প্রথমবারের মতো অন্য কোনও গ্রহে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী অক্সিজেন তৈরি করে দেখালেন বিজ্ঞানীরা। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকেই সংগ্রহ করা উপাদান ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে ১২২ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করেছে একটি বিশেষ যন্ত্র। এই সাফল্য ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানব অভিযানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৫ শতাংশই কার্বন ডাই-অক্সাইড। তবে এই যৌগের মধ্যেই রয়েছে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন। পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন আলাদা করার প্রযুক্তি বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর বাইরে, অন্য কোনও গ্রহে এই প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ‘মক্সি’।
‘মক্সি’ বা Mars Oxygen In-Situ Resource Utilization Experiment নামের এই যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT)-র বিজ্ঞানীরা। নাসার সহযোগিতায় তৈরি হওয়া এই প্রযুক্তি ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পারসিভারেন্স রোভারের মাধ্যমে মঙ্গলে পৌঁছায়। গবেষক মাইকেল হেচ্ট এবং জেফরি হফম্যানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ২০২১ সালে Space Science Reviews পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
প্রায় ১৫ কিলোগ্রাম ওজনের মক্সিকে নাসা মাইক্রোওভেনের আকারের যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছিল। আকারে ছোট হলেও এর কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যন্ত্রটি প্রতি ঘণ্টায় ৬ গ্রাম পর্যন্ত ৯৮ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। মূল লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে অক্সিজেন তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম বহন করার প্রয়োজন কমে।
২০২১ সালের শেষের দিকেই দেখা যায়, মক্সি সফলভাবে প্রতি ঘণ্টায় ৬ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করছে। শুধু দিনের নির্দিষ্ট সময় নয়, মঙ্গলের বিভিন্ন ঋতু ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মধ্যেও এর কার্যকারিতা বজায় ছিল। পরবর্তীতে যন্ত্রটির কর্মক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়। ২০২৩ সালে শেষ পর্যায়ের পরীক্ষায় মক্সি প্রতি ঘণ্টায় ১২ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করে, যা বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক লক্ষ্যের দ্বিগুণ।
এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি ‘সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস’ নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়া। প্রথমে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে ধূলিকণা-প্রতিরোধী ফিল্টারের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করা হয়। পরে স্ক্রল পাম্পের সাহায্যে গ্যাসটিকে সংকুচিত করে প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এরপর সেই গ্যাস বিশেষ ধরনের সেরামিক সেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হলে বৈদ্যুতিক শক্তির প্রভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড ভেঙে কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন আয়নে পরিণত হয়। উৎপন্ন অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে সেটিকে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া হয়। একইভাবে কার্বন মনোক্সাইডও মুক্ত করা হয়।
পৃথিবীতে এই প্রযুক্তি পরিচিত হলেও মঙ্গলের কঠিন পরিবেশে এর সফল প্রয়োগই মক্সির সবচেয়ে বড় অর্জন। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে মঙ্গল থেকে মহাকাশচারীদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
মাইকেল হেচ্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চার জন মহাকাশচারীকে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফেরাতে প্রয়োজন হবে প্রায় সাত মেট্রিক টন মিথেন জ্বালানি এবং সেই জ্বালানি ব্যবহারের জন্য আরও প্রায় ২৫ মেট্রিক টন তরল অক্সিজেন। পাশাপাশি মঙ্গলে এক বছর অবস্থানের জন্য তাঁদের প্রয়োজন হবে প্রায় এক মেট্রিক টন অতিরিক্ত শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন।
তবে বর্তমান অবস্থায় মক্সির উৎপাদন ক্ষমতা সেই চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ঘণ্টায় ১২ গ্রাম উৎপাদনের হারে রকেটের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন তৈরি করতে প্রায় ২০ লক্ষ ঘণ্টা সময় লাগবে, যা প্রায় ২৩০ বছরের সমান। আর কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন তৈরি করতেও লাগবে প্রায় সাড়ে ন’ বছর।
এই কারণেই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে মঙ্গলে ব্যবহারের জন্য আরও বড় ও শক্তিশালী অক্সিজেন উৎপাদনকারী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের ব্যবহার উপযোগী একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমকে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ২ থেকে ৩ কেজি অক্সিজেন উৎপাদন করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, যা বর্তমান মক্সি প্রোটোটাইপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি শক্তি।
মহাকাশচারীরা মঙ্গলে পৌঁছানোর অন্তত এক বছর আগে এমন ব্যবস্থা সেখানে চালু করতে হবে এবং সেটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। যদিও সেই মাত্রার প্রযুক্তি এখনও বাস্তবে তৈরি হয়নি।
তবুও মক্সির সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করেছে যে মঙ্গলের পরিবেশেও সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে অক্সিজেন উৎপাদন সম্ভব। মঙ্গলে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়, দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারণের ব্যবস্থা এবং পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি— কোনওটিই এখনও সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু এতদিন যে ধারণা শুধুই তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল, মক্সি তাকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করিয়েছে। মঙ্গলে মানুষের ভবিষ্যৎ উপস্থিতির পথে এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক সূচনা।
মঙ্গলের মাটিতে অক্সিজেন উৎপাদন
6