এক কোটি টাকাতেও অধরা ‘বিলাসবহুল’ বাড়ি: মহানগরে কমছে ঘরের মাপ, দূরে সরছে ঠিকানা

যা জানা জরুরি
- একসময় এক কোটি টাকার বাড়ি মানেই ছিল অভিজাত এলাকা, প্রশস্ত বসার ঘর, একাধিক শোবার ঘর এবং নানা আধুনিক সুবিধা।
- ভারতের বড় শহরগুলিতে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
- সম্পত্তির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এক কোটি টাকা এখন আর বিলাসবহুল বাড়ির বাজেট নয়; বরং বহু শহরে একটি মোটামুটি মানের ফ্ল্যাট কেনার ন্যূনতম…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
একসময় এক কোটি টাকার বাড়ি মানেই ছিল অভিজাত এলাকা, প্রশস্ত বসার ঘর, একাধিক শোবার ঘর এবং নানা আধুনিক সুবিধা। ভারতের বড় শহরগুলিতে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সম্পত্তির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এক কোটি টাকা এখন আর বিলাসবহুল বাড়ির বাজেট নয়; বরং বহু শহরে একটি মোটামুটি মানের ফ্ল্যাট কেনার ন্যূনতম খরচ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নোব্রোকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শহরাঞ্চলে আবাসনের গড় দাম বর্গফুটপ্রতি প্রায় ১০,৪৫০ টাকা। সেই হিসাবে এক হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল দামই প্রায় ১ কোটি ৫ লক্ষ টাকা। এর সঙ্গে স্ট্যাম্প ডিউটি, নথিভুক্তির খরচ, পণ্য ও পরিষেবা কর, গাড়ি রাখার জায়গা, রক্ষণাবেক্ষণের অগ্রিম অর্থ এবং অন্দরসজ্জার ব্যয় যোগ করলে প্রকৃত খরচ আরও ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনে এক কোটি টাকার যে বাড়ি দেখা যাচ্ছে, সেটি হাতে পেতে ক্রেতাকে প্রায় ১ কোটি ১৫ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
সমস্যাটি সবচেয়ে তীব্র মুম্বই মহানগর অঞ্চলে। সেখানে গড় দর বর্গফুটপ্রতি প্রায় ১৭,৬০০ টাকা। ফলে এক কোটি টাকায় মূল শহরে বড় ফ্ল্যাট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ক্রেতাকে শহরতলির দূরবর্তী অঞ্চলে যেতে হচ্ছে অথবা ৪০০ থেকে ৬০০ বর্গফুটের বাড়িতে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। দিল্লি-জাতীয় রাজধানী অঞ্চল, বেঙ্গালুরু, পুণে ও হায়দরাবাদেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়ি চাইলে আয়তন কমাতে হচ্ছে; বড় বাড়ি চাইলে যাতায়াতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করতে হচ্ছে।
কলকাতায় তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে শহরে আবাসনের গড় দাম ছিল বর্গফুটপ্রতি প্রায় ৬,২৯০ টাকা। কিন্তু দক্ষিণ ও পূর্ব কলকাতার জনপ্রিয় অঞ্চল, মেট্রো সংলগ্ন প্রকল্প কিংবা নিউ টাউনের প্রতিষ্ঠিত আবাসনে এক কোটি টাকার সীমা দ্রুত অতিক্রান্ত হচ্ছে। গড় দাম শহরের সামগ্রিক ছবি দেখালেও পছন্দের এলাকার প্রকৃত মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি।
এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে জমি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রমিকের মজুরি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বড় নির্মাণসংস্থার বাজার-দখল যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে আবাসনের ‘প্রিমিয়ামকরণ’। বেশি লাভের আশায় নির্মাতারা ছোট ও সাশ্রয়ী বাড়ির পরিবর্তে বড় ফ্ল্যাট, আবদ্ধ আবাসন এবং নানা সুবিধাযুক্ত প্রকল্প তৈরি করছেন। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের সাতটি বড় শহরে চালু হওয়া নতুন বাড়ির প্রায় ৭৫ শতাংশের দাম ছিল ৮০ লক্ষ টাকার বেশি। ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বেশি দামের আবাসনের অংশ ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ।
ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতার সামনে এখন তিনটি আপসের পথ—ঘরের আয়তন কমানো, শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে যাওয়া অথবা সুইমিং পুল, ক্লাবঘর, নিরাপত্তা ও গাড়ি রাখার জায়গার মতো সুবিধা বাদ দেওয়া। তার পরেও বড় অঙ্কের গৃহঋণ নিতে হচ্ছে। এক কোটি টাকার বাড়ির জন্য ২০ শতাংশ অগ্রিম দেওয়ার পর ৮০ লক্ষ টাকার ঋণ নিলে মাসিক কিস্তি বহু পরিবারের আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে।
অতএব এক কোটি টাকার বাড়িকে আর বিলাসিতার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি বলা যায় না। প্রকৃত বিলাসিতা এখন শুধু বাড়ির দাম নয়—তার আয়তন, অবস্থান, যাতায়াতের সুবিধা এবং জীবনযাত্রার মান। ভারতের মহানগরগুলিতে এক কোটি টাকা বর্তমানে সেই বিলাসিতার প্রবেশপত্রও নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল আপস করে একটি ঠিকানা পাওয়ার মূল্য।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।