‘পাগল’ করা প্রেম কোথায়?

যা জানা জরুরি
- তবু নীনা গুপ্তর মনে হয়, সিনেমার পর্দায় দেখা কিংবা বইয়ের পাতায় পড়া সেই ‘পাগল করা’ প্রেম তাঁর কপালে জোটেনি।
- যে ভালবাসায় নিজেকে কারও কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয়, সেই অনুভূতিই যেন অধরা।
- নিজের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রীর আক্ষেপ, ‘‘সিনেমায় যে প্রেম দেখি, বইয়ে পড়ি, বাস্তবে কখনও তা অনুভব করিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রেম এসেছে তাঁর জীবনে। ভালবেসে বিয়েও করেছেন। তবু নীনা গুপ্তর মনে হয়, সিনেমার পর্দায় দেখা কিংবা বইয়ের পাতায় পড়া সেই ‘পাগল করা’ প্রেম তাঁর কপালে জোটেনি। যে ভালবাসায় নিজেকে কারও কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয়, সেই অনুভূতিই যেন অধরা। নিজের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রীর আক্ষেপ, ‘‘সিনেমায় যে প্রেম দেখি, বইয়ে পড়ি, বাস্তবে কখনও তা অনুভব করিনি। কেউ আমাকে সে ভাবে ভালবাসেনি।’’
কথাগুলি শুনতে যতটা সরল, তার ভিতরে ততটাই জটিল এক অনুভূতি। জীবনে প্রেম থাকা আর গভীর ভাবে ‘ভালবাসা পাওয়া’—দুটো যে এক নয়, নীনার স্বীকারোক্তি যেন সেই ব্যবধানটিই সামনে আনে।
সম্প্রতি প্রথম প্রেমের স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিলেন নীনা। কলেজজীবনের সেই প্রেমিক ছিলেন আইআইটির ছাত্র। পরে তাঁকেই বিয়ে করেন অভিনেত্রী। সেই সময়ের স্মৃতিতে অবশ্য শুধু রোম্যান্স নেই; রয়েছে সহপাঠীদের ঈর্ষা, পোশাক নিয়ে সামাজিক চোখরাঙানি এবং প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে না-পারার এক মজার অথচ বিষণ্ণ ঘটনা।
কলেজের কয়েক জন সহপাঠী নীনাকে ঈর্ষা করতেন বলে জানিয়েছেন তিনি। কারণ, তাঁর পোশাক এবং চলাফেরায় ছিল অনেক বেশি স্বাধীনতা। নীনা সরু ফিতের হাতকাটা পোশাক পরতেন, অথচ ওই সহপাঠীদের পরতে হত সালোয়ার-কামিজ, ওড়না-সহ। তাঁর ধারণা, নিজেরা যে স্বাধীনতা পেতেন না, সেটিই হয়তো তাঁর প্রতি তাঁদের বিরূপতার কারণ হয়ে উঠেছিল।
তার পর এক দিন প্রেমিকের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা। ভুল করে সেই কথা এক সহপাঠীকে বলে ফেললেন নীনা। খবর পৌঁছে গেল তাঁর মায়ের কাছে। ব্যস, বাড়ি থেকে বেরোনোর অনুমতি বাতিল।
সমস্যা হল, তখন তো মোবাইল ফোনের যুগ নয়। প্রেমিককে ফোন করে জানাবেন, ‘‘আজ আর আসতে পারছি না’’—সেই সুযোগও নেই। ফলে প্রেমিক নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে নীনার জন্য অপেক্ষা করতেই থাকলেন। নীনার কথায়, ‘‘ও আমার জন্য অপেক্ষা করেই গিয়েছিল।’’
একটি সিনেমা দেখা হয়নি। কিন্তু সেই না-পারা দেখা হয়ে রয়ে গেল প্রথম প্রেমের স্মৃতিতে।
আর ঠিক সেখানেই যেন আসে নীনার বর্তমান উপলব্ধির সঙ্গে অতীতের অদ্ভুত বৈপরীত্য। এক দিকে রয়েছে প্রথম প্রেম, সম্পর্ক, এমনকি বিয়ের স্মৃতি। অন্য দিকে তাঁর দাবি—কেউ তাঁকে কখনও সেই ভাবে ভালবাসেনি, যে ভাবে সিনেমার নায়ক-নায়িকারা একে অপরের জন্য পাগল হয়ে যান।
‘‘তা হলে আমিই বা কী করে ভালবাসব? কাউকে তো আমাকে সে ভাবে ভালবাসতে হবে। আমার জন্য কেউ কখনও পাগল হয়নি’’—নীনার কথায় ধরা পড়ে সেই আক্ষেপ।
তবে এটিকে তাঁর গোটা সম্পর্কজীবনের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি আসলে বলছেন নিজের অনুভূতির কথা—বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে পর্দার প্রেমের সঙ্গে তুলনা করলে যে শূন্যতাটা তাঁর মনে তৈরি হয়, তার কথা।
ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রেও নীনা যথেষ্ট সতর্ক। নিউজ১৮ শোশাকে তিনি জানিয়েছেন, মেয়ে মাসাবাকে প্রায়ই বলেন নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিজের মধ্যেই রাখতে এবং অতীত নিয়ে অন্যের সঙ্গে আলোচনা না করতে। তাঁর পরামর্শ, ‘‘বর্তমানে বাঁচতে হবে।’’
অতীতকে আঁকড়ে না থেকে বর্তমানে থাকা—এই দর্শন হয়তো তাঁর নিজের জীবনেও প্রযোজ্য। কারণ প্রেমের স্মৃতি যতই মধুর হোক, সম্পর্কের মূল্য শুধু তার নাটকীয়তা দিয়ে মাপা যায় না।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—কেন অনেকের জীবনে গল্পের মতো প্রেম আসে না?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে মনোবিদ রাশি গুরনানি জানিয়েছেন, এমন অনুভূতি একেবারেই বিরল নয়। প্রেমকে আমরা প্রায়ই একটি সর্বজনীন, নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যেকে একই ভাবে, একই তীব্রতায় কিংবা একই ভাষায় ভালবাসা অনুভব করেন না।
শৈশবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আবেগ প্রকাশের অভ্যাস, প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা কিংবা সম্পর্কের নিরাপত্তা—সবই পরবর্তী জীবনে ভালবাসা পাওয়া ও প্রকাশের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে আবেগগত অবহেলা বা পরিত্যক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতেও ভয় তৈরি হতে পারে। এমনকি কখনও কখনও মনে হতে পারে, ‘‘আমি বুঝি ভালবাসার যোগ্যই নই।’’
তবে এর কোনওটিই নীনার ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থার ব্যাখ্যা নয়। বরং তাঁর মন্তব্যকে বোঝার একটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত মাত্র।
আর ‘সিনেমার মতো প্রেম’ না-পাওয়া মানেই যে জীবন অসম্পূর্ণ, তেমনটাও নয়। বন্ধুত্ব, পরিবার, নিজের কাজ, জীবনের উদ্দেশ্য, আত্মমমতা কিংবা অন্য অর্থপূর্ণ সম্পর্ক থেকেও মানুষ গভীর পরিতৃপ্তি পেতে পারেন। রোম্যান্টিক সম্পর্কের তীব্রতা দিয়ে জীবনের সমস্ত ভালবাসার হিসাব মেলানো সম্ভব নয়।
নীনার কথার আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই। পর্দায় প্রেম যতটা নিখুঁত, বাস্তবের সম্পর্ক ততটাই এলোমেলো। সিনেমায় একটি দৃষ্টিই হয়ে যায় আজীবনের প্রতিশ্রুতি, আর বাস্তবে কখনও একটি ফোন না-পাওয়াও তৈরি করে দূরত্ব।
তাই নীনার আক্ষেপ শুধু ‘ভালবাসা পাইনি’ বলার গল্প নয়। বরং প্রশ্নটা আরও গভীর—আমরা কি সত্যিই ভালবাসাকে অনুভব করি, নাকি সিনেমা-সাহিত্য আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে ভালবাসা দেখতে কেমন হওয়া উচিত?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



