সংস্কৃতি ও বিনোদন

মা ভুললেন, মেয়ে আঁকলেন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • আলঝাইমার্স ধরা পড়ার পর সারা লিভিট বুঝেছিলেন, তাঁদের পরিবার এমন এক অচেনা পথে ঢুকছে, যার কোনও মানচিত্র নেই।
  • পরের ছয় বছর ধরে জমতে থাকল নোট আর ছোট ছোট ছবি।
  • মায়ের মৃত্যুর কয়েক মাস পরে সেই খাতাগুলি নিয়ে মেঝেতে বসেছিলেন সারা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: মায়ের বয়স তখন ৫৫। আলঝাইমার্স ধরা পড়ার পর সারা লিভিট বুঝেছিলেন, তাঁদের পরিবার এমন এক অচেনা পথে ঢুকছে, যার কোনও মানচিত্র নেই। তিনি লিখতে শুরু করলেন, আঁকলেনও। পরের ছয় বছর ধরে জমতে থাকল নোট আর ছোট ছোট ছবি।

মায়ের মৃত্যুর কয়েক মাস পরে সেই খাতাগুলি নিয়ে মেঝেতে বসেছিলেন সারা। শব্দ আর ছবিগুলিকে নতুন করে সাজাতে সাজাতেই তৈরি হল ট্যাঙ্গলস—মাকে হারানোর মধ্যেও তাঁকে ধরে রাখার এক চিত্রকথা।

খাতা থেকে পর্দায়

সেই বই অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্রটি এই সপ্তাহে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের সূত্রে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিচালক লিয়া নেলসনের ট্যাঙ্গলস হাতে আঁকা সাদা-কালো অ্যানিমেশন।

আলঝাইমার্স তাঁর নিজের পরিবারকেও স্পর্শ করেছিল। তাই সারা লিভিটের অভিজ্ঞতার মধ্যে তিনি ব্যক্তিগত এক প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন। ছবিতে শোকের পাশাপাশি হাসির জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিচালকের আশা, পরিচর্যাকারীরা ছবিতে নিজেদের জীবনের কিছুটা ছায়া দেখতে পাবেন এবং বুঝতে পারবেন—এই অভিজ্ঞতায় তাঁরা একা নন।

দুঃখেরও রসবোধ আছে

লিভিটের মায়ের নাম মিজ। লেখিকা জানিয়েছেন, বইয়ে পরিবারের অভিজ্ঞতাকে আড়াল করতে চাননি তিনি। দুঃখ, রাগ আর ভয় যেমন রয়েছে, তেমনই আছে ভালবাসা, আনন্দ এবং অন্ধকার সময়ের রসবোধ।

২০১০ সালে কানাডার ছোট প্রকাশনা সংস্থা ফ্রিহ্যান্ড থেকে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে একাধিক দেশে প্রকাশিত হয়েছে। লেখিকার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে এর চলচ্চিত্ররূপ কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে।

কষ্টের মধ্যে হাসি থাকা কোনও বিরোধাভাস নয়। দীর্ঘ পরিচর্যার জীবনে একই দিনে ভয়, বিরক্তি, মমতা আর সামান্য আনন্দ পাশাপাশি থাকতে পারে। সেই মিশ্র অনুভূতিকে জায়গা দেওয়াই ছবিটির মানবিকতার অন্যতম দিক।

ভুলে যাওয়ার আগে লেখা

মায়ের অসুস্থতার সময় নোট নেওয়ার সিদ্ধান্তটির মধ্যে রয়েছে এক গভীর টান। স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার মুখে একজন মানুষ অন্য একজনের স্মৃতির চিহ্ন সংগ্রহ করছেন।

কোন মুহূর্তটি পরে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সারা তা জানতেন না। তবু লিখে গিয়েছেন, এঁকে গিয়েছেন।

এই লেখা অসুখের গতিপথ বদলায়নি। কিন্তু পরিবারের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিয়েছে। অসুস্থ মানুষটিকে শুধু একটি রোগের নামের মধ্যে আটকে না রেখে তাঁর জীবন, স্বভাব, সম্পর্ক ও মুহূর্তগুলিকে ধরে রাখার একটি পথ তৈরি করেছে।

কষ্টটা একার নয়

ছবিটির সঙ্গে যুক্ত সেথ রোজেন এবং তাঁর স্ত্রী লরেন মিলার রোজেনেরও আলঝাইমার্স নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। লরেনের মা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি দেখার সময় আবেগে ভেঙে পড়ার কথা রোজেন পিপল পত্রিকাকে জানিয়েছেন। ফলে এই গল্প তাঁদের কাছেও কেবল পর্দার জন্য অভিনীত কোনও দূরের কাহিনি ছিল না। নিজেদের পরিচিত কষ্টও ছবিটির সঙ্গে এসে মিশেছে।

একটি পরিবারের, বহু পরিবারের

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য এই ব্যক্তিগত গল্পের বড় পটভূমিটি বুঝতে সাহায্য করে। ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ ডিমেনশিয়া নিয়ে বেঁচে ছিলেন। ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন কারণের মধ্যে আলঝাইমার্স সবচেয়ে সাধারণ; প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এর ভূমিকা থাকে।

স্মৃতি, চিন্তা, যোগাযোগ ও আচরণে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে সাহায্যের প্রয়োজনও বাড়তে পারে। ফলে অসুস্থতা শুধু একজন মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না—তার অভিঘাত এসে পড়ে গোটা পরিবারের উপর।

পরিচর্যারও ক্লান্তি আছে

এই যত্নের বড় একটি অংশ ঘরের ভিতরেই থেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনের দেওয়া পরিচর্যার অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি মহিলাদের উপর তুলনামূলক বেশি দায়িত্ব পড়ার কথাও উল্লেখ করেছে।

কাউকে ভালবাসেন বলেই তাঁর পরিচর্যাকারী কখনও ক্লান্ত হবেন না, বিশ্রাম চাইবেন না কিংবা অসহায় বোধ করবেন না—এমন প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

পরিচর্যার মধ্যে ভালবাসা যেমন থাকে, তেমনই থাকে ক্লান্তি। থাকে বিরক্তি, অপরাধবোধ, ভয়, আবার হঠাৎ কোনও ছোট ঘটনায় হাসিও। এই সব অনুভূতিকে একসঙ্গে জায়গা দেওয়াই হয়তো পরিচর্যার অভিজ্ঞতাকে আরও সত্যি করে তোলে।

মা বদলালেন, সম্পর্ক নয়

ট্যাঙ্গলস-এর কেন্দ্রে তাই শুধু রোগের নাম নেই। আছে সম্পর্কের এক কঠিন প্রশ্ন—প্রিয়জনের মনে আমাদের পরিচয় বদলে গেলে আমরা তাঁকে কীভাবে চিনব?

তাঁর পুরনো জীবন, পছন্দ, অভ্যাস আর স্বভাবকে কতটা মনে রাখব? আর যখন তিনি নিজেই সেগুলির কিছু ভুলে যাবেন, তখন তাঁর হয়ে সেই স্মৃতিগুলি কে ধরে রাখবে?

সারা লিভিটের খাতা থেকে পর্দায় পৌঁছনোর এই যাত্রা সেই চেষ্টারই গল্প।

মায়ের স্মৃতি যখন ধীরে ধীরে ঝাপসা হচ্ছিল, মেয়ে তখন শব্দ আর ছবিতে মুহূর্তগুলি আটকে রাখছিলেন। আজ সেই ছবির ভিতর দিয়ে আরও অনেক মানুষ নিজের পরিবারের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles