Home পরিবেশ ও জলবায়ূ জুলাইয়ে বিশ্বের সমুদ্রের তাপমাত্রা সর্বকালীন রেকর্ডে, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

জুলাইয়ে বিশ্বের সমুদ্রের তাপমাত্রা সর্বকালীন রেকর্ডে, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

চরম আবহাওয়া একে অন্যকে আরও ভয়াবহ করছে

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
3 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বের সমুদ্রগুলির উপরিভাগের তাপমাত্রা গত জুলাই মাসে ওই মাসের হিসাবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মেরু অঞ্চলের শীতল সমুদ্র বাদ দিলে গোটা বিশ্বের গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা জুলাই মাসে আগের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। ভেঙে গিয়েছে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের আগের রেকর্ডও।

বিশেষ করে আটলান্টিক মহাসাগরের ইউরোপীয় উপকূল এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে জুলাইয়ের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউরোপ ঘিরে থাকা বিভিন্ন সমুদ্রে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ। একই সময়ে পশ্চিম ইউরোপও প্রবল গরমে বিপর্যস্ত হয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিশ্বের স্থলভাগের গড় বায়ুর তাপমাত্রা অবশ্য ২০২৪ সালের জুলাইয়ের তুলনায় সামান্য কম ছিল—মাত্র ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্যবধান এতই সামান্য যে বিজ্ঞানীরা ২০২৪ ও ২০২৬ সালের জুলাইকে কার্যত যৌথ ভাবে ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাই বলে বিবেচনা করছেন।

আরও উদ্বেগজনক ছবি পশ্চিম ইউরোপে। চলতি বছরের জুন ও জুলাই মিলিয়ে সেখানে ইতিহাসের উষ্ণতম দুই মাসের গ্রীষ্মকালীন পর্ব রেকর্ড করা হয়েছে। কোপারনিকাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের প্রথম দুই মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২.৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। চার বছর আগে তৈরি আগের রেকর্ডও এতে ভেঙে গিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক গরমের স্থায়িত্ব। মধ্য ইউরোপের একাধিক দেশ তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত। অস্ট্রিয়া ও স্লোভাকিয়া-সহ কয়েকটি দেশে জাতীয় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। দীর্ঘস্থায়ী গরমে গাছপালা ও মাটি শুকিয়ে যাওয়ায় দাবানলের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে।

ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের জলবায়ুবিজ্ঞানী সামান্থা বার্জেসের মতে, এ বছরের গ্রীষ্ম দেখিয়ে দিয়েছে কী ভাবে জলবায়ু বিপর্যয় বিভিন্ন চরম পরিস্থিতিকে পরস্পরের শক্তিবর্ধক করে তুলছে।

তাঁর ব্যাখ্যা, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপ বলয় পশ্চিম ইউরোপের উপর গরম আটকে রেখেছে। সেই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা আবার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের খরাকে আরও তীব্র করেছে। মাটি শুকিয়ে গেলে তার স্বাভাবিক শীতলীকরণ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাপ আরও সহজে জমতে থাকে। অর্থাৎ গরম খরাকে বাড়াচ্ছে, আবার খরা পাল্টা গরমকে আরও তীব্র করে তুলছে।

জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণে শক্তিশালী হয়ে ওঠা একের পর এক তাপপ্রবাহ বসন্তের শেষ থেকেই ইউরোপে আঘাত করেছে। জুনের শেষের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

কোপারনিকাস জানিয়েছে, মে ও জুনে যে শুষ্ক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, জুলাইয়ে তা আরও ভয়াবহ হয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন এবং জার্মানি ও ব্রিটেনের কিছু অংশে বৃষ্টিপাত ও মাটির আর্দ্রতা অস্বাভাবিক ভাবে কমেছে। নদীগুলিতে জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পানীয় জলের সরবরাহ, কৃষিতে সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে শীতলীকরণের জন্য পর্যাপ্ত জল না পাওয়ায় গত সপ্তাহে পোল্যান্ডের দু’টি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও ৪৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম বার একই কারণে বন্ধ হয়েছে।

তাপপ্রবাহ ও খরা এখন ইউরোপের অর্থনীতির অন্যতম বড় পরিবেশগত বিপদ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক হিসাবে শুধু জুনের তাপপ্রবাহেই শস্য উৎপাদক কৃষকদের প্রায় ২০০ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা, তাৎক্ষণিক ক্ষতির তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে—বিশেষ করে খরা যদি বছরের পর বছর চলতে থাকে। সিএমসিসি ইউরোপীয় অর্থনীতি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে হওয়া নতুন এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের দীর্ঘ খরায় ইউরোপের প্রায় ৪৩ হাজার ৯০০ কোটি ইউরোর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল।

গবেষণার প্রধান লেখক মার্তা মাস্ত্রোপিয়েত্রোর বক্তব্য, এক বছরের খরাও অর্থনীতিতে বাস্তব ক্ষতি করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। তার প্রভাব কৃষি থেকে শিল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং খরা শেষ হওয়ার পরেও বছরের পর বছর ক্ষতি জমতে থাকে। প্রচলিত অর্থনৈতিক হিসাবের পদ্ধতিতে এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বড় অংশ ধরা পড়ে না।

চলতি বছরের শুরু থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ লক্ষ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গিয়েছে। ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্যব্যবস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্বলন্ত গাছপালা থেকে নির্গত ঘন ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণও স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে। প্রচণ্ড গরম, শুষ্কতা ও জোরালো বাতাস—এই তিনের সম্মিলনে দাবানল নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বছরের এই সময়ের হিসাবে দাবানলের তীব্রতাও নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।

স্পেনের লেইদা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন প্রকৌশলের অধ্যাপক ভিক্টর রেসকো দে দিয়োসের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমশ এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা বিশাল আকারের ‘মহাদাবানল’-এর পক্ষে আদর্শ।

তবে তাঁর মতে, যথাযথ ভাবে গাছপালা ও বনাঞ্চলের ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে এই বিপদ অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু সতর্কবার্তাটিও অত্যন্ত স্পষ্ট—আজ যে আবহাওয়াকে ভয়াবহ চরম পরিস্থিতি বলে মনে হচ্ছে, প্রয়োজনীয় অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা না নিলে কয়েক দশক পরে সেটিই তুলনায় মৃদু বলে মনে হতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles