অনুরাগের জল-জট!

যা জানা জরুরি
- “এক দিকে দুনিয়ার সব পুরুষ, অন্য দিকে অনুরাগ!” পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের হাইড্রোজেন জলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখে এমনই মজার মন্তব্য করলেন তাঁর সঙ্গী শুভ্রা…
- সম্প্রতি তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন অনুষ্ঠান নির্মাতা জ্যানিস সিকেইরা।
- তাঁর সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় ধরা পড়েছে সেই মুহূর্ত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
“এক দিকে দুনিয়ার সব পুরুষ, অন্য দিকে অনুরাগ!”
পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের হাইড্রোজেন জলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখে এমনই মজার মন্তব্য করলেন তাঁর সঙ্গী শুভ্রা শেট্টি। সম্প্রতি তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন অনুষ্ঠান নির্মাতা জ্যানিস সিকেইরা। তাঁর সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় ধরা পড়েছে সেই মুহূর্ত।
ভিডিয়োয় দেখা যায়, একটি বিশেষ হাইড্রোজেন জলের বোতল নিয়ে বেশ উৎসাহী অনুরাগ। বোতলের ঢাকনায় চাপ দিলে কীভাবে নীল আলো জ্বলে ওঠে, তা তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখাচ্ছিলেন। সেই দৃশ্য দেখেই শুভ্রার মন্তব্য, “এক দিকে দুনিয়ার সব পুরুষ, অন্য দিকে অনুরাগ!”
তার পরেই আরও খোঁচা—“ওকে যা খুশি বিক্রি করা যায়।”
শুভ্রার কথা শুনে হেসে ফেলেন জ্যানিস। কিন্তু মজার এই মুহূর্তের আড়ালে উঠে আসে একটি বাস্তব প্রশ্ন—হাইড্রোজেন জল কি সত্যিই সাধারণ জলের চেয়ে বেশি উপকারী?
হাইড্রোজেন জল আসলে কী?
নাম শুনে মনে হতে পারে, এ বুঝি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের কোনও পানীয়। আসলে তা নয়। সাধারণ পানীয় জলের মধ্যেই অতিরিক্ত আণবিক হাইড্রোজেন গ্যাস দ্রবীভূত করা হয়। উচ্চচাপে হাইড্রোজেন মেশানো, হাইড্রোজেন উৎপাদক বড়ি ব্যবহার করা কিংবা বিশেষ যন্ত্র ও বোতলের সাহায্যে এই জল তৈরি করা যায়।
মোহালির ফোর্টিস হাসপাতালের খাদ্যবিদ্যা ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান সোনিয়া গান্ধীর মতে, হাইড্রোজেন জল নিয়ে বৈজ্ঞানিক আগ্রহের মূল কারণ হল শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমানোর সম্ভাবনা।
তবে ‘সম্ভাবনা’ শব্দটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
উপকার আছে, নাকি শুধু হাইপ?
কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হাইড্রোজেন জল পান করার পরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি জৈব সূচকে পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু কোনও একটি সূচকের পরিবর্তন মানেই রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় নিশ্চিত উপকার—এমনটা বলা যায় না।
শরীরচর্চার পর ক্লান্তি কমানো, সহনশক্তি বাড়ানো, পেশির কর্মক্ষমতা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও হাইড্রোজেন জল নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও সামগ্রিক প্রমাণ এখনও একেবারেই চূড়ান্ত নয়।
রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি, রক্তনালির কার্যকারিতা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির কিছু সূচক নিয়েও গবেষণা চলছে। কয়েকটি প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক হলেও সেগুলি এখনও যথেষ্ট ধারাবাহিক নয়।
অর্থাৎ, হাইড্রোজেন জল নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ আছে, কিন্তু বিজ্ঞানের রায় এখনও ‘হ্যাঁ, সব সমস্যার সমাধান’ পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
প্রদাহ, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সূচক, বিপাকক্রিয়া এবং অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। কিন্তু এগুলির কোনওটিই এখনও প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃত নয়।
তাহলে এত হইচই কেন?
সুস্থ থাকা, দীর্ঘায়ু এবং বয়সের ছাপ কমানোর প্রবণতা যত বাড়ছে, ‘অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট’, ‘ডিটক্স’ কিংবা দ্রুত শরীর পুনরুদ্ধারের মতো দাবিতে বাজারজাত পণ্যের জনপ্রিয়তাও তত বাড়ছে।
হাইড্রোজেন জলের ধারণাটিও শুনতে বেশ আকর্ষণীয়—পরিচিত জল, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘হাইড্রোজেন’। তার উপর রয়েছে ঝকঝকে বিশেষ বোতল, আলো জ্বলার প্রযুক্তি, জল তৈরির যন্ত্র এবং সমাজমাধ্যমে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে প্রচার।
ফলে পানীয় জলও যখন ‘ওয়েলনেস প্রোডাক্ট’ হয়ে ওঠে, তখন তার চারপাশে আগ্রহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অনুরাগ কাশ্যপের বোতল-প্রেম নিয়ে শুভ্রার রসিকতা তাই নিছক মজার ঘটনা হলেও, হাইড্রোজেন জল নিয়ে মানুষের বাড়তে থাকা কৌতূহলের ছবিটাও স্পষ্ট করে।
সবার জন্য কি নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির কর্মক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষারীয় বা বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি কিছু জলে অতিরিক্ত খনিজ বা তড়িৎবিশ্লেষ্য পদার্থ থাকতে পারে, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই নিয়মিত পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আর সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হল—হাইড্রোজেন জলকে ওষুধের বিকল্প ভাবা যাবে না।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনও অসুখের চিকিৎসায় চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ, নির্ধারিত খাদ্যাভ্যাস কিংবা প্রমাণিত চিকিৎসাপদ্ধতি বাদ দিয়ে শুধু হাইড্রোজেন জলের উপর নির্ভর করার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
গবেষণা চলছে, সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু আপাতত হাইড্রোজেন জলকে বলা যায় আকর্ষণীয় স্বাস্থ্যপ্রবণতা—প্রমাণিত চিকিৎসা নয়।
আর অনুরাগের ক্ষেত্রে? অন্তত শুভ্রার কথায় মনে হচ্ছে, বোতলের নীল আলো যতটা নজর কেড়েছে, তার চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে অনুরাগের উৎসাহ!
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



