Home খবর ইউরোপ দেখে শেখেনা, ঠেকেও নয়

ইউরোপ দেখে শেখেনা, ঠেকেও নয়

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
8 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের পরও ইউরোপে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি।
  • চলতি বছরের দাবদাহে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডসহ বহু দেশে ভেঙেছে তাপমাত্রার রেকর্ড।
  • বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই তাপপ্রবাহ এখন অনেক বেশি ঘনঘন ও তীব্র হচ্ছে।
  • আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা মৃত্যুহার কমালেও হাসপাতাল, পরিবহন, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো এখনও অরক্ষিত।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ নয়; সবুজায়ন, ছায়া, উন্নত ভবন নকশা ও নির্গমন কমানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে ২০০৩ সালের মতো ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বারবার ফিরে আসবে। কিন্তু ২০২৬ সালের রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ প্রমাণ করে দিয়েছে, সেই সতর্কবার্তার গুরুত্ব যথেষ্ট উপলব্ধি করা হয়নি। ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল, স্কুল, রেলপথ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং নগরজীবন একের পর এক সংকটে পড়ছে।

এই সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের একটি নার্সারি স্কুলে শিশুদের অভিভাবকদের জরুরি বার্তা পাঠিয়ে আগেভাগে সন্তানদের নিয়ে যেতে বলা হয়, কারণ শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। এমন দৃশ্য শুধু ব্রিটেনেই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিন ও রাত রেকর্ড হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে।

২০০৩ সালের শিক্ষা

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পরিবেশগত মহামারিবিদ পিয়ের মাসেলো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে ২০০৩ সালের সেই ভয়ংকর গ্রীষ্মের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন দক্ষিণ ফ্রান্সে কিশোর মাসেলো গ্রীষ্মকালীন শিবিরে খেলাধুলা করছিলেন, আর ইউরোপজুড়ে তীব্র গরমে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মৃতদের অধিকাংশই ছিলেন প্রবীণ, বিশেষ করে একাকী বসবাসকারী নারী। আজ সেই ব্যতিক্রমী তাপপ্রবাহই প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা বড় হতে হতে আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহের মুখোমুখি হবে, কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইতিমধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রমের পথে।

কিছু অগ্রগতি, কিন্তু যথেষ্ট নয়

২০০৩ সালের পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আগাম তাপ সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে স্কুল বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় হাসপাতাল সেবা স্থগিত, ভ্রমণ সীমিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষার মতো ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উদ্যোগ কার্যকর হয়েছে। একই মাত্রার ২০০৩ সালের তাপপ্রবাহ আজ ঘটলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কম হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, দাবদাহও আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘনঘন হচ্ছে। ফলে অভিযোজনের গতি জলবায়ু পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

প্রস্তুতির অভাব এখনও প্রকট

চলতি তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ডের একাধিক হাসপাতাল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। শীতলীকরণ ব্যবস্থা বিকল হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও রেল পরিষেবা বিপর্যস্ত হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়েছে। ফ্রান্সে অর্ধেকের বেশি বাড়িতে গরম প্রতিরোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে ৫৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চারটি শিশু গরম গাড়ির ভেতরে প্রাণ হারিয়েছে। পর্যাপ্ত ঠান্ডা পানি না পাওয়ায় দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় আঞ্চলিক পরিচালক হান্স ক্লুগের মতে, গত চার বছরে ইউরোপে তাপজনিত কারণে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।

কেন ইউরোপ সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে?

বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপ বিশ্বের অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় আবহাওয়ার ধরন এবং দ্রুত গলতে থাকা আর্কটিক অঞ্চলের প্রভাব। বিশ্ব আবহাওয়া বিশ্লেষক সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের এই জুনের তাপপ্রবাহ ৫০ বছর আগে প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন রাতের অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা ২০০৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে, আর দিনের চরম তাপমাত্রা ঘটার সম্ভাবনা বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর জন্য এল নিনোর কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই; মূল কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।

শুধু শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বত্র শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানোই সমাধান নয়। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি বাড়বে এবং শহরের তাপমাত্রাও আরও বেড়ে যেতে পারে।

তাঁদের সুপারিশ হলো—

  • বাড়ি ও ভবনে ছায়া এবং তাপরোধী নকশা বাড়ানো।
  • উন্নত বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা করা।
  • শহরে আরও বেশি গাছপালা ও সবুজ এলাকা তৈরি করা।
  • হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, স্কুল ও গণপরিবহনে প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
  • প্রবীণ ও অসুস্থ প্রতিবেশীদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে সামগ্রিক সামাজিক সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।

জলবায়ু নীতিতে রাজনৈতিক দ্বিধা

একদিকে তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন সরকার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার যুক্তিতে পরিবেশবান্ধব নীতিমালা শিথিল করছে। চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিরোধিতা করছে, অথচ একই সঙ্গে ব্যাপক শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আবারও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, কার্বন নির্গমন কমানো না গেলে ইউরোপের ভবিষ্যৎ গ্রীষ্ম আরও ভয়াবহ হবে।

সামনে কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের মানুষ এখন তাপপ্রবাহের বিপদ সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কিন্তু প্রতি বছর গ্রীষ্ম শেষ হলেই সেই সচেতনতা অনেকটাই মিলিয়ে যায়। পিয়ের মাসেলোর কথায়, মানুষ এখন জানে দাবদাহ কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু মনে হয়, গ্রীষ্ম শেষ হলেই সবাই আবার তা ভুলে যায়। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, সতর্কবার্তা আর নতুন নয়। নতুন হলো, সেই ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই বর্তমান হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—ইউরোপ কি অবশেষে সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, নাকি প্রতিটি গ্রীষ্মই আরও বড় মানবিক ও অবকাঠামোগত সংকট ডেকে আনবে?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles