ক্রিস্টোফার নোলানের দ্য ওডিসি শুধু সিনেমার পর্দায় ঝড় তুলছে না—তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে ব্রিটেনের বইয়ের বাজারেও। আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো হোমারের মহাকাব্য নতুন করে পৌঁছে যাচ্ছে পাঠকের হাতে। আর তার জেরেই যুক্তরাজ্যে কবিতার বইয়ের বিক্রি রেকর্ড গড়ার পথে।
বাজার গবেষণা সংস্থা নিলসেনআইকিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৩০ সপ্তাহে ব্রিটেনে কবিতার বই বিক্রি ৮০ লক্ষ পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ১৩.৩ শতাংশ বেশি। এই গতি বজায় থাকলে চলতি বছরে কবিতার বইয়ের মোট বিক্রি প্রথমবারের মতো দেড় কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি তা ১ কোটি ৭০ লক্ষ পাউন্ডেও পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
আর এই উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে এক পুরনো মহাকাব্য—দ্য ওডিসি।
সিনেমা মুক্তি, বইয়ের বিক্রি লাফ
ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড, জেন্ডায়া এবং অ্যান হ্যাথাওয়ে অভিনীত নোলানের দ্য ওডিসি জুলাইয়ের মাঝামাঝি মুক্তি পাওয়ার পর হোমারের মহাকাব্যের মুদ্রিত সংস্করণের বিক্রি কার্যত লাফিয়ে উঠেছে।
মুক্তির মাত্র চার সপ্তাহে ব্রিটেনে দ্য ওডিসি-র মুদ্রিত বই বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১,৪০০ শতাংশ।
এ বছর এখনও পর্যন্ত দ্য ওডিসি এবং দ্য ইলিয়াড-এর বিভিন্ন সংস্করণ মিলিয়ে প্রায় ৯ লক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ডের বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটেনে কবিতার বইয়ে খরচ হওয়া প্রতি ১০ পাউন্ডের মধ্যে প্রায় ১.২০ পাউন্ডই গেছে হোমারের দুই মহাকাব্যের পেছনে।
সিনেমার সাফল্যও অবশ্য কম নয়। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে দ্য ওডিসি বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ কোটি ৪০ লক্ষ ডলার আয় করেছে—নোলানের কোনও ছবির জন্য যা সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয়।
এবার হোমারের রেকর্ডের পালা?
এই গতিতে বিক্রি চললে হোমার শুধু প্রাচীন সাহিত্যের কিংবদন্তি হয়েই থাকবেন না, যুক্তরাজ্যে এক বছরে সর্বাধিক বিক্রি হওয়া কবির রেকর্ডও গড়ে ফেলতে পারেন।
বর্তমান রেকর্ড কানাডীয় কবি ও ইনস্টাগ্রাম-খ্যাত লেখিকা রুপি কউরের দখলে। ২০১৭ সালে তাঁর Milk and Honey সহ বিভিন্ন বই মিলিয়ে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১২ লক্ষ পাউন্ডের।
হোমারের সামনে এখন সেই রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
আমেরিকাতেও ‘ওডিসি’ উন্মাদনা
নোলানের ছবির প্রভাব শুধু ব্রিটেনেই আটকে নেই। যুক্তরাষ্ট্রেও দ্য ওডিসি-র বই বিক্রি বেড়েছে।
বাজার গবেষণা সংস্থা সারকানা বুকস্ক্যানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দ্য ওডিসি-র সব মুদ্রিত সংস্করণের বিক্রি বেড়েছে ৭৬ শতাংশ।
তবে এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—কবিতার বাজারের এই উত্থান শুধুমাত্র হোমারের কৃতিত্ব নয়।
দ্য ওডিসি ও দ্য ইলিয়াড-এর বিক্রি বাদ দিলেও কবিতার বইয়ের বাজার বেড়েছে ৭.২ শতাংশ। বরং ২০২৩ থেকে ২০২৫—এই তিন বছরই কবিতার বই বিক্রির ইতিহাসে অন্যতম সফল সময়।
ইনস্টাগ্রাম থেকে বইয়ের তাক
এই উত্থানের নেপথ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কবিদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
স্কটিশ কবি ডোনা অ্যাশওয়ার্থ এই দশকের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া জীবিত ব্রিটিশ কবি। তাঁর ২০২৫ সালের কাব্যগ্রন্থ To the Women চলতি বছরেই প্রায় ৩৪ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।
যদিও সাহিত্যসমালোচকদের একাংশ তাঁর সংক্ষিপ্ত ও অনুপ্রেরণামূলক লেখাগুলিকে কবিতার চেয়ে আত্মসহায়ক সাহিত্যের কাছাকাছি বলে মনে করেন।
নিলসেনআইকিউ-এর বিশ্লেষক ফিলিপ স্টোনের মতে, নোলান দ্য ওডিসি বানানোর আগেই কবিতার বাজারে উত্থান শুরু হয়েছিল। রুপি কউরের মতো ‘ইনস্টাপোয়েট’-দের জনপ্রিয়তা কবিতাকে শুধু একাডেমিক পাঠের বিষয় না রেখে জীবনযাপন, উপহার এবং আত্মোন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
নতুন তারকাও হাজির
এই বছরের আলোচিত নতুন কবিদের মধ্যে রয়েছেন লন্ডন-ভিত্তিক অভিনেতা ও কবি লুকাস জোনস। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ I Still Believe in Miracles ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের সবচেয়ে বেশি আয় করা কবিতার বই। বিক্রি থেকে এসেছে প্রায় ৪ লক্ষ পাউন্ড।
তবে হোমারের ক্ষেত্রে নোলানের সিনেমার সবচেয়ে বড় লাভবানদের একজন সম্ভবত অনুবাদক এমিলি উইলসন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল প্রশংসিত ইংরেজি অনুবাদই ছবিটি মুক্তির পর দ্য ওডিসি-র সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সংস্করণে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই গল্পে রয়েছে মজার মোচড়।
অনুবাদকই যখন নোলানের সমালোচক
নোলানের ওডিসি নিয়ে উইলসনের উচ্ছ্বাস নেই, বরং রয়েছে তীব্র আপত্তি।
গত সপ্তাহে তিনি ছবিটির মনস্তাত্ত্বিক, আবেগিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। London Review of Books-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তাঁর দাবি, নোলানের ছবিতে সেই উপাদানগুলিই অনুপস্থিত, যা মূল মহাকাব্যকে এত শক্তিশালী করে তুলেছিল।
চিত্রনাট্য, চরিত্রের প্রেরণা এবং সংলাপ নিয়েও তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। এমনকি ছবির খাবারের দৃশ্যও তাঁর পছন্দ হয়নি।
উইলসনের মন্তব্যের সারকথা আরও কড়া—এই চিত্রনাট্যের কোনও অংশ লিখতে হলে তিনি নিজেই অস্বস্তি বোধ করতেন।
অর্থাৎ, সিনেমা যার বই বিক্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেই সিনেমার সমালোচনায় বইটির অনুবাদকই সবচেয়ে সরবদের একজন!
বইয়ের পর অডিওতেও ‘ওডিসি’
হোমারের প্রত্যাবর্তন শুধু মুদ্রিত পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। অডিওবুকের বাজারেও দ্য ওডিসি-র চাহিদা বেড়েছে।
স্টিফেন ফ্রাইয়ের কণ্ঠে The Odyssey বর্তমানে স্পটিফাইয়ের যুক্তরাজ্যের সেরা দশ অডিওবুকের তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে ইয়ান ম্যাককেলেনের পাঠ করা সংস্করণ জায়গা করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অডিওবুক তালিকাতেও।
দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এক মহাকাব্য, একবিংশ শতাব্দীর এক ব্লকবাস্টার পরিচালক এবং স্ট্রিমিং যুগের পাঠক—তিনের অদ্ভুত মেলবন্ধনে তাই তৈরি হয়েছে নতুন এক সাংস্কৃতিক ঢেউ।
নোলানের ‘ওডিসি’ সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেছিল। এখন তার ঢেউ পৌঁছে গেছে বইয়ের তাকেও।