষে ও ছোলার মতো রবি ফসলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমি ঝঞ্ঝার সংখ্যা বা গতিপথ বদলালে কৃষি উৎপাদনে তার প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত উষ্ণতা গমের দানা পূর্ণ হওয়ার সময় কমিয়ে ফলনও কমাতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ২০২৭ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মকে ঘিরে। শক্তিশালী এল নিনোর পরের বছরগুলিতে বিশ্ব উষ্ণতার নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। তার সঙ্গে মানুষের সৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন যুক্ত হলে মার্চ থেকেই তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে। বাড়তে পারে বিদ্যুতের চাহিদা, জলসংকট এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সূচনাতেও এল নিনোর অবশিষ্ট প্রভাব পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে ২০২৭ সালের প্রথম কয়েক মাসে প্রশান্ত মহাসাগর কত দ্রুত নিরপেক্ষ অবস্থায় ফেরে তার উপরে।
সুতরাং ভারতের জন্য বিপদটি এক দিনের বা এক ঋতুর নয়। এখনই কৃষি পরিকল্পনা, জলাধার পরিচালনা, তাপপ্রবাহ মোকাবিলা এবং শহরের বন্যা-প্রস্তুতি সমন্বিত করা প্রয়োজন। এল নিনো বিপর্যয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু বিপদের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এ বছরের বিদায়ী বর্ষা হয়তো বড় ধাক্কা এড়াবে; আসল পরীক্ষা শুরু হতে পারে শীত থেকে এবং তার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় দেখা দিতে পারে আগামী বসন্তে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



