রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ উদযাপনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটতে চলেছে আগামী ২৯ নভেম্বর, রাজধানী দিল্লিতে। সূত্রের খবর, এই সমাপন অনুষ্ঠানে পূর্ণ উর্দিতে প্রায় এক লক্ষ স্বয়ংসেবক জড়ো হওয়ার প্রস্তুতি চলছে, যা সংঘের ইতিহাসে এই ধরনের কোনও একক শহর-কেন্দ্রিক জমায়েতের নিরিখে বিরলতম হতে পারে। সরসংঘচালক মোহন ভাগবত স্বয়ং এই অনুষ্ঠানে মূল ভাষণ দেবেন, এবং সেই ভাষণেই সংঘের আগামী একশো বছরের দিশা নির্ধারিত হবে বলে ইঙ্গিত মিলছে। গত বছর বিজয়াদশমীর দিন নাগপুরে যে শতবর্ষ উদযাপন শুরু হয়েছিল, তার একটি পূর্ণবৃত্ত সম্পন্ন হবে দিল্লির এই মঞ্চে।

গত এক বছরে ভাগবত নিজে দেশের প্রায় সবকটি প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন, ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সংলাপে বসেছেন। কানাডা ও আমেরিকায় প্রবাসী ভারতীয়দের সামনেও তিনি হাজির হয়েছেন, ব্রিটেনে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ, যা সংঘের আন্তর্জাতিক শাখা হিসেবে কাজ করে, বিদেশের মাটিতে সেমিনার ও বই-পাঠের আসরের মাধ্যমে এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই বিশ্বব্যাপী সক্রিয়তা স্পষ্ট করে দেয়, সংঘ আর নিজেকে কেবল ভারতীয় রাজনীতির একটি আদর্শগত জননী সংগঠন হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না—তার লক্ষ্য এখন বিশ্ব হিন্দু সমাজের সাংগঠনিক ঐক্য।

দিল্লির এই সমাপন অনুষ্ঠান নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা একটি রাজনৈতিক বিবৃতিও বটে। যেভাবে এক লক্ষ স্বয়ংসেবককে পূর্ণ উর্দিতে একত্র করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে শক্তি-প্রদর্শনেরই একটি কৌশল। ভারতীয় জনতা পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি যেভাবে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজ্যে টালমাটাল হয়েছে, বিশেষত দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে যেখানে সংঘের সক্রিয়তা কমে যাওয়ায় দলের ফলাফলে তার প্রভাব পড়েছিল; তার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘ যেন নিজের সাংগঠনিক পেশিশক্তি নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই সমাবেশ তাই কেবল শতবর্ষ পালনের অনুষ্ঠান নয়, এটি আসন্ন নির্বাচনী চক্রের আগে বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের অন্যান্য শাখা সংগঠনগুলির প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা—সংঘ এখনও তার সাংগঠনিক শক্তিতে অটুট, এবং আগামী দিনেও সেই শক্তি নির্বাচনী রাজনীতির নেপথ্যে সক্রিয় থাকবে।

ভাগবতের ভাষণ ঘিরে প্রত্যাশা

সূত্র অনুযায়ী, ভাগবত এই অনুষ্ঠানে সংঘের আগামী দিনের অগ্রাধিকার এবং সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখতে পারেন। গত এক বছর ধরে যে সামাজিক সমরসতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বাবলম্বন এবং নাগরিক কর্তব্যের মতো পাঁচটি মূল বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, দিল্লির এই ভাষণে সেগুলিরই একটি সারসংক্ষেপ এবং আগামী শতবর্ষের জন্য একটি কর্মসূচি ঘোষিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, সংঘের সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসবোলে সম্প্রতি ভোপালে জাতিভেদ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন—জন্মের ভিত্তিতে বৈষম্য হিন্দু সংস্কৃতির অংশ নয় এবং এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হতে হবে বলে তিনি জানিয়েছেন—তা সামাজিক সমরসতার প্রশ্নে সংঘের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রাথমিক প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়। দিল্লির সমাপন অনুষ্ঠানে এই সামাজিক সমরসতার বার্তাকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা যথেষ্ট, কারণ সংঘ ভালোভাবেই জানে, দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির ভোটব্যাঙ্ককে নিজের পক্ষে টানতে না পারলে বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই পুরো শতবর্ষ উদযাপনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংঘ একদিকে যেমন তার আদর্শগত ভিত্তি—হিন্দুত্ব, সামাজিক ঐক্য, স্বদেশি চিন্তা—কে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন মোড়কে পৌঁছে দিতে চাইছে, অন্যদিকে তেমনই নিজের সাংগঠনিক বিস্তারকে এক লক্ষ স্থানের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁইয়ে একটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে। গৃহসম্পর্ক অভিযান থেকে শুরু করে হিন্দু সমাজ সম্মেলন, প্রতিটি কর্মসূচিই এই বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। দিল্লির সমাপন অনুষ্ঠান সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান পরিণতি, যেখানে সংখ্যাতত্ত্ব—এক লক্ষ স্বয়ংসেবক, এক কোটি ঘরে পৌঁছনো, এক লক্ষ শাখার লক্ষ্যমাত্রা—নিজেই একটি রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠেছে।

তবে এই বিপুল আয়োজনের পিছনে একটি প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। সংঘ যতই নিজেকে রাজনীতি-নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠন বলে দাবি করুক না কেন, দিল্লির এই সমাবেশের সময়কাল এবং তার আকার স্পষ্টতই ইঙ্গিত করছে যে আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলির আগে বিজেপিকে সাংগঠনিক অক্সিজেন জোগানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই সমাবেশের তাৎপর্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ সংঘ দীর্ঘদিন ধরেই এই রাজ্যে নিজের সাংগঠনিক বিস্তার বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দিল্লির এই মঞ্চ থেকে ভাগবত যে বার্তা দেবেন, তার প্রতিফলন আগামী কয়েক মাসে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানেও দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।