হোমারের ওডিসি থেকে ইনস্টাগ্রাম—বদলেছে মাধ্যম, বদলায়নি কবিতা শোনার নেশা
কবিতার মৃত্যু আসন্ন—এমন ভবিষ্যদ্বাণী বহু বার হয়েছে। তার জন্য অকাল শোকও পালিত হয়েছে বার বার। কিন্তু আপাতত সেই মৃত্যু আবারও পিছিয়ে গেল। আর এ বার তার পেছনে রয়েছে ওডিসি।
ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্রের সৌজন্যে ছবিটি মুক্তির আশপাশের কয়েক সপ্তাহে হোমারের মহাকাব্যটির বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১,৪০০ শতাংশ। তবে হোমার একা নন। কবিতার বই ফের উঠে আসছে বেস্টসেলারের তালিকায়। লুকাস জোন্স, ডোনা অ্যাশওয়ার্থ, নিকিতা গিল-সহ একঝাঁক কবি পাচ্ছেন চমকপ্রদ সাফল্য।
বেস্টসেলার? কবিতা!
‘বেস্টসেলার’ বললেই সাধারণত মনে পড়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে তৈরি রান্নার বই কিংবা মশলাদার রোম্যান্স উপন্যাস। কবিতার কথা খুব কমই মনে আসে।
প্রকাশনা জগতে কবিতাকে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা হয়েছে এক প্রান্তিক সাহিত্যধারা হিসেবে। কখনও কৈশোরের আবেগ, কখনও শিক্ষাবিদদের দুর্বোধ্য চর্চা, কখনও আবার জন্মদিনের কার্ডে লেখা কয়েকটি আবেগঘন পঙ্ক্তি।
অভিযোগও দুই বিপরীত মেরুর—কবিতা হয় অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, নয়তো অতিরিক্ত অভিজাত।
অর্থ উপার্জনের নিশ্চিত পথ হিসেবে তাই কবিতাকে কেউ কখনও খুব একটা দেখেননি। মোটা টাকা রোজগারের আশায় কবি হতে আসার লোকও কম। অন্তত বায়রনের যুগ পেরিয়ে আজকের দিনে খ্যাতি ও সম্পদের জন্য কবিতা লেখা যেন বেশ অদ্ভুত সিদ্ধান্তই।
কিন্তু সেই চিরকালীন ‘আন্ডারডগ’ কবিতাই এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গার্ডিয়ান প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ব্রিটেনে কবিতার বইয়ের বার্ষিক বিক্রি প্রথম বার দেড় কোটি পাউন্ড ছাড়াতে পারে। গ্রিক মহাকাব্য নিয়ে পাঠকদের আগ্রহ অব্যাহত থাকলে সেই অঙ্ক পৌঁছে যেতে পারে ১ কোটি ৭০ লক্ষ পাউন্ডেও।
হোমারের প্রভাব বাদ দিলেও ছবিটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গত তিন বছর ধরেই কবিতার বিক্রি ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছে এবং প্রতি বছরই আগের রেকর্ড ভেঙেছে।
ফিরে আসার শুরু
কবিতার এই পুনরুত্থানের লক্ষণ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার আভাস মিলছে।
২০১৪ সালে রুপি কউরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ মিল্ক অ্যান্ড হানি বিপুল বিক্রির নজির গড়েছিল। এখনও বইটির বিক্রি অব্যাহত। আমেরিকার দ্য নিউ রিপাবলিক তাঁকে এমনকি ‘দশকের লেখক’ বলেও অভিহিত করেছিল।
তবে কউর শুধু নতুন কবিতার সাফল্যের প্রতীক হয়ে থাকেননি। নতুন ধরনের কবিতার বিরুদ্ধে সমালোচকদের আপত্তিরও যেন প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
তাঁর কবিতা ছিল ইনস্টাগ্রামে তুলে দেওয়ার উপযোগী, ইনস্টাগ্রামেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং মূলত তরুণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়। সমালোচকেরা সেটিকে ‘নতুন কবিতা’র সহজে বিদ্রূপযোগ্য মুখ হিসেবেও দেখেছিলেন।
কিন্তু সময় দেখিয়েছে, সেই পাঠকগোষ্ঠী সাময়িক ছিল না।
কবিতা এখন স্ক্রিনে
আজ নতুন এক প্রজন্ম কবিতার দিকে ফিরছে—বিশেষ করে, যদিও একমাত্র নয়, সমাজমাধ্যমের হাত ধরে।
একই সঙ্গে উঠে আসছেন এমন কবিরা, যাঁদের অনেকেই মঞ্চে কবিতা পরিবেশন করেন। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিয়ো তাঁদের পরিচিতি দিয়েছে, আর সেখান থেকে তাঁরা পৌঁছে যাচ্ছেন বিপুল দর্শকের সামনে।
এই কবিতাগুলির অনেকটাই কাগজে পড়া যায়। কিন্তু শুধু পড়লে যেন কিছুটা হারিয়ে যায়।
হ্যারি বেকারের সানফ্লাওয়ার্স-এ রয়েছে নিজের অন্ত্যেষ্টিতে অস্বাভাবিক রকম বেশি সূর্যমুখী ফুল থাকার আকাঙ্ক্ষা—কারণ তিনিও গোটা জীবন আলো খুঁজেই কাটিয়েছেন।
কাগজে পঙ্ক্তিগুলির শক্তি রয়েছে। কিন্তু কবি যখন নিজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তা বলেন, তাঁর স্বর, ব্যক্তিত্ব, বিরতি এবং উপস্থিতি কবিতাটিকে যেন আরও পূর্ণতা দেয়।
আবার মুখে মুখে
নতুন কবিতার অনেকগুলিই প্রথমে জন্ম নিচ্ছে সমাজমাধ্যমে। সেখান থেকে কবি পৌঁছে যাচ্ছেন দর্শকে ভরা মঞ্চে।
সেখানে কবি ও শ্রোতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিরতি, কয়েক মুহূর্তের নীরবতা, চারপাশের ইন্টারনেট-কোলাহলের মধ্যেও শেষ শব্দ পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখার অদৃশ্য সুতো—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে কবিতার নতুন অভিজ্ঞতা।
একে সমাজমাধ্যমের যুগের কবিতা বলা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল—ওডিসিই বা অন্য কী ছিল?
ওডিসি মূলত উচ্চারণ করে শোনানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। গল্প বলা হত, ছড়িয়ে পড়ত, একজনের মুখ থেকে আর এক জনের কানে পৌঁছত। আজ আমরা যাকে একটি নির্দিষ্ট লিখিত গ্রন্থ হিসেবে জানি, সেটি আসলে বহু মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া সেই প্রাচীন ‘ভাইরাল’ আখ্যানের সবচেয়ে স্থির রূপ।
অর্থাৎ আজকের বেস্টসেলার কবিরা যতটা নতুন, ততটাই পুরনো এক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি।
অনুভূতিরই জয়
এই কবিতা আবেগকে ভয় পায় না। ভাবালুতাকেও নয়।
বিশ্বাস, প্রেম, শোক, আশা—মানুষের চিরন্তন অনুভূতিই এর মূল বিষয়। একেবারে অভিনব কোনও কাব্যভাষা আবিষ্কারের চেয়ে বহু মানুষের মনের অভিন্ন অনুভূতিকে ভাষা দেওয়াই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলিকতাই সব নয়।
সম্ভবত সে কারণেই নতুন জনপ্রিয় কবিদের কারও কারও বিরুদ্ধে ‘আত্মসহায়ক বইয়ের মতো’ কবিতা লেখা, মামুলি কথা বলা কিংবা অন্যের লেখা নকল করার অভিযোগও উঠেছে।
কিন্তু এই কবিতার উদ্দেশ্য পাঠককে চমকে দেওয়া বা ধাক্কা দেওয়া নয়। বরং তাঁর মনের সঙ্গে অনুরণন তৈরি করা। বিভাজনের সময়ে মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করাই যেন এর বড় শক্তি।
স্ক্রিনে নতুন আগুন
সমাজমাধ্যম এই কবিদের সেই যোগাযোগের নতুন পরিসর দিয়েছে। যেন বহু হাজার বছর আগের আগুন ঘিরে বসে গল্প বা কবিতা শোনার আধুনিক সংস্করণ।
একই সঙ্গে এত দিন যাঁদের কণ্ঠস্বর মূলধারায় সহজে শোনা যেত না, তাঁদেরও নিজেদের পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমজীবী পরিবারের কবি, সমকামী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের কবি কিংবা ধ্রুপদী সাহিত্যের দীর্ঘদিনের শ্বেতাঙ্গ পুরুষ-প্রধান গণ্ডির বাইরে থাকা কবিরাও এখন সরাসরি নিজেদের শ্রোতা ও পাঠক খুঁজে নিতে পারছেন।
এখানেই কবিতার নতুন শক্তি।
পুরনো গল্প, নতুন কণ্ঠ
কবিতা এ ভাবেই বেঁচে থাকে।
পুরনোতম মানবিক গল্পগুলিকে নতুন করে বলার জন্য দরকার নতুন কণ্ঠ। প্রেম, হতাশা, শোক, আশা, আনন্দ, সমাজ, সঙ্গ—হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের গল্প মূলত এগুলিই।
শুধু রূপ বদলায়। মাধ্যম বদলায়। কবিরা বদলে যান।
হোমারের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মহাকাব্য থেকে আজকের ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের কবিতা—যোগাযোগের প্রযুক্তি পাল্টেছে, কিন্তু মানুষের কবিতা শোনার আকাঙ্ক্ষা হারায়নি।
বরং হয়তো নতুন করে ফিরে এসেছে।
তাই কবিতার মৃত্যু নিয়ে শোক করার সময় এখনও আসেনি। বরং বেস্টসেলারের তালিকায় অন্য সব বইয়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কবিতার এই কামব্যাক উপভোগ করার সময়।