হাইলাইটস:

  • ফ্রান্সে ইতিহাসের উষ্ণতম দিন রেকর্ড হয়েছে; তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
  • ব্রিটেনে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা।
  • পশ্চিম ইউরোপে এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বড় তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে।
  • বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হচ্ছে।
  • ইউরোপ বিশ্বের অন্য সব মহাদেশের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে।
  • গবেষণায় দেখা গেছে, একই গ্রীষ্মে পরপর তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি থেকে শুরু করে ব্রিটেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও রেকর্ড ভাঙছে। ফলে সূর্য ডোবার পরও মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না।

ফ্রান্সে মঙ্গলবার ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দিন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস শহরে তাপমাত্রা পৌঁছায় ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১১.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। ব্রিটেনেও বুধবার ও বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জুন মাসের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।

এটি চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় তাপপ্রবাহ। মাত্র এক মাস আগেও ইউরোপ একই ধরনের চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছিল। সেই সময় ব্রিটেনে মে মাসের তাপমাত্রার রেকর্ড ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ব্যবধানে ভেঙেছিল। এমনকি জুনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডও প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিল।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাতের উষ্ণতা। সাধারণত রাতের শীতলতা মানুষের শরীরকে কিছুটা আরাম দেয়। কিন্তু এবার সেই সুযোগও মিলছে না। গত মাসে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি রাত রেকর্ড করা হয়, যখন দেশের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে যাচ্ছে। তার প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যাচ্ছে ইউরোপে।

ইউরোপ অন্য মহাদেশগুলির তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বায়ুদূষণ কমে যাওয়ায় আকাশে সূর্যালোক প্রতিফলিত করে মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেওয়া ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে তুষার আচ্ছাদনও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ভূমি আরও বেশি সূর্যতাপ শোষণ করছে। এছাড়া বায়ুমণ্ডলের চলাচলের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে, যা গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে তাপপ্রবাহের সর্বোচ্চ সীমা কোথায়?

ইংল্যান্ডের ইউরোপীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী রেবেকা এমার্টন বলেন, তাপপ্রবাহ যে আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হচ্ছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। কিন্তু এখন যে বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে, তা হলো কত বড় ব্যবধানে পুরনো রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের জলবায়ুবিজ্ঞানী এরিখ ফিশার ও তাঁর সহকর্মীরা কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে সম্ভাব্য চরম তাপপ্রবাহের চিত্র তৈরি করেছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, একই গ্রীষ্মে একটি তাপপ্রবাহের পর আরেকটি তাপপ্রবাহ এলে দ্বিতীয়টি আরও বেশি তীব্র হতে পারে।

কারণ প্রথম দফার প্রচণ্ড গরম মাটির আর্দ্রতা শুকিয়ে দেয়। এরপর সূর্যের শক্তির বড় অংশ আর জল বাষ্পীভূত করতে ব্যয় হয় না; বরং সরাসরি বাতাসকে আরও গরম করে তোলে। ফলে পরবর্তী তাপপ্রবাহ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।

নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লরা সুয়ারেজ-গুতিয়েরেজ মনে করেন, শুধু একদিনের ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো তাপমাত্রাও সমান বিপজ্জনক হতে পারে।

তাঁর কথায়, “আমরা হয়তো ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি দিনের জন্য কিছুটা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু টানা এক মাস ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, জলসম্পদ কিংবা সামাজিক অবকাঠামো তা সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ শুধু তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার বিষয় নয়। আরও বড় উদ্বেগ হলো এর স্থায়িত্ব। টানা কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে অস্বাভাবিক গরম চললে মানুষের শরীর, কৃষি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং নগর জীবনের ওপর তার প্রভাব হতে পারে বিপর্যয়কর।

অতএব, ইউরোপের বর্তমান তাপপ্রবাহ কেবল একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান হুমকির একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে শুধু তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা নয়, দীর্ঘস্থায়ী চরম গরমের ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।