সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ফের দাম বাড়ল বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি ১৯ কিলোগ্রামের বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় সাড়ে ৯ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে দিল্লিতে একটি সিলিন্ডারের দাম হয়েছে ২,৭৪৭ টাকা ৫০ পয়সা, মুম্বইয়ে ২,৭০১ টাকা, কলকাতায় ২,৮৮৪ টাকা এবং চেন্নাইয়ে ২,৯১৬ টাকা ৫০ পয়সা। তবে ১৪.২ কিলোগ্রামের গৃহস্থালি সিলিন্ডারের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন হল, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম কিছুটা কমায় তেল সংস্থাগুলির লোকসান যখন দ্রুত কমছে, তখন বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম আবার বাড়ানো হল কেন?

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণের পার্থক্যটি বুঝতে হবে। গৃহস্থালি এলপিজির দাম সরকার নিয়ন্ত্রিত রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও তার পুরো বোঝা সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের উপরে চাপানো হয় না। তেল সংস্থাগুলি বাজারদরের চেয়ে কম দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তাকেই বলা হয় ‘আন্ডার-রিকভারি’ বা অনাদায়ী ব্যয়।

অন্য দিকে, বাণিজ্যিক এলপিজির দাম কার্যত বাজারনির্ভর। আন্তর্জাতিক এলপিজির দাম, ডলারের তুলনায় টাকার বিনিময়মূল্য, পরিবহণ খরচ, বিমা, বন্দর ও বিতরণ ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রতি মাসের প্রথম দিনে নতুন দাম ঘোষণা করে ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম। ফলে গৃহস্থালি সিলিন্ডারে লোকসান কমা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম বাড়া আপাতবিরোধী মনে হলেও দুটি হিসাব এক নয়।

কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে প্রতি গৃহস্থালি সিলিন্ডারে তেল সংস্থাগুলির আন্ডার-রিকভারি ছিল ৭০০ টাকার বেশি। জুলাইয়ে তা প্রায় ৫০০ টাকায় এবং আগস্টের গোড়ায় ১৮৮ টাকায় নেমে আসে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত সরবরাহ-বিঘ্ন কিছুটা কমা এবং আন্তর্জাতিক এলপিজির দাম নেমে আসাই এই উন্নতির প্রধান কারণ। তা সত্ত্বেও জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত জমে থাকা মোট আন্ডার-রিকভারি ৫৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান লোকসান কমলেও আগের বিপুল ঘাটতি মুছে যায়নি।

সেপ্টেম্বরের সামান্য মূল্যবৃদ্ধির পিছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এলপিজির ভারতীয় আমদানি-মূল্য নির্ধারণে সৌদি আরবের চুক্তিমূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মাসের শেষ দিকে প্রোপেন ও বিউটেনের আন্তর্জাতিক দর সামান্য বাড়লেও তার প্রতিফলন পরের মাসের ভারতীয় দামে পড়ে। বিশ্ববাজারের দৈনিক দর কমেছে কি না, শুধু তা দিয়ে মাসিক খুচরো মূল্য বিচার করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, ডলারের তুলনায় টাকার দুর্বলতা। এলপিজি আমদানির দাম ডলারে মেটাতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক দর স্থির থাকলেও টাকা দুর্বল হলে ভারতীয় সংস্থার আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তার সঙ্গে জাহাজভাড়া, বিমা এবং বন্দর ব্যবহারের খরচ যোগ হয়।

তৃতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোয় জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি আবার বেড়েছে। ভারতের অপরিশোধিত তেলের ঝুড়ির দাম আগস্টে ব্যারেলপিছু ৯০.১৯ ডলারে ওঠে; সেপ্টেম্বরের গোড়ায় তা প্রায় ৯৯.৩৫ ডলার ছুঁয়েছে। এলপিজির দাম সরাসরি অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে সমান হারে ওঠানামা না করলেও সামগ্রিক জ্বালানি বাজার, জাহাজভাড়া ও সরবরাহ-ঝুঁকির উপর তার প্রভাব পড়ে।

সরকার গৃহস্থালি সিলিন্ডারের দাম স্থির রেখে রাজনৈতিক ও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কারণ সরাসরি রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে কয়েক কোটি পরিবারের মাসিক বাজেটে ধাক্কা লাগে। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারে সেই সুরক্ষা নেই। তাই বাজারের ওঠানামা প্রথমে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, ধাবা, ক্যান্টিন এবং পথের খাবার বিক্রেতাদের উপর এসে পড়ে।

সাড়ে ৯ টাকার বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান মাসে কয়েক ডজন সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তার মোট ব্যয় বাড়বে। উৎসবের মরশুমে চাহিদা বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত খাবারের দাম বা সরবরাহের পরিমাণে প্রতিফলিত হতে পারে।

অতএব, গৃহস্থালি এলপিজিতে আন্ডার-রিকভারি ১৮৮ টাকায় নামা নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু তা বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম কমার নিশ্চয়তা দেয় না। সেপ্টেম্বরের বৃদ্ধি মূলত আন্তর্জাতিক দরের স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তন, দুর্বল টাকা, বেশি আমদানি ও পরিবহণ ব্যয় এবং পশ্চিম এশিয়ার অনিশ্চয়তার সম্মিলিত ফল। একই সঙ্গে এটি সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারেরও পরিচায়ক—পরিবারের রান্নাঘরকে আপাতত মূল্যবৃদ্ধি থেকে বাঁচিয়ে বাজারের অতিরিক্ত খরচ বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে সামাল দেওয়া।