র্থনীতিবিদ হিসেবে ড্যারন অ্যাসেমোগলুকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে তাঁর প্রশ্নগুলির ব্যাপ্তি। অর্থনীতির পরিচিত হিসাবনিকাশের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেন। কেন কোনও দেশ সমৃদ্ধ হয়, অথচ কোনও দেশ দীর্ঘকাল দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে থাকে? প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে গড়ে ওঠে? কোন বৈশিষ্ট্য একটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে? আবার ক্ষমতাবানদের স্বার্থ কীভাবে সেই প্রতিষ্ঠানকে শোষণের যন্ত্রে পরিণত করে? কয়েক দশক ধরে এই বৃহৎ প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজেছেন তিনি।

২০২৪ সালে সাইমন জনসন ও জেমস এ রবিনসনের সঙ্গে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান অ্যাসেমোগলু। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল—একটি দেশের প্রতিষ্ঠান তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং ক্ষমতাবান মানুষের উদ্দেশ্য ও মুনাফার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলির চরিত্র নির্ধারণ করে। রবিনসনের সঙ্গে লেখা হোয়াই নেশনস ফেইল এবং জনসনের সঙ্গে লেখা পাওয়ার অ্যান্ড প্রোগ্রেস এই চিন্তারই বিস্তৃত রূপ।

নিজের নতুন বই হোয়াট হ্যাপেনড টু লিবারেল ডেমোক্রেসি?: রিমেকিং আ পলিটিক্স অব শেয়ার্ড প্রসপারিটি-তে অ্যাসেমোগ্লু উদার গণতন্ত্রের বর্তমান সংকটকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর কেন্দ্রীয় বক্তব্য স্পষ্ট—সমৃদ্ধির সুফল যদি সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ভাগ না হয়, তা হলে উদারতন্ত্র টিকতে পারে না। শ্রমিকের মর্যাদা অস্বীকার করে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কয়েকটি সংস্থা ও অতি ধনীর হাতে কেন্দ্রীভূত রেখে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব নয়।

প্রযুক্তিশাসন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়

অ্যাসেমোগলুর মতে, গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হল কোনও ব্যক্তি যেন অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার জোরে অন্যের অধীন হয়ে না পড়েন। সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, মানুষকে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সামর্থ্য থাকতে হবে। কিন্তু প্রযুক্তিবিদদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি সমাজে সেই সাম্য থাকে না। সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণ নাগরিকের হাত থেকে সরে গিয়ে অল্পসংখ্যক বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

প্রযুক্তিশাসিত ব্যবস্থায় জনগণের স্বশাসনের ধারণাটিই অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। তাই কৃত্রিম মেধানির্ভর এক আপাত দক্ষ কিন্তু অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উদার গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। দক্ষতা ও গতির নামে মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো থাকলেও তার প্রাণশক্তি অবশিষ্ট থাকে না।

অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে

আজকের অ্যালগরিদমনির্ভর জগতে যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক আদৌ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অ্যাসেমোগ্লু। তাঁর উত্তর—সম্ভব, কিন্তু অ্যালগরিদমগুলি যদি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা হলে নয়।

নব্বইয়ের দশকের শেষ এবং নতুন শতাব্দীর গোড়ায় মনে করা হয়েছিল, আন্তর্জাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতান্ত্রিক আলোচনা প্রসারিত করবে। মানুষ তথ্য পাবে, মত বিনিময় করবে এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারবে। সেই আশা পূরণ হয়নি। অ্যাসেমোগলুর মতে, অনলাইনে সংলাপ বা আপস অসম্ভব বলে এমনটি ঘটেনি। বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এমন ব্যবসায়িক পথ বেছে নিয়েছে, যা তাদের বেশি মুনাফা ও ক্ষমতা দেয়। মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে বিভাজন, উত্তেজনা ও অসহিষ্ণুতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

এই কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম মেধার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তবে নিয়ন্ত্রণ বলতে তিনি শুধু ক্ষতি ঠেকানোর রক্ষণাত্মক বিধিনিষেধ বোঝাচ্ছেন না। প্রযুক্তিকে কোন সামাজিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, কারা তার সুফল পাবে এবং তার ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলাবে—এই প্রশ্নগুলির গণতান্ত্রিক মীমাংসা প্রয়োজন।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান

অ্যাসেমোগলুর ভাষায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান সেই ব্যবস্থা, যা মানুষকে সমান শর্তে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের পথ খুলে দেয়, নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং সম্পদ ও সুযোগের উপর অল্পসংখ্যক মানুষের একচেটিয়া অধিকার তৈরি হতে দেয় না।

বিপরীতে শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় মূলত ক্ষমতাবানদের সুবিধার জন্য। সেখানে অভিজাত গোষ্ঠী অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুযোগ দখল করে রাখে। প্রতিষ্ঠানগুলি তখন নাগরিকের অধিকার রক্ষার বদলে ক্ষমতাবানদের আধিপত্য স্থায়ী করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

তবে শুধু প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বললেই হবে না। প্রযুক্তির গতিপথকেও এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে তার সুফল সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। বাজার নিজে থেকেই সঠিক পথ বেছে নেবে—এই ধারণায় অ্যাসেমোগ্লুর আস্থা নেই। কারণ বাস্তবে ‘বাজারের সিদ্ধান্ত’ বলতে প্রায়ই কয়েকটি বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার সিদ্ধান্তকেই বোঝানো হয়।

শ্রমিকের সহায়ক কৃত্রিম মেধা

অ্যাসেমোগলু কৃত্রিম মেধার বিরোধী নন। তিনি এমন কৃত্রিম মেধার পক্ষে, যা শ্রমিককে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তার দক্ষতা ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে। এর লক্ষ্য হবে মানুষের কাজকে অর্থপূর্ণ করা, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, কারিগর, প্রকৌশলী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে আরও কার্যকর করে তোলা।

এ জন্য তিনি কৃত্রিম মেধা সম্পর্কে একটি সক্রিয় শাসননীতির প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথমে সামাজিক ঐকমত্য তৈরি করতে হবে—এই প্রযুক্তি থেকে সামগ্রিক সমাজ কীভাবে উপকৃত হবে। তার পরে সেই লক্ষ্য পূরণের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে।

এই ধরনের শ্রমিক-সহায়ক কৃত্রিম মেধা ব্যবসায়িক ভাবেও লাভজনক হতে পারে। তবে বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে তা বর্তমান কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার মতো অতিরিক্ত লাভজনক না-ও হতে পারে। কারণ এই প্রযুক্তিকে বিভিন্ন পেশা ও ক্ষেত্রের উপযোগী করে তুলতে হবে। প্রয়োজন হবে উচ্চমানের বিশেষায়িত তথ্যভান্ডার এবং আরও বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার।

অ্যাসেমোগলু অবশ্য স্বীকার করেন, কৃত্রিম মেধার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। কোনও দিন যদি এমন অতিমানবীয় কৃত্রিম মেধা তৈরি হয়, যা যন্ত্রমানবের সঙ্গে মিলে মানুষের সব কাজ করতে পারে, তা হলে শ্রমিক-সহায়ক প্রযুক্তির পথ কঠিন হয়ে পড়বে। তবে তাঁর মতে, সেই পরিস্থিতি এখনই আসন্ন নয়। ফলে আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে অন্য পথে পরিচালিত করার সময় এখনও রয়েছে।

উদারতন্ত্রের সঙ্গে সমাজের বিচ্ছেদ

অ্যাসেমোগলুর বিচার অনুযায়ী, উদারতন্ত্রের ধারণাগুলিই ভবিষ্যতের জন্য এখনও সবচেয়ে কার্যকর। কারণ স্বাধীন চিন্তা, ব্যক্তি-মর্যাদা এবং সমাজের সম্মিলিত জ্ঞান ব্যবহারের উপযুক্ত পরিবেশ উদারতন্ত্রই দিতে পারে। কিন্তু তার বর্তমান রূপে একটি বড় ভুল রয়েছে—সে সম্প্রদায় ও সামাজিক সংহতিকে উপেক্ষা করেছে।

শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের একাংশ কেন বদ্ধ, পরিচয়নির্ভর বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। এই মানুষদের অনেকেই উদারতন্ত্রকে দেখেছেন তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক প্রকৌশল হিসেবে। তাঁদের জীবিকার সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির বিষয়ে উদারপন্থী রাজনীতি প্রায়শই উদাসীন থেকেছে। ফলে তাঁরা এমন শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন, যারা অন্তত পরিচয় ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়।

অ্যাসেমোগলুর আশাবাদ এখানেই—শ্রমজীবী মানুষ সহজাতভাবে উদার মূল্যবোধের বিরোধী নন। ইতিহাসে তাঁরা উদার গণতন্ত্রের শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন; উপযুক্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হলে আবারও হতে পারেন।

তাঁর সতর্কবাণী তাই শুধু প্রযুক্তি সম্পর্কে নয়। এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। মানবসৃষ্ট উদ্ভাবন কি সম্মিলিত সমৃদ্ধির উপায় হবে, না কি ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার অস্ত্র হয়ে উঠবে—তার উত্তর নির্ভর করবে সমাজের আজকের সিদ্ধান্তের উপর। সমৃদ্ধি ভাগ করে নেওয়া, শ্রমের মর্যাদা রক্ষা এবং প্রযুক্তিকে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনা না গেলে উদার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস-এ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লুর সাক্ষাৎকার