‘কভি তো নজর মিলাও’, ‘তেরা চেহরা’, ‘ভিগি ভিগি রাতোঁ মে’ কিংবা ‘দিল ক্যা করে’—নব্বই ও দুই হাজারের দশকে প্রেমের গানের সমার্থক নাম হয়ে উঠেছিলেন আদনান সামি। সেই গায়ক-সুরকারই এবার ফিরলেন একেবারে নতুন মেজাজে। তাঁর সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একক ‘ইশ্ক তামাশা’-য় প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম আর নিছক কোমল বা স্বপ্নময় নয়—তার সঙ্গে জুড়েছে আগুন, ক্ষোভ আর তীব্র আবেগ।
বুধবার প্রকাশিত গানটিতে বৃষ্টি, পিয়ানো আর প্রেমের মতো তাঁর পরিচিত উপাদান থাকলেও, সাদা-কালো চিত্রায়ণে ফুটে উঠেছে অশ্রু, আগুন এবং ভাঙনের অনুভূতি। ‘ইশ্ক তামাশা নহি বন যায়ে…’—এই লাইনে যেন ধরা পড়েছে প্রেমের এক অন্য রূপ, যা তাঁর আগের সৃষ্টির থেকে অনেকটাই আলাদা।
‘একই জায়গায় আটকে থাকতে চাই না’
এক সাক্ষাৎকারে আদনান বলেন, “এটা অবশ্যই প্রেমের গান। কিন্তু প্রেমকে নানা ভাবে প্রকাশ করা যায়। আগে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রেম আর বৃষ্টি আমার সঙ্গীতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও একজন শিল্পী হিসেবে আমি সব সময় নিজেকে বদলাতে চাই। একই ধরনের গান বারবার করতে ভালো লাগে না।”
ক্যাসেটের যুগ থেকে স্ট্রিমিংয়ের পৃথিবী
আদনান স্মরণ করেন, যখন তিনি সঙ্গীতজগতে আসেন, তখন ছিল অডিও ক্যাসেট আর সিডির যুগ। নতুন ধরনের গান শুনতে গেলে সেটি কিনতেই হতো। ফলে শ্রোতারাও মূলত পরিচিত বা জনপ্রিয় গানই বেছে নিতেন।
“ছোটবেলায় আমারও নির্দিষ্ট বাজেট ছিল। তাই রেডিও বা টিভিতে আগে শোনা গানই কিনতাম। নতুন ধরনের সঙ্গীত আবিষ্কারের সুযোগ খুব কম ছিল। অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই এমন ছিল,” বলেন তিনি।
বিশ্বজোড়া অভিজ্ঞতাই বদলে দিয়েছে ভাবনা
কূটনীতিক বাবার চাকরির কারণে লন্ডন, পর্তুগাল, পাকিস্তান, দুবাই-সহ নানা দেশে থাকার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। পর্তুগালেই তিনি পিয়ানো শেখেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে বিভিন্ন ঘরানার সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত করে।
“বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গীত শুনেই আমি আজকের শিল্পী হয়ে উঠেছি,” বলেন আদনান।
তবে সেই সময় ভারতের মূলধারার শ্রোতারা তাঁর পরীক্ষামূলক সুরের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বলেও মনে করেন তিনি।
স্ট্রিমিং যুগে ‘মুক্ত’ অনুভব করছেন আদনান
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর মন্তব্য, “আগে ১০০ টাকা দিয়ে একটা সিডি কিনতে হতো। এখন একই টাকায় সাবস্ক্রিপশন নিয়ে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তের গান শোনা যায়। এখন একমাত্র সীমাবদ্ধতা মানুষের নিজের।”
তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি মুক্তমনা। তাই এত দিন নিজের মধ্যে আটকে রাখা নানা ধরনের সঙ্গীত এখন প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছেন তিনি।
“অনেক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সুর তৈরি করেছি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে আমি সত্যিই মুক্ত,” বলেন তিনি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা নতুন নয়, সুযোগটাই ছিল কম
আদনান মনে করিয়ে দেন, নতুন কিছু করার চেষ্টা তিনি বরাবরই করেছেন। তেরা চেহরা অ্যালবামে যেমন প্রেমের গানের পাশাপাশি অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে মজার গান কভি নাহি ছিল। আবার লিফট কারা দে অ্যালবামেও ছিল আশা ভোঁসলের সঙ্গে কভি তো নজর মিলাও।
হেসে তিনি বলেন, “নতুন কিছু করতাম ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তবলা-ঢোলক যোগ করে একটু দেশীয় স্বাদ এনে দিতাম।”
লাকি লিপস-এর উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, গানটির মূল সুর ছিল পুরোপুরি লাতিন ঘরানার। পরে তাঁরই অনুরোধে তাতে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র যোগ করা হয়। একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন তেরা চেহরা ও পল দো পল-এর মতো গানেও।
“আমি এখনও বিশ্বাস করি, দেশীয় সুরের ছোঁয়া থাকা জরুরি। সেটাই আমাদের পরিচয়,” বলেন তিনি।
‘এখন আর নিজেকে আটকে রাখতে চাই না’
সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত লিপস্টিক-এর পর ইশ্ক তামাশা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের গান। ভবিষ্যতেও এমন বৈচিত্র্য বজায় রাখার ইচ্ছার কথা জানিয়ে আদনান বলেন, “এত দিন যা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম, এখন সব প্রকাশ করতে চাই। বহু বছর পর আবার সঙ্গীত তৈরি করার আনন্দটা সত্যিই উপভোগ করছি।”
তিনি জানান, রেকর্ড সংস্থা জি মিউজিক তাঁর এই নতুন পরীক্ষামূলক ভাবনাকে শুরু থেকেই সমর্থন করেছে।
আদনানের কথায়, “এখন সঙ্গীত হোক বা সিনেমা—অনেকেই নিরাপদ পথেই হাঁটতে চান। কিন্তু আমার রেকর্ড সংস্থা বরং নতুন কিছু করতে উৎসাহ দেয়। এই সমর্থনই আমাকে আরও নির্ভয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সাহায্য করছে।”