কুকুরের মুখ, বাদুড়ের ডানা!

যা জানা জরুরি
- কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে এমন অদ্ভুত দেখতে স্তন্যপায়ী প্রাণী সত্যিই রয়েছে।
- প্রথম দেখায় চওড়া মুখ, দূরে দূরে বসানো চোখ আর ছোট গোলাকার কান দেখে মনে হতে পারে, এই প্রাণীটি বুঝি এখনই ঘেউ ঘেউ করে উঠবে।
- অথচ ডানা মেলে রাতের আকাশে উড়ে বেড়ানোই তার আসল কাজ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কুকুরের মুখ। বাদুড়ের ডানা। শুনতে যেন কোনও রূপকথার প্রাণী! কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে এমন অদ্ভুত দেখতে স্তন্যপায়ী প্রাণী সত্যিই রয়েছে। প্রথম দেখায় চওড়া মুখ, দূরে দূরে বসানো চোখ আর ছোট গোলাকার কান দেখে মনে হতে পারে, এই প্রাণীটি বুঝি এখনই ঘেউ ঘেউ করে উঠবে। অথচ ডানা মেলে রাতের আকাশে উড়ে বেড়ানোই তার আসল কাজ।
এই প্রাণীদেরই মজার ছলে বলা হয় ‘কুকুর-মুখো বাদুড়’। আর নামটি নিছক ইন্টারনেটের দেওয়া কোনও ডাকনাম নয়। এদের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসেও কুকুরের মতো মুখের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে কুকুরের সঙ্গে আত্মীয়তার কোনও সম্পর্ক নেই। মুখের কিছু বৈশিষ্ট্যের কাকতালীয় মিলই তাদের এই অদ্ভুত চেহারা দিয়েছে।
একটি নয়, রয়েছে একাধিক ‘কুকুর-মুখো’ বাদুড়
এই বাদুড়গুলি ‘সাইনোমপস’ গণের অন্তর্ভুক্ত। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় এদের দেখা যায়। এরা মুক্তলেজি বাদুড়ের একটি গোষ্ঠী এবং প্রধানত পতঙ্গ খেয়ে বেঁচে থাকে।
‘সাইনোমপস’ নামটিও এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে—একটি অংশের অর্থ কুকুর, অন্য অংশটি মুখ বা চেহারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে নাম যতই কুকুরঘেঁষা হোক, প্রাণী দুটির বর্গ আলাদা। বাদুড় ‘কাইরোপ্টেরা’ বর্গের, আর কুকুর ‘কার্নিভোরা’ বর্গের স্তন্যপায়ী।
দীর্ঘদিন সাইনোমপস গণে ছ’টি প্রজাতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে গবেষকেরা আরও দু’টি প্রজাতির বর্ণনা প্রকাশ করেন—পানামার ফ্রিম্যানের কুকুর-মুখো বাদুড় বা ‘সাইনোমপস ফ্রিমানি’ এবং ইকুয়েডরের ওয়াওরানি কুকুর-মুখো বাদুড় বা ‘সাইনোমপস টনকিগুই’।
অর্থাৎ, সেই সময় স্বীকৃত প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আট।
আর এখানেই শুরু হয় আসল গোয়েন্দাগিরি।
বাদুড় শনাক্ত করাও এক রকম গোয়েন্দাগিরি
গবেষকেরা ২৪২টি নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন। শুধু বাহ্যিক চেহারা নয়—শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ডিএনএ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাদুড়ের উচ্চ কম্পাঙ্কের ডাক—সবই খতিয়ে দেখা হয়।
ফল? কিছু বাদুড়, যাদের এতদিন অন্য প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল, তারা আসলে সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির সদস্য।
বন্যপ্রাণী গবেষণায় এটি মোটেই বিরল ঘটনা নয়। নতুন প্রজাতি আবিষ্কার মানেই যে কোনও অজানা জঙ্গলে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রাণী খুঁজে পাওয়া, তা নয়। কখনও কখনও ‘নতুন’ প্রাণীটি বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের চোখের সামনে থাকে—জাদুঘরের সংগ্রহে সংরক্ষিত অবস্থায়। শুধু তার আসল পরিচয়টি কেউ বুঝে উঠতে পারেননি।
মজার মুখ, ভয়ংকর গতি
কুকুরের মতো মুখই হয়তো প্রথমে নজর কাড়ে। কিন্তু এই বাদুড়ের আসল চমক লুকিয়ে রয়েছে তার উড়ানে।
এরা নিশাচর এবং প্রধানত পোকামাকড় শিকার করে। সরু ডানা দ্রুতগতিতে উড়ে বেড়ানোর জন্য তৈরি। এমনকি জঙ্গলের মাথার অনেক উপর দিয়েও উড়তে পারে।
এই গতি তাদের দক্ষ শিকারি বানালেও গবেষকদের জন্য তৈরি করে সমস্যা। সূক্ষ্ম গবেষণাজাল পেতে দ্রুত উড়ন্ত এই বাদুড়কে ধরার কাজ মোটেই সহজ নয়।
তাই বিজ্ঞানীরা অনেক সময় জালের বদলে কান পাতেন।
ডাক শুনেই পরিচয়!
অন্ধকারে পথ খুঁজতে এবং শিকার শনাক্ত করতে এই বাদুড়েরা প্রতিধ্বনি-নির্ণয় বা ইকোলোকেশন ব্যবহার করে। তারা অত্যন্ত উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ কোনও বস্তু বা শিকারে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলে তার প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করেই প্রাণীটি বুঝতে পারে সামনে কী রয়েছে এবং কত দূরে রয়েছে।
গবেষকেরা বিশেষ বাদুড়-শনাক্তকারী যন্ত্র দিয়ে সেই ডাক রেকর্ড করেন। ফলে বাদুড়টিকে ধরতে না পারলেও তার উড়ে যাওয়ার শব্দ থেকে প্রজাতি শনাক্ত করার সূত্র পাওয়া যায়।
নতুন দুই প্রজাতিকে আলাদা করে চেনার ক্ষেত্রেও এই ইকোলোকেশন কলের রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠেছিল।
নতুন প্রজাতি ছিল চোখের সামনেই
ফ্রিম্যানের কুকুর-মুখো বাদুড় তার দুর্দান্ত উদাহরণ।
২০১২ সালে পানামার গামবোয়া অঞ্চলে পাঁচ রাত ধরে গবেষকেরা মোট ৫৬টি বাদুড় ধরেছিলেন—১৯টি পুরুষ এবং ৩৭টি স্ত্রী। পরিত্যক্ত কাঠের বাড়ির আশপাশে তাদের পাওয়া যায়। গবেষকেরা একই সঙ্গে তাদের ডাকও রেকর্ড করেন।
পরে শারীরিক বৈশিষ্ট্য, জিনগত তথ্য এবং ডাকের ধরন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এগুলি এতদিন পরিচিত কোনও প্রজাতির সদস্য নয়। এরা পৃথক একটি প্রজাতি।
অর্থাৎ, বছরের পর বছর ধরে পরিচিত একটি বাদুড়ই হঠাৎ বিজ্ঞানীদের কাছে হয়ে উঠল ‘নতুন’।
কুকুরের মুখ এল কোথা থেকে?
এখানে প্রকৃতির কোনও বিশেষ কৌশল নেই। বাদুড়টি কুকুরের মতো দেখতে হওয়ার জন্য বিবর্তিত হয়নি।
চওড়া মুখ, চোখের অবস্থান এবং ছোট গোলাকার কানের সমন্বয়ই এমন একটি মুখ তৈরি করেছে, যা মানুষের মস্তিষ্কের কাছে কুকুরের মুখের সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিলে যায়।
তাই তাকে দেখেই মনে হয়—
“এ তো কুকুর!”
তার পরেই চোখ যায় ডানার দিকে—
“কিন্তু কুকুরের ডানা আবার কবে হল?”
উত্তর অবশ্য একটাই—এটি কুকুর নয়, বাদুড়। আর তার মজার মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে রাতের আকাশে ছুটে বেড়ানো এক ক্ষিপ্র পতঙ্গ-শিকারি স্তন্যপায়ী।
প্রকৃতির মজাটা এখানেই। যে প্রাণীকে প্রথম দেখায় মনে হয় ‘কুকুরের ডানা গজিয়েছে’, তার পরিচয় বুঝতে বিজ্ঞানীদের কখনও কখনও ডিএনএ, মানচিত্র, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এমনকি বাদুড়ের ডাক পর্যন্ত বিশ্লেষণ করতে হয়।
চোখের সামনে থাকা প্রাণীকেও যে প্রকৃতি কত দিন অচেনা করে রাখতে পারে, এই কুকুর-মুখো বাদুড় তারই দারুণ উদাহরণ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



