প্রতিবাদের বাজারে ব্র্যান্ডের আত্মসমর্পণ

যা জানা জরুরি
- সামাজিক মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার শোরগোল, হাজার কয়েক বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য, সঙ্গে পণ্য বয়কটের ডাক—এতেই কি কোনও সংস্থার বহু টাকা খরচ করে তৈরি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা…
- না কি এই প্রতিবাদের অধিকাংশই সুপরিকল্পিত, কৃত্রিম এবং বাস্তব ক্রেতাদের মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কহীন?
- গয়নার সংস্থা জিভা রাখিবন্ধন উপলক্ষে তৈরি একটি বিজ্ঞাপন সম্প্রতি সরিয়ে নেওয়ার পরে প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সামাজিক মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার শোরগোল, হাজার কয়েক বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য, সঙ্গে পণ্য বয়কটের ডাক—এতেই কি কোনও সংস্থার বহু টাকা খরচ করে তৈরি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা উচিত? না কি এই প্রতিবাদের অধিকাংশই সুপরিকল্পিত, কৃত্রিম এবং বাস্তব ক্রেতাদের মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কহীন? গয়নার সংস্থা জিভা রাখিবন্ধন উপলক্ষে তৈরি একটি বিজ্ঞাপন সম্প্রতি সরিয়ে নেওয়ার পরে প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপনটিতে ছিলেন অভিনেত্রী কৃতি শ্যানন। তাঁর পোশাক নাকি রাখিবন্ধনের মতো ‘পবিত্র ভারতীয় উৎসবের’ উপযুক্ত নয়—সামাজিক মাধ্যমে এমন অভিযোগ ওঠে। আপত্তিকারীদের একাংশ পোশাকটিকে অতিরিক্ত খোলামেলা বলে বর্ণনা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই জিভা বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয়। ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক বছরে ধর্ম, পোশাক, উৎসব, নারী-পুরুষের সম্পর্ক কিংবা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির সামান্য ইঙ্গিত ঘিরে প্রতিবাদ উঠলেই একাধিক সংস্থা বিজ্ঞাপন সরিয়েছে অথবা ক্ষমা চেয়েছে।
বাজার-বিশেষজ্ঞ সন্তোষ দেশাইয়ের মতে, জিভার সিদ্ধান্তকে নিছক কাপুরুষতা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সংস্থাটি এখনও এমন কোনও প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড নয়, যার নিজস্ব সামাজিক অবস্থান বা দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ক্রেতাগোষ্ঠী রয়েছে। তার কাছে একটি বিজ্ঞাপন রক্ষা করার চেয়ে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক ঝুঁকি এড়ানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তাই নৈতিকতার চেয়ে বাণিজ্যিক অঙ্কের ফল। একটি তুলনামূলক নতুন সংস্থার পক্ষে এই বিতর্কে দাঁড়িয়ে লড়াই করার লাভ সামান্য, ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।
অন্য দিকে মিতুশি শর্মার বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমের প্রতিবাদ কতটা প্রকৃত এবং তার ফলে বিক্রিতে সত্যিই কোনও প্রভাব পড়ে কি না, ব্র্যান্ডগুলি তা প্রায় কখনওই যাচাই করে না। আপত্তিকর মন্তব্যের সংখ্যা দেখেই তারা ভয় পেয়ে যায়। অথচ বিতর্ক অনেক সময় বিনামূল্যে প্রচারের কাজ করে। যে বিজ্ঞাপন আগে কয়েক লক্ষ মানুষ দেখেছিলেন, প্রতিবাদের পরে সেটিই কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। জিভার ক্ষেত্রেও বিতর্ক শেষ পর্যন্ত সংস্থাটির পরিচিতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর সবচেয়ে আলোচিত নজির তানিশকের ২০২০ সালের বিজ্ঞাপন। এক মুসলিম পরিবারে হিন্দু পুত্রবধূর সাধের অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছিল সেখানে। সামাজিক সম্প্রীতির এই ছবিকে ‘লাভ জিহাদ’-এর প্রচার বলে আক্রমণ করা হয়। তানিশক বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করলেও বিতর্কের পরে সংস্থার বিক্রি কমেনি; বরং বেড়েছিল বলে সন্তোষ দেশাই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমের ক্রোধ এবং ক্রেতার আচরণ সব সময় একই দিকে চলে না।
ফ্যাবইন্ডিয়া দীপাবলির প্রচারে উর্দু শব্দ ব্যবহারের কারণে বিজ্ঞাপন সরিয়েছে। মান্যবরের বিজ্ঞাপনে কন্যাদান প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় প্রতিবাদ হয়েছে। সব্যসাচীর মঙ্গলসূত্রের বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হয়েছে ‘ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত’-এর অভিযোগে। ডাবরের সমলিঙ্গের দম্পতিকে নিয়ে তৈরি করওয়া চৌথের বিজ্ঞাপনও একই পরিণতি দেখেছে। প্রতিটি ঘটনায় প্রতিবাদের ভাষা প্রায় এক—ভারতীয় সংস্কৃতি বিপন্ন, ধর্ম আক্রান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য বয়কট করতে হবে।
সমস্যা হল, সামাজিক মাধ্যম কোনও নিরপেক্ষ জনমত সমীক্ষা নয়। অল্পসংখ্যক সংগঠিত ব্যবহারকারী একই বক্তব্য বারবার ছড়িয়ে বিরাট জনরোষের বিভ্রম তৈরি করতে পারেন। ভুয়ো পরিচয়, স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচার সেই বিভ্রমকে আরও শক্তিশালী করে। ব্র্যান্ডের পরিচালকেরা যখন কয়েক হাজার মন্তব্যকে কয়েক কোটি ক্রেতার মতামত বলে ধরে নেন, তখন প্রতিবাদ তৈরির কৌশলটি সফল হয়।
তবে সব ক্ষোভকেই ‘কৃত্রিম’ বলা বিপজ্জনক। কোনও বিজ্ঞাপন সত্যিই বৈষম্যমূলক, নারীবিদ্বেষী অথবা কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি অবমাননাকর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জনসমালোচনা সংস্থাকে নিজের ভুল সংশোধন করতে বাধ্য করে। আসল প্রশ্ন তাই প্রতিবাদের সংখ্যা নয়, তার বক্তব্যের যৌক্তিকতা। কারা আপত্তি তুলছেন, তাঁদের কতজন সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রকৃত ক্রেতা এবং বিক্রির উপরে তার সম্ভাব্য প্রভাব কতটা—সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এগুলি যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের দায়িত্ব আরও বেশি। তারা যদি প্রত্যেক সংগঠিত হুমকির সামনে নতিস্বীকার করে, তবে সৃজনশীলতার সীমা ক্রমশ সংকুচিত হবে। বিজ্ঞাপন নির্মাতারা সাহসী ভাবনার বদলে নির্বিষ, নিষ্প্রাণ এবং পরীক্ষিত ছবি বেছে নেবেন। একই সঙ্গে প্রতিবাদকারীদের কাছে বার্তা যাবে—কয়েক ঘণ্টা যথেষ্ট শব্দ তুলতে পারলেই একটি বৃহৎ সংস্থাকে হাঁটু গেড়ে বসানো সম্ভব।
সুতরাং ব্র্যান্ডগুলি কখনও বাস্তব ঝুঁকির হিসাব করছে, আবার কখনও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার সহজতম পথ হলেও সেটিই সব সময় সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নয়। সামাজিক মাধ্যমের আওয়াজকে জনমত ধরে নেওয়ার আগে সংস্থাগুলির উচিত প্রকৃত বাজারের কথা শোনা। কারণ প্রতিবাদের শব্দ যত প্রবলই হোক, শব্দের তীব্রতা আর জনসমর্থনের বিস্তার এক জিনিস নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



